ওমর ফারুক
রাজনীতি হচ্ছে নীতির শিল্প চর্চা যার উদ্দেশ্য থাকে গণমানুষের সংকট উদ্ঘাটন, সংকট সমাধান এবং সম্পদ ও সদ্ব্যবহারের সুষম বন্টন। রাজনীতি একটি দর্শনের প্রায়োগিক পদ্ধতির সমসাময়িক উন্নত ও সহজতর কৌশল যার মাধ্যমে বৃহত্তর সমাজের
একাত্মতা নিশ্চিত করা যায় এবং অটুট বন্ধনের ফলে সামাজিক অধিকার নিশ্চিত করা সহজতর হয়, সমাজ বলতে শুধু মানুষের সমাজই নয় জীবসমাজ বোঝাটাই শ্রেয়। রাজনীতির উদ্দেশ্য একটি দর্শনকে প্রোমোট করা। রাজনীতির কৌশল থাকবে, শিল্প থাকবে, পরিবর্তনশীলতা থাকবে। রাজনীতি সকল কালের ধ্রুব নয়, ধ্রুব হচ্ছে দর্শন। রাজনীতি বিধানের মত পরিবর্তনশীল, কিন্তু দর্শন সর্বকালীন ও সার্বজনীন, অপরিবর্তনীয়, ধ্রুব।
কালের ইতিহাসে জীবসমাজের অভিবাবকত্ত্ব, মানুষের অধিকার নিশ্চিত করা ও সর্বোপরি মানুষের মুক্তির জন্য যে সকল দর্শন আবির্ভূত হয়েছে তা সত্যি অপরিবর্তনীয়, একই গন্তব্য নির্দেশক, পরস্পর অসাংঘর্ষিক এবং শ্রেষ্ঠতর। কিছু দর্শনের প্রায়োগিক ত্রুটি, বিধান প্রনয়নের ভুল পদ্ধতির কারণে সমাজময় দ্বিধা দ্বন্দ্ব সৃষ্টি হয়েছে, সৃষ্টি হয়েছে শর্ত- স্বার্থ সংকটের দীর্ঘ লাইন যার পেছনে রয়েছে বিশ্ববেনিয়াদের শাসন শোষনের যুগোপযোগী কৌশল। অর্থ নিয়ন্ত্রক গোষ্ঠী ও বেনিয়াদের কোন ভৌগোলিক দেশ নেই, আছে অর্থনৈতিক সংঘ।
মানুষের অধিকার আদায়ের জন্য সকল কালেই আন্দোলন চলমান কিন্তু নেতৃত্বের অসততা ও শঠতার কারণে তা আর সফলতার মুখ দেখেনি, অর্জন যা হয়েছে তা গোষ্ঠীগত, জনমানুষের দীর্ঘকালীন কল্যান স্হাপিত হয়নি, মুক্তি তো নয়ই।

বিশ্বব্যাপী সমাজতান্ত্রিক চিন্তাধারার ক্রমবিকাশ বৃহৎ মানবসমাজ পর্যন্ত পৌঁছাতে পারেনি নেতৃত্ব ও মেধা কেনাবেচার পরিনতির কারণে। গণতান্ত্রিক চিন্তাধারার রহস্য ও গণতান্ত্রিক পদ্ধতিতে নেতা নির্বাচনের সঠিক পদ্ধতি গোজামিলে ভরা পদ্ধতি হবার ফলে জনমানুষের মুক্তির পথ কোনদিনই আলো দেখেনি, দেখেছে আন্দাজগত, অপরীক্ষিত পথ ও অর্বাচীন নেতার অপরিহার্য ধ্বংসাত্মক গন্তব্য।
কিন্তু লালনগন এনেছেন চিরকালীন অভিনব দর্শন ও বিধান প্রণয়নকারী গুণি নেতৃত্বের বিশেষত্ব । মানুষ সংকট থেকে বের হয়ে এসে মুক্তি নিশ্চিত করার জন্য পরিশুদ্ধ নেতা পায় না এবং গ্রহন করে না বলেই মানবসমাজ আজ নিগৃহীত, অধপতিত। লালন দর্শনের রাজনীতি তাঁর কথায় যেমন প্রচ্ছন্নরূপে দীপ্যমান তেমনি শক্তিশালী তাঁর প্রায়োগিক অংশগ্রহন। তাঁর চুড়ান্ত বক্তব্য
‘এমন মানবসমাজ কবে গো সৃজন হবে
যেদিন হিন্দু-মুসলমান জাতি গোত্র নাহি রবে’
তিনি আমাদের স্পষ্ট করতে চান যে, ধর্ম বর্ণ জাতি গোষ্ঠী – এসব সুবিধাভোগী শ্রেণির দ্বারা সৃষ্টি। বিভেদ যত সৃষ্টি হয়েছে তা শুধুই শোষনের পথকে ত্বরান্বিত করার জন্য। চিরকাল শোষিত মানুষের জ্ঞানার্জন, ধ্যান গৃহে গমন প্রকৃতপক্ষে দুঃসাধ্য ব্যাপার। মানুষকে মুক্ত হতে হলে আত্মোন্নতি ছাড়া সম্ভব নয়। আত্মোন্নতির অনুশীলন আত্মদর্শন ঘটিয়ে থাকে। শোষিত মানুষের সমাজে আত্মদর্শনের চর্চা প্রায় অসম্ভব। মানুষের মুক্তির জন্য সত্যদ্রষ্টা লালন তাই গাইলেন শোষণমুক্ত সমাজ গঠনের গান।
যুগে যুগে সত্য দর্শনের বিধান প্রনয়নকারী হবেন একজন পরিশুদ্ধ ব্যক্তিত্ত, যিনি সকল সংকট থেকে মুক্ত, যুগের পথ প্রদর্শক। কিন্তু সমাজ তা না বুঝে পরিশুদ্ধ মহামানবগণকে না চিনে তাঁদের না মেনে চরম স্বেচ্ছাচারিতায় লিপ্ত হবার কারণে সমাজ হয়ে উঠছে অবাসযোগ্য – যা আমাদের অনুধাবনেই নেই। সাঁইজি বললেন, মানুষ নিম্নমানের জীব মাত্র, জীবের একমাত্র গতি তার মুক্তি। এই মুক্তি নিশ্চিত করতে পারে তার গুরু যিনি পরম পুরুষ বা কামেল মুর্শেদ বা ইমাম বা সাধু ব্যক্তি। মুক্তি বিষয়ে তিনি শিষ্যকে অনুধাবন করার জন্য বললেন
‘জীব ম’লে
জীব যায় সে কোনখানে।
জীবের গতি মুক্তি কে করে!’
তিনি একথাই বলতে চান যে, মহাপুরুষ ব্যতীত কেহই মুক্তি ঘটাতে পারেন না। তাই মহাপুরুষ গুরুকে কেন্দ্র করে তাঁর বলয়ে নিজেকে সমর্পন করতে পারলেই নিজের যেমন আত্মশুদ্ধি অর্জন হবে তেমনি প্রেমময় একটি মানবসমাজও সৃষ্টি হবে।প্রশ্ন হলো মহাপুরুষকে মানা না মানা। আমরা তো অর্বাচীন, ভোগী, বিলাসবহুল জীবনযাপনকারী নেতায় অভ্যস্ত হয়ে পড়েছি এবং এ জাতীয় নেতার মোসাহেবি করার প্রতিযোগিতায় নেমেছি যেন আমরাও ভোগবিলাস করতে পারি।অথবা সব কিছু মেনে নিয়ে পশুর মত জীবন যাপন করে যাচ্ছি, মানুষ হিসেবে কোন আদর্শ কো দায় বোধই করছি না। সুতরাং মুক্তি কিভাবে হবে। আমরা তো পরিশুদ্ধ ব্যক্তিত্ত, কামেল মুর্শেদকে মানছি না।
সাঁইজি বলছেন –
‘নবি না মানে যারা
মোয়াহেদ কাফের তারা এই দুনিয়ায়,
ভজনে তার নাই মজুরি
দলিলে সাফ লেখা রয়।
পাড়ে কে যাবি নবির নৌকাতে আয়। ‘
এক কথায় প্রশ্ন হলে আমরা সবাই এক বাক্যে বলব আমরা নবি মানব না কেন? আমরা অবশ্যই নবি মানি এবং না মানা অসম্ভব। কিন্তু প্রকৃত অর্থে কি নবি মানি? মানি না, মুখে বলি নবি মানি কিন্তু কর্মমন্ডলী সবই আমার নিজস্ব স্বেচ্ছাচারী,নবির আদর্শের নয়।
