সোমবার, রাত ২:৩৮, ১১ই জ্যৈষ্ঠ, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

সোমবার, রাত ২:৩৮, ১১ই জ্যৈষ্ঠ, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

হোম সাহিত্য

ভানুমতী ও মাথাকাটা ঘোড়া।

শেয়ার: https://www.timebulletin24.com/news/4eybpe

হারুন রশিদ

ঝাঁকড়া তেতুঁল গাছ। কানুল্লো বিলের ঠিক মধ্যিখানে  উচু মাটির ঢিবির উপর বুড়ো তেতুঁল গাছটা  দাড়িয়ে  আছে।  আমি শিশুকালে একবার এই গাছটারে দেখেছিলাম।  ঘুটঘুটে আন্ধার রাতেও গাছটির অবয়ব আমি পষ্ট  দেখতে পাচ্ছি। তেঁতুল গাছটির প্রলম্বিত  নীচু শাখার উপর বসে ভানুমতী পা দোলাচ্ছে।  প্রথম দর্শনে তাকে আমি চিনে ফেলি।  তেলো মাগুর মাছের মতো তার গায়ের রঙ।   মুখে তার আলোর ঝিলিক মারছে। সেই ছোটকাল থেকে ভানুমতীর  ব্যাপারে আমি কতো শায়ের, কেচ্ছা কাহিনী শুনেছি তার ইয়াত্তা নেই। । তাই সে আমার মনে গেঁথেই থাকে।  আকাশে কোনো চানতাঁরা  নেই। আকাশ কি এখনও মেঘে ঢাকা তাও আঁচ করতে পারছিনে।  বিশাল বিস্তৃত কানুল্লো বিল। বিলের ভিতর এই উচু জায়গায়  একা এই তেতুঁল গাছ।  বিস্তীর্ণ এই বিলের মাঝে কোথাও আর কোনো বড়ো গাছপালা নেই। গাছের গোড়ার দিকে আসশ্যাওড়া, নাটা, বুনোঝাল,  আকন্দের ঝোপ। একটি জন্তুর মাথা থেকে  আলৌকিক আলো দপদপ করে জ্বলছে আর নিভছে। তার  জ্বাজ্জল্যমান  আলোকচ্ছটায় ঝোপঝাড়, তেতুঁলগাছ ও ভানুমতীকে ফকফকে  দেখতে পাচ্ছি। কিন্ত মাথায় আলোজ্বলা  জন্তুটার শরীর দেখতে পাচ্ছিনা। শুধু চারটি পা দেখা যাচ্ছে । তেতুঁলগাছটারে আমি চিনতে পারি  আর  ভানুমতীকেও।  

তেতুঁল গাছটি  আমি  আগে একবার দেখেছিলাম।  বহুকাল আগে আমার ছোটবেলায়। ভানুমতীকে  আমি দেখিনি। ভানুমতীর  কথা লোকমুখে শিশুকালে থেকে শুনে আসছি। রেনি সাহেব,  ভানুমতী , গোরা সেপাই, আগাপশরের ফিরিঙ্গীদের জাহাজ ডুবি, মগের বাতান আর কতো কেচ্ছাকাহিনী, শ্লোক।  ভানুমতীর কুচবরন চুল, কুচকুচে গায়ের রঙ, আর তার  বীরত্বগাথার কাহিনী  শুনে শুনে আমি  এই আবাদের এলাকায় ডাঙ্গর হয়েছি। 

নিকশ  কালো রাতের নিস্তব্ধতা  ভেঙে  জন্তুটার ডাক শুনতে পাই। এই ধরণের জান্তব গলার শব্দ এর আগে  কখনো শুনিনি ।  এখন জাগরিত না স্বপ্নের দেশে তাও বুঝতেছিনা।

আমার শিশুবেলা।  আমি তখন সবে হাই ইশকুলে।  ক্লাস সিক্সে। গরমের ছুটি হাই ইশকুল বন্দ। আমকাঠাল খাওয়ার বন্দ। সেদিন  আমি ভাড়েরকোট থেকে আমাদের বাড়িতে ফিরে আসতেছিলাম। আমাদের গ্রামে হাই ইশকুল ছিলোনা। তাই ভাড়েরকোটে  মামাবাড়ি থেকে পড়ালেখা  করতে যাই।   অনেক রাস্তা। তা মাইল দশেক হবে। সেদিন আমি বাড়ি ফিরে আসতেছিলাম আমার গ্রামের মোছাব্দী দাদার সাথে। সে  আমার গ্রাম পরিচয়ের দাদা। তিনি তাঁর মেয়ের বাড়ি গিয়েছিলেন। বাড়ি ফেরার পথে আমি তাঁর লেজ ধরি। মামারাও তাই আমাকে তাঁর সাথে আমাকে পাঠিয়ে দেয়। নারায়ানখালি গ্রাম পার হলে মোছাব্দী দাদা ডিস্ট্রিক বোর্ডের রাস্তা ধরে না যেয়ে সহজ পথে  কানুল্লোর বিলের ভিতর দিয়ে  দিয়ে আমারে নিয়ে হাটতে থাকেন । হরিঘোষ, ছাব্বিশ কুড়োর খাল আমরা ল্যাংটা  হয়ে  পার হই। ভাটা ছিলো তাই সহজে সাঁতার দিয়ে পার হতে পেরেছিলাম। ল্যাংটা  হলেও আমরা কেউ কারুর দিকে তাকাইনি। সূর্যের প্রচন্ড তাপে আমাদের জলতেষ্টা লাগে। ভাটায় খালের পানি ঘোলা। তাই মোছাব্দী কাকা আরো পোয়া মাইল আমারে হাটায়ে নিয়ে জাবের শাহের পঁচাদিঘির কিনারে  আসে। দিঘিটা কচুরিপানায় ভর্তি।  দিঘির পাড়ে কোনো গাছপালা নেই। দিঘি না বলে পঁচাপুকুর বলাই ভালো। আসার সময় নানী কলারপাতার একবোন্দা পান পিঠে দিছিলো। তার কয়েকটা মোছাব্দী দাদারে নিয়ে খাই। দিঘির কচুরিপানা সরিয়ে  দুইহাত আঁজলা করে পানি খাই। এই গরমে পানি ঠান্ডা ছিলো তবে ধাপো গন্ধ। দিঘিরপাড়ে কয়েকটা লম্বাগাছের কান্ড থিয়ে করে  পুতে রাখা। কয়েকটার  কোমর ভেঙ্গে ঝুলে আছে। আমি জিজ্ঞেস করলে মোছাব্দী দাদা বললো, এইডে ছেলো মগেদের বাতান।

কাকার কথা কিছু বুঝতে না পেরে আমি জিজ্ঞেস করি, মগ আবার কী?

মগের মুল্লুক শুনিসনি? মগেরা আর ফিরেঙ্গীরা মিলে বেটাবিটি, ছোয়ালমায়ে সব ধরে নিয়ে যাতো। উই বার্মার মুল্লুকি নিয়ে তারগে বেচে দেতো।

এ কথা শুনে আমি আর কথা পাড়িনি। তখন ভয়ে আমার পরান  কালায় আইছিলো।  এখান থেকে জোরে পা চালাই।

পানি খেয়ে ফিরে এসে তখন আমরা এই  ঝাঁকড়া তেতুঁলতলায়  বিশ্রাম করি।   টাটানো  রোদের ভিতর একটু জিড়িয়ে নেই। মোছাব্দী দাদা বললো, কানুল্লো বিলির এই তেতৈল গাছরে সবাই কয় ভানুর তেতৈলতলা।   বিলের ভিতর সরু মেঠোপথ  ধরে আমরা হাটতেছিলাম। হাটার ভিতর  মোছাব্দীকাকা  ভানুমতী ,  নীলকর  রেণি সাহেব তেঁতুল গাছের কাহিনী, মগের বাতান, জাবের শাহর দিঘির  কেচ্ছা বলতে শুরু করেন। ওরে বাবা সেসব ভয়ানক কেচ্ছা। ভানুর কেচ্ছা আরো ভয়াবহ লোমহর্ষক।  তখন আমার জিহুত বয়স।  ভরদুপুরে খাঁখাঁ  রোদে  মধ্যিবিলের ভিতর  এসব শুনে আমার হাটু কাঁপতে লাগে। গরমে চান্দিফাটা অবস্থা। ছাতা নেই। মাথার উপর আমার কাপড়ের ছোট বোঁচকা।  মোছাব্দী দাদা টাক মাথায় ভেজা গামছা পেঁচিয়ে রেখেছেন। সেদিন বাড়ি ফিরে আমার কাঁপায়ে   জ্বর আসে। আম্মা কইলো কুবাতাস লেগে জ্বর আইছে। বুড়োর কী হুশজ্ঞান নেই। আমার ছোয়ালরে ভানুর গাছতলায় কেনো নেলো।

এই জ্বর সারতে আমার অনেক দোয়া তাবিজ লাগিছিলো।

তবে আজএই রাতে ভানুমতী ও এই ভয়াল জন্তুটাকে দেখে আমি একদম ভয় পাচ্ছিনা। এখন আমার অন্তরে ভয়ডর বলে কিছু নেই। ভানুমতী আমার অনেক দিনের চেনা।

এতক্ষণ আমি  তেঁতুল গাছের নীচে নিশ্চুপ দাঁড়িয়ে আছি।  গাছের নীচে দাঁড়িয়ে আছি  কিন্তু ভানুমতীর সাথে কোন কথা হচ্ছেনা।  ভানুমতী হঠাৎ গাছ থেকে লাফায়ে নীচে নামে। মাটি এত জোরে কেঁপে ওঠে যে আমি টলে যেয়ে মাটিতে বসে পড়ি।  ভানুমতীর পরনে কিছুই দেখতে পাইনে একদম উদোম।  কপালে জ্বলজ্বলে লাল টিপ। সে আমার কাছে হেটে আসে।  লম্বা খোলা চুল বাতাসে উড়ছে। শরীরে বাসনা সাবানের প্রাচীন  ঘ্রাণ।   উদোম সারান্ত  চকচকে বাহু প্রসারিত করে তার দুই হাত দিয়ে আমাকে তুলে শুন্যে উচু করে।  তারপর কয়েক পা হেটে মাথাকাটা জন্তটার পিঠে আমাকে বসিয়ে দেয়।  আমার মুখে একটা টোক্কা দিয়ে তার স্ফটিক সাদা দাঁত বেরিয়ে  মুচকি  হাসে।  দাঁতগুলো থেকে জ্যোতি ঠিকরে পড়ে। এবার সে নিজে লাফিয়ে ঘোড়াটার পিঠে সওয়ার হয়। আমি তার পিছনে। সে সামনে। জন্তটা দেখতে একদম ঘোড়ার মতো শুধু  তার মাথা নেই। মাথার দিক থেকে দপ দপ করে মশালের মত আগুন জ্বলছে। মাথাকাটা ঘোড়ার কথা এর আগেও আমি এই  আবাদের গ্রামগুলোতে শুনেছি। সুমুজদে বুড়ো মাথাকাটা ঘোড়া, রাঙামুখো ফিরিঙ্গীদের বাইচের নায়ে এসে লম্বা ফুলতোলা বন্দুক দিয়ে মানুষ ধরা, নাহো ভুত, ঠ্যাঙাড়ে , বর্গীদের খুনখারাবি  আর দ্যাও দানবের অনেক গল্প শোনাতেন। তখন সব আমার সত্যি মনে হতো।  সে গল্প বলার জন্য ইশকুল টিফিন টাইমে  মাঠের উত্তর পাশের বড়ো গাব গাছের নীচে বসে থাকতো। আমরা সুমুজদে দাদারে কতাম গাব গাছের ভূত। দেখতেও সেরম ছিলো।

একবার আমাদের গাজীবাড়ির দরজিজ কাকা মাথাকাটা ঘোড়ার পিঠে উঠে অজ্ঞান হয়ে  পেঁচামারির হালোটে পাটায় পড়ে ছিলো।  তখন সলক ফোটেনি। একদম বেয়ানসুয়াল। গাজী বাড়ির রোমেছা বুগো হালোটের কান্দায় হাগতে যায়। হালোটের মধ্যে সটিবনে বুগো যখন হাগতে বসবে তখন  সে দেখে, দরজীজ কাকা পাটায়ে উবদি হয়ে পড়ে আছে। সে হাগা বাদ দিয়ে চিল্লায়ে হালোট কান্দার গাজীবাড়ি, হাজামবাড়ি, মোলঙি বাড়ির লোকজন সব জড়ো করে । ছেলে-বুড়ো, জোয়ান-মদ্দ, বৌঝি, মা -চাচীরা সব  দৌড়ে  হালোট কান্দিতে চলে আসে। পরে জোয়ানমদ্দরা কয়েকজন দরজীজ কাকারে সাঙড়া করে ধরে  বাড়ির খৈলেনে খেজুরের পাটি বিছিয়ে  শুয়ায়ে দেয়।  বাগমারার ম্যানা মুন্সি এসে তারে ঝাড়ফুঁক করে তাবুদ করে। দরজীজ কাকা বহুদিন মাথাকাটা ঘোড়ার গল্প আমাদের শোনাতো।

মাথাকাটা ঘোড়ার গায়ের রঙ কালো কুচকুচে । ঘোড়ার কাটামাথা থেকে দপদপ করে নীল আলো জ্বলছে আর নিভছে।

ভানুমতী আমারে বলে, তুমি আমারে দুই হাত দিয়ে  জড়ায়ে ধরো, ভয় পাবানা।

এই প্রথম তার কথা শুনলাম। কেমন কেমন গলার স্বর। এমন কণ্ঠস্বর আগে কখনো শুনিনি। মাথাকাটা ঘোড়াটি এবার ছুটতে শুরু করে। আমি ভানুমতীর কোমর জোরে আকড়ে ধরে আছি। কোমর খুব মোলায়েম। তবে কোমরে  ধাতব জিনিস অনুভব করি। ধাতব হাতিয়ার,যন্ত্রপাতি  হতে পারে।   মাথাকাটা ঘোড়া খাল-বিল, বন-বাদাড় ভেঙে দৌড়াচ্ছে। ঘোড়াটি এবার ডানা বের করে উপরের দিক উঠতে থাকে। এতোক্ষণ ডানা দেখিনি। কেমন একটা মোলায়েম সুগন্ধি বাতাস এসে গায়েমুখে লাগছে।  কিছুক্ষণ উড়ার পর

ঘোড়াটি বিশাল জরাজীর্ণ পরিত্যক্ত  শ্যাওলাধরা একটা ইমারতের কাছে এসে থামে। চারিদিকে গাছপালা। এখন আর ঘোড়াটির ডানা দেখা যাচ্ছেনা। ভারী তাজ্জব ব্যাপার ডানা উধাও। আমাদের শব্দ পেয়ে  ঝাঁকে ঝাঁকে বাদুর উড়তে থাকে। তাদের পতপত শব্দে রাতের অন্ধকারে এক ভয়াল তরঙ্গ সৃষ্টি করে। আমাকে হাত দিয়ে উঁচু করে ধরে ভানুমতী  মাথাকাটা ঘোড়া থেকে লাফিয়ে নামে।  ঘোড়াটি মাথা থেকে  আলোর দ্যুতি ছড়াতে ছড়াতে সামনের দিকে হাটতে থাকে। ভানুমতী আমার হাত ধরে ঘোড়াটিকে অনুসরণ করে।  উদোম কালো চকচকে তেজস্বী  ভরাযৌবনে উদ্দীপ্ত ভানুমতীর দিকে এক ঝলক তাকাই। এই একবার তাকে পরিপূর্ণ দেখি। আবার হাটতে থাকি। সামনে পাশাপাশি  কয়েকটি বড় বড় চৌবাচ্চা।  চৌবাচ্চাগুলিতে শ্যাওলার আস্তরণ। চৌবাচ্চার অপর পাশে কয়েকটি ডুমুর গাছ। ডুমুরগাছগুলোতে মানুষের কঙ্কাল ঝুলছে। আমাদের দেখে কয়েকটি  বনবেজি দৌড়ে পালালো। মাথাকাটা ঘোড়ার প্রজ্জ্বলিত  আলোয় সব স্পষ্ট দেখতে পাচ্ছি। চৌবাচ্চাগুলি পানিতে ভরা।  পানির রঙ গাড়ো নীল। ভানুমতীর   হাত ছাড়িয়ে আমি একটি চৌবাচ্চার কাছে যেয়ে নীচু হয়ে দেখতে যাই। ভানুমতি আমাকে জোরে তার সবল  হাত  দিয়ে ধরে টেনে আনে। মনে হচ্ছে আমার হাত ভেঙ্গে যাবে। সে ধমক দিয়ে বলে  তুমি  চৌবাচ্চার ধারে কাছেও যাবানা। তার হাতের স্পর্শ মোলায়েম তবে বেশ কঠিন।  এবার সে তার  হাত দিয়ে আমাকে ধাক্কা মেরে বেশ দূরে ঠেলে দেয়। আমি হতচকিত হই।  ভানুমতী দৃপ্ত পায়ে মাথাকাটা ঘোড়ার কাছে যেয়ে ঘোড়াটিকে পাঁজাকোলা করে বড় একটা চৌবাচ্চার ভিতর ছুড়ে মারে।  ঝপ্পাত  একটা শব্দ হয়।  হঠাৎ চারিদিক গভীর আঁধারে ঢেকে যায়। পাতালপুরীর অন্ধকার গহ্বরে আমি  ঢুকে যাই। আমি ভানুমতির নাম ধরে জোরেজোরে ডাকতে থাকি।

লেখক – অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক, কথা সাহিত্যিক, বীর মুক্তিযোদ্ধা

মন্তব্য করুন

আপনার ইমেইল প্রকাশ করা হবে না। * চিহ্নিত ঘরগুলো আবশ্যক।

শেয়ার করুন