বুধবার, দুপুর ১২:২৮, ৬ই জ্যৈষ্ঠ, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

বুধবার, দুপুর ১২:২৮, ৬ই জ্যৈষ্ঠ, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

হোম সংস্কৃতি সংবাদ

ঢাকাই মসলিন: হারানো সূতার ঐতিহ্য, বিশ্বমুগ্ধ এক বিস্ময়,কার রতন কে যে ধরে রাখে!

শেয়ার: https://www.timebulletin24.com/news/keu3fn

বাংলার ইতিহাসে এমন কিছু সৃষ্টি আছে যা সময়ের স্রোতেও মুছে যায়নি—বরং কিংবদন্তিতে পরিণত হয়েছে। ঢাকাই মসলিন তেমনই এক বিস্ময়। একসময় যার সূক্ষ্মতা নিয়ে বলা হতো, পুরো শাড়ি আঙুলের আংটির ভেতর দিয়ে চলে যেতে পারে। আজ সেই মসলিন শুধু কাপড় নয়, একটি হারানো শিল্প, এক সাংস্কৃতিক পরিচয়।

ঢাকাই মসলিনের উৎপত্তি প্রাচীন বাংলায়, বিশেষ করে বর্তমান ঢাকা অঞ্চলে। মোগল আমলে এটি তার শিখরে পৌঁছে। সম্রাট জাহাঙ্গীর এবং শাহজাহান-এর দরবারে মসলিন ছিল রাজকীয় পোশাকের অন্যতম উপাদান। ইউরোপীয় ব্যবসায়ীরাও এই কাপড়ের প্রতি আকৃষ্ট হয়ে এটিকে “woven air” বা “বোনা বাতাস” বলে অভিহিত করত।

মসলিন তৈরির জন্য ব্যবহার করা হতো বিশেষ এক ধরনের তুলা—ফুটি কার্পাস, যা শুধুমাত্র বাংলার নির্দিষ্ট জলবায়ুতে জন্মাত। দক্ষ তাঁতিদের হাতের নিপুণতায় তৈরি হতো এই অতিসূক্ষ্ম সুতা ও কাপড়।

১৮শ ও ১৯শ শতকে ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি-এর শাসনামলে মসলিন শিল্প ধ্বংসের মুখে পড়ে। শুল্কনীতি, শিল্পবিপ্লবের যন্ত্রনির্ভর কাপড়, এবং স্থানীয় তাঁতিদের ওপর নির্যাতনের ফলে ধীরে ধীরে হারিয়ে যায় এই ঐতিহ্য। অনেক ইতিহাসবিদের মতে, তাঁতিদের আঙুল কেটে দেওয়ার গল্প অতিরঞ্জিত হলেও, অর্থনৈতিক নিপীড়ন ছিল নির্মম বাস্তবতা।

আজ আসল ঢাকাই মসলিন খুবই বিরল। বিশ্বের কয়েকটি জাদুঘরে এটি সংরক্ষিত আছে, যেমন:

  • City Palace Museum Jaipur
  • Salar Jung Museum

এইসব জাদুঘরে সংরক্ষিত মসলিনের অনেকগুলোই উনবিংশ শতকে বোনা, যা সেই সময়কার কারিগরি দক্ষতার সাক্ষ্য বহন করে।


সাম্প্রতিক সময়ে বাংলাদেশ সরকার ও গবেষকরা মসলিন পুনরুদ্ধারে কাজ করছে। বহু বছরের গবেষণার পর ফুটি কার্পাস তুলা পুনরায় চাষ এবং ঐতিহ্যবাহী তাঁত প্রযুক্তি পুনরুজ্জীবনের চেষ্টা চলছে। এই উদ্যোগ শুধু একটি শিল্প ফিরিয়ে আনার প্রয়াস নয়, বরং জাতীয় পরিচয় পুনর্গঠনের অংশ।

ঢাকাই মসলিন কেবল একটি কাপড় নয়—এটি বাঙালির গর্ব, ঐতিহ্য ও শিল্পকুশলতার প্রতীক। এটি মনে করিয়ে দেয়, একসময় বাংলার কারিগররা বিশ্বকে অবাক করে দিয়েছিল তাদের সূক্ষ্মতা ও সৌন্দর্য দিয়ে।

“কার রতন কে যে ধরে রাখে”—কথাটিই যেন মসলিনের ইতিহাসের প্রতিচ্ছবি। হারিয়ে গেলেও তার মাহাত্ম্য মুছে যায়নি। জাদুঘরের কাচের ভেতরে বন্দী সেই মসলিন আজও বলে যায়—একটি সময় ছিল, যখন বাংলার বাতাসও বোনা যেত।

মন্তব্য করুন

আপনার ইমেইল প্রকাশ করা হবে না। * চিহ্নিত ঘরগুলো আবশ্যক।

শেয়ার করুন