নবি মানা অর্থ ১) নবির অদ্বৈতবাদে বিশ্বাস। নবির প্রতি পূর্ণ আত্মসমর্পণ
২) নবি প্রদত্ত নির্দেশনার প্রতি কর্তব্যপরায়ন হওয়া।
৩) নবির আদর্শ বাস্তবায়ন করা অর্থাৎ আত্মশুদ্ধি অর্জনের অবিরাম অনুশীলন করা এবং তাঁর দ্বারা পরিচালিত সমাজ সৃষ্টির জন্য জীবন ব্যয় করা। জীবন ব্যয় অর্থ -আমার দেহ, আমার মন, আমার সম্পদ, আমার অর্থ, আমার ইজ্জত যা কিছু আমার সবই প্রয়োজনমত পরিহার করে দেয়া।
নবিকে না মানলে মোয়াহেদ কাফের অর্থাৎ অদ্বৈতবাদী কাফেরে পরিনত হয়। নবিকে না মানলে তার সকল কর্ম ও সাধনা বর্বাদ হয়ে যাবে, ভজনের কোন ফল পাবে না, বস্তুর দাস হয়ে বস্তুবন্ধনে আবদ্ধ থেকে বস্তুর আঘাত পেতে থাকবে, মুক্তি পাবে না।
সাঁইজি আরও বলনেন
‘নবি না মানে যারা
মোয়াহেদ কাফের তারা
এই মোয়াহেদ দায়মাল হবে
বেহিসাবে দোজখে যাবে। ‘
নবি না মানার কারণে অদ্বৈতবাদী কাফের অর্থাৎ আল্লাহ ও রসুলকে( নবি) না মেনে আল্লাহকে আলাদা অস্তিত্বে ভাবা কাফের বর্বাদ হবে এবং বিনা হিসাবে দোজখে যাবে। দোজখ মানেই অর্জিত দেহ ও মনের দুঃখময় জীবন। পথভ্রষ্টগণের জীবন, ছেরাতুল মুস্তাকিমের বিপরীত পথ, সংস্কার সমুদ্রে নিপতিত জীবন।
কাজেই সাঁইজি বললেন নবির পথে কর্তব্যপরায়ন হতে। নবি প্রতিক্ষণ যে শিক্ষা দীক্ষা দিবেন তারই প্রতিফলন ঘটানোর অবিরাম চেষ্টা ( দায়েমুসসালাত) করা। এখন প্রশ্ন হচ্ছে প্রতিক্ষন নবি পাব কোথায়! সাঁইজি বললেন
‘যেহি মুর্শিদ সেই তো রসুল
ইহাতে নাই কোন ভুল
খোদাও সে হয়।
এ কথা কয় না লালন কোরানে কয়। ‘
একথা পরিস্কার যে, সম্যক গুরুই নবি রসুল ও খোদা। এ তথ্য সকল কালের লালনের, এ কথা সকল যুগের মহাপুরুষের, এ কথা কোরানের অর্থাৎ কোরানে বর্নিত ‘নাহনু’ র। নাহনু অর্থ নবি- রসুল ও ইমামগণের ( পরিশুদ্ধ ব্যক্তি, সাধুত্ত্ব অর্জনকারী ব্যক্তি, মোমিন ব্যক্তি) সমষ্টিগত আল্লাহর উচ্চতম পরিষদ ‘ আমরা’র দল।
এখানে মহাপুরুষদের বলা হয়েছে। বুদ্ধ,কৃষ্ণ, মুসা, ইবরাহীম, নুহু, ঈসা, মুস্তফা মোহাম্মদগণের গুনগত বংশলতিকা। যুগের পথপ্রদর্শক খৈয়াম, হাফিজ,রুমি,নজরুল, লালন, সদর উদ্দিনগন, সকল শাজারার মহাজন একই কথা উচ্চারণ করলেন। কোন একটি ক্ষনও মহাপুরুষের অবর্তমান অসম্ভব। সহজেই বলা যায় যে সত্যদ্রষ্টা লালনের দর্শন ও রাজনীতি কতটা প্রাসঙ্গিক! অথচ বৃহৎ সমাজে লালনের গান নিয়ে হ’য়ে আসছে বাণিজ্য, লালনকে করা হয়েছে পণ্য। কিন্তু তাঁর দর্শন গ্রহন করা হয়নি, গ্রহন করা হয়নি তাঁর রাজনৈতিক শিক্ষা ও দীক্ষা। হয়েছে কি? কতটুকু হয়েছে!