কেকা অধিকারী

ভালো লাগে এবং ভীষণ ভালো লাগে যখন জানি কেউ আমার জন্য অপেক্ষা করছে। প্রায়ই একটা ফোন আসে আমার কাছে – আমার জন্য অপেক্ষা করা একজন মানুষের ফোন, ভিক্ষা করে জীবন চালান তিনি। নাম শফিকুল ইসলাম। এই বৃদ্ধ ভিখারীর সাথে সোনাডাঙা, শিববাড়ির মোড়সহ আশেপাশের বেশ কিছু জায়গায় ঘুরে বেড়িয়েছি আমি, যখন চাকরি সূত্রে বেশ ক’বছর খুলনায় ছিলাম। তার ভিন্ন জীবনের গল্প আমাকে সব সময়ই আকর্ষণ করে। ফোনের ওপার থেকে পরম আন্তরিক গলা শুনতে পাই। সে কন্ঠটি নরম স্বরে জানতে চায়
– কবে খুলনা আসবেন? অনেক দিন তো আসেন না।
গত সপ্তায়ও তিনি ফোন করেছিলেন। কিন্তু ধরতে পারিনি। কল ব্যাকও করা হয়নি। তাই গতকাল সন্ধ্যায় যশোরে প্লেন থেকে নেমে লাগেজের জন্য ওয়েট করতে করতে ফোনটা দিয়ে দিলাম,
– কেমন আছেন আপনি?
– ভালো। কোথায় আপনি?
– খুলনায় আসছি। রাতে পৌঁছে যাব। শোনেন, একটা জিনিস চাইব আপনার কাছে। খাবার জিনিস। আপনি তো আমাকে শুধু নিজ হাতে রান্না করে খাওয়াতে চান। দেখব এটা খাওয়াতে পারেন কী না। অবশ্য রান্না করতে হবে না।
একটু আগে ফেসবুকে কার পোস্টে যেন খইফল দেখেছিলাম। এটা খুলনায় ফলে। দেরী না করে খইফলের বর্ণনা দিয়ে সেটাই খাওয়ার আবদার করলাম।

শৈশবে আমাদের স্বল্পকালীন খুলনা বাসের সময়ে এ ফলটি খেয়েছি। অদ্ভুত ভাবে প্যাঁচানো ফল গাছে ঝুলতেও দেখেছি। বাবা দুএকবার কিনে এনেছেন। সিজনাল সