
“ছবি সংগৃহীত”
ঢাকা, ১২ জুলাই — রাজধানীর আজিমপুর সরকারি ছোটমণি নিবাসে থাকা পাঁচ শিশু হাম ও হাম-পরবর্তী জটিলতায় মারা গেছে। শিশুদের কেউ ছিল পরিত্যক্ত, কেউ উদ্ধারকৃত, আবার কেউ পিতামাতার পরিচয়হীন। মৃত্যুর পর তাদের বেশির ভাগকেই বেওয়ারিশ হিসেবে দাফন করা হয়েছে। শেষবারের মতো মুখ দেখার বা বিদায় জানানোর জন্যও পাশে ছিলেন না কোনো স্বজন।
সর্বশেষ মারা যাওয়া শিশু মাহিরের বয়স ছিল মাত্র আট মাস। জন্মগত শারীরিক জটিলতায় ভোগা মাহির দীর্ঘদিন হাম, নিউমোনিয়া ও শ্বাসকষ্টের চিকিৎসা নেওয়ার পর বৃহস্পতিবার গভীর রাতে রাজধানীর একটি বিশেষায়িত হাসপাতালে মারা যায়। শুক্রবার ভোরে তার মরদেহ ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে আনা হয়। প্রয়োজনীয় আইনি প্রক্রিয়া শেষে শনিবার সকালে আঞ্জুমান মুফিদুল ইসলামের মাধ্যমে জুরাইন কবরস্থানে তাকে বেওয়ারিশ হিসেবে দাফনের জন্য পাঠানো হয়।
হাসপাতালে মরদেহ হস্তান্তরের সময় উপস্থিত ছিলেন ছোটমণি নিবাসের উপতত্ত্বাবধায়ক তানজিনা আফরিন, প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তা এবং হাসপাতালের সমাজসেবা বিভাগের প্রতিনিধিরা। তবে মাহিরের মরদেহের পাশে ছিলেন না কোনো আত্মীয়স্বজন। ছোট্ট মরদেহটি বহনের জন্য খাটিয়ারও প্রয়োজন হয়নি; কোলে করেই অ্যাম্বুলেন্সে তোলা হয়।
সমাজসেবা অধিদপ্তরের তত্ত্বাবধানে পরিচালিত ছোটমণি নিবাসে পিতৃ-মাতৃ পরিচয়হীন, পরিত্যক্ত অথবা পাচার থেকে উদ্ধার হওয়া শূন্য থেকে সাত বছর বয়সী শিশুদের লালন-পালন করা হয়। বর্তমানে আজিমপুরের নিবাসটিতে ৩৮ জন শিশু রয়েছে। দেশজুড়ে ঢাকা, চট্টগ্রাম, রাজশাহী, সিলেট, খুলনা ও বরিশালে মোট ছয়টি ছোটমণি নিবাস পরিচালিত হচ্ছে।
নিবাস কর্তৃপক্ষ জানায়, মাহিরকে প্রথমে সংক্রামক ব্যাধি হাসপাতালে প্রায় দুই মাস চিকিৎসা দেওয়া হয়। পরে অবস্থার অবনতি হলে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল এবং সেখান থেকে আইসিইউ সুবিধার জন্য একটি বিশেষায়িত হাসপাতালে স্থানান্তর করা হয়। চিকিৎসাধীন অবস্থায় সেখানেই তার মৃত্যু হয়।
সমাজসেবা অধিদপ্তরের পরিচালক (প্রতিষ্ঠান) সমীর মল্লিক জানান, হামের প্রাদুর্ভাবের পর থেকে আজিমপুর ছোটমণি নিবাসে মাহিরসহ মোট পাঁচ শিশু হাম ও হাম-সংক্রান্ত জটিলতায় মারা গেছে। বর্তমানে নিবাসের কোনো শিশু হামজনিত জটিলতায় হাসপাতালে ভর্তি নেই এবং দেশের অন্য কোনো ছোটমণি নিবাসে এ ধরনের মৃত্যুর খবর পাওয়া যায়নি।
কর্তৃপক্ষের তথ্য অনুযায়ী, আজিমপুর নিবাসের প্রায় ২০ জন শিশুকে হাম, হাম-পরবর্তী জটিলতা এবং বসন্তজনিত সমস্যায় বিভিন্ন হাসপাতালে ভর্তি করে চিকিৎসা দেওয়া হয়েছিল।
মৃত পাঁচ শিশুর মধ্যে তিন মাস ১৮ দিনের মুনা, নয় মাসের খুশবু, এক বছরের বেশি বয়সী আরিশা এবং পাঁচ মাসের মেহেদীও রয়েছে। তাদের প্রত্যেকেই হাম ও সংশ্লিষ্ট জটিলতায় চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যায়। কারও মা মানসিক ভারসাম্যহীন ছিলেন, কারও বাবা কারাগারে, আবার কেউ জন্মের পরপরই পরিত্যক্ত অবস্থায় উদ্ধার হয়েছিল। পরিচিত স্বজন বা আইনগত দাবিদার না থাকায় প্রয়োজনীয় পুলিশি ও আদালতের প্রক্রিয়া শেষে তাদের বেওয়ারিশ হিসেবে দাফন করা হয়।
নিবাসের উপতত্ত্বাবধায়ক তানজিনা আফরিন বলেন, একসঙ্গে বিভিন্ন বয়সের বহু শিশুকে একই প্রতিষ্ঠানে রাখায় হামের মতো অত্যন্ত সংক্রামক রোগ নিয়ন্ত্রণ করা কঠিন হয়ে পড়ে। হামের পাশাপাশি স্ক্যাবিসসহ বিভিন্ন সংক্রামক ও অপুষ্টিজনিত সমস্যাও রয়েছে। জনবল সংকটের মধ্যেও শিশুদের চিকিৎসা, পুষ্টি ও পরিচর্যায় সর্বোচ্চ চেষ্টা করা হচ্ছে। তবে কোনো শিশু মারা গেলে পরিবার বা দাবিদার না থাকায় আইন অনুযায়ী বেওয়ারিশ হিসেবেই দাফনের ব্যবস্থা করতে হয়।
তিনি আরও জানান, প্রতিটি মৃত্যুর ক্ষেত্রে থানায় সাধারণ ডায়েরি, প্রয়োজনীয় আদালতের অনুমতি, ময়নাতদন্ত অব্যাহতির আবেদন (যেখানে প্রযোজ্য) এবং আঞ্জুমান মুফিদুল ইসলামের মাধ্যমে দাফনের মতো আইনি প্রক্রিয়া অনুসরণ করা হয়।
শিশুদের এই ধারাবাহিক মৃত্যু সরকারি আশ্রয়কেন্দ্রে সংক্রামক রোগ প্রতিরোধ, পর্যাপ্ত স্বাস্থ্যসেবা, জনবল ও অবকাঠামোগত সক্ষমতা নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন তুলেছে। একই সঙ্গে পরিবারহীন শিশুদের জীবনের শেষ বিদায়েও স্বজনশূন্যতার নির্মম বাস্তবতা সামনে এনেছে।