নিজস্ব প্রতিবেদক, সিরাজগঞ্জ:
সিরাজগঞ্জের উল্লাপাড়া উপজেলার বাঙ্গালা ইউনিয়নের চেংটিয়া মধ্যপাড়া গ্রামে পুকুর সংস্কারের সময় একটি কষ্টিপাথরের দুর্গা মূর্তি উদ্ধার হয়েছে। বুধবার সকালে বড় আনন্দার পুকুর খননের সময় এক্সাভেটর (ভেকু) মেশিনের বাকেটের সঙ্গে মূর্তিটি উঠে আসে।

স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, পুকুর খননের কাজ চলাকালে হঠাৎ মাটির নিচ থেকে কালো রঙের একটি প্রাচীন মূর্তি বেরিয়ে আসে। পরে বিষয়টি এলাকায় ছড়িয়ে পড়লে উৎসুক জনতা ঘটনাস্থলে ভিড় জমায়। অনেকেই ধারণা করছেন, এটি বহু পুরোনো কষ্টিপাথরের তৈরি দুর্গা মূর্তি।
খবর পেয়ে উল্লাপাড়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মো. রায়হানুল হক আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যদের নিয়ে ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেন। পরে মূর্তিটি উদ্ধার করে সরকারি হেফাজতে নেওয়া হয়।

এ বিষয়ে উপজেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, মূর্তিটির প্রকৃত পরিচয়, বয়স ও ঐতিহাসিক গুরুত্ব নির্ধারণে সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞদের সঙ্গে যোগাযোগ করা হবে।
ঘটনাটি এলাকায় ব্যাপক চাঞ্চল্যের সৃষ্টি করেছে। স্থানীয়দের অনেকেই মূর্তিটি দেখতে ঘটনাস্থলে ভিড় করছেন।
কষ্টিপাথর কী?
কষ্টিপাথর হলো এক ধরনের বিশেষ কালো বা গাঢ় ধূসর রঙের শক্ত পাথর, যা খুব মসৃণ এবং টেকসই। বাংলায় একে সাধারণত “কষ্টি পাথর” বলা হয়। ইংরেজিতে এটি মূলত টাচস্টোন (Touchstone) নামে পরিচিত। অতীতে স্বর্ণকাররা সোনা-রুপার বিশুদ্ধতা যাচাই করতে এই পাথর ব্যবহার করতেন।
এ ধরনের পাথর দিয়ে প্রাচীন যুগে দেবদেবীর মূর্তি, ভাস্কর্য ও অলংকারও তৈরি করা হতো, কারণ এতে সূক্ষ্ম কারুকাজ করা সহজ এবং দীর্ঘদিন নষ্ট হয় না। বাংলাদেশ ও ভারতের অনেক পুরাতাত্ত্বিক স্থানে কষ্টিপাথরের তৈরি মূর্তি পাওয়া গেছে।
তবে “কয়েক কোটি টাকার কষ্টিপাথরের মূর্তি” — এমন দাবি প্রায়ই শোনা গেলেও, প্রকৃত মূল্য নির্ধারণ করে প্রত্নতত্ত্ব বিভাগ ও বিশেষজ্ঞরা। ঐতিহাসিক গুরুত্ব, বয়স, কারুকাজ ও সংরক্ষণের অবস্থার ওপর এর মূল্য নির্ভর করে।
কষ্টিপাথরের মূর্তি নিয়ে গ্রামাঞ্চলে ও সামাজিক মাধ্যমে অনেক জনশ্রুতি প্রচলিত আছে। বিশেষ করে বলা হয়—
- এগুলোর দাম “কয়েক কোটি” বা “শত কোটি টাকা”
- বিদেশিরা গোপনে কিনে নেয়
- পুরোনো মূর্তির মধ্যে অলৌকিক শক্তি আছে
- নির্দিষ্ট ধাতু বা আলো ধরলে বিশেষ প্রতিক্রিয়া দেয়
- “আন্তর্জাতিক কালোবাজারে” বিশাল চাহিদা রয়েছে
বাস্তবতা কী?
বাস্তবে অধিকাংশ দাবিই অতিরঞ্জিত বা গুজবভিত্তিক।
- কষ্টিপাথর নিজে খুব দুষ্প্রাপ্য কোনো জাদুকরী পাথর নয়।
- সব কষ্টিপাথরের মূর্তির বাজারমূল্য বিপুল হয় না।
- প্রত্নতাত্ত্বিক গুরুত্ব থাকলে সেটির ঐতিহাসিক মূল্য বেশি হতে পারে, কিন্তু সেটি নির্ধারণ করেন বিশেষজ্ঞরা।
- বাংলাদেশে প্রত্নসম্পদ আইন অনুযায়ী প্রাচীন প্রত্নবস্তু ব্যক্তিগতভাবে কেনাবেচা বা পাচার করা অবৈধ।
- অনেক সময় দালালচক্র “কোটি টাকার মূর্তি” গল্প ছড়িয়ে মানুষকে প্রতারণা করে। কেউ কেউ আগাম টাকা, “পরীক্ষার খরচ” বা “ক্রেতা আনতে ফি” নেওয়ার চেষ্টা করে।
কেন এত গুজব ছড়ায়?
১. প্রাচীন জিনিস নিয়ে মানুষের কৌতূহল
২. সিনেমা ও লোককাহিনির প্রভাব
৩. অবৈধ পুরাকীর্তি পাচারের গল্প
৪. দ্রুত ধনী হওয়ার আশা
বাস্তব উদাহরণ
বাংলাদেশ ও ভারতে বহুবার দেখা গেছে, “কোটি টাকার কষ্টিপাথর” বলে প্রচার হওয়া বস্তু পরে সাধারণ পাথর বা কম মূল্যমানের প্রত্নবস্তু হিসেবে শনাক্ত হয়েছে। আবার কিছু সত্যিকারের প্রাচীন মূর্তি জাদুঘর বা রাষ্ট্রীয় সংরক্ষণে নেওয়া হয়েছে, কিন্তু সেগুলোর বাণিজ্যিক বিক্রি সাধারণ মানুষের মাধ্যমে হয়নি।
তাই কোনো কষ্টিপাথরের মূর্তি পাওয়া গেলে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো:
- প্রশাসন বা প্রত্নতত্ত্ব বিভাগকে জানানো
- গুজব বা দালালচক্র থেকে দূরে থাকা
- ঐতিহাসিক সম্পদ হিসেবে সংরক্ষণ করা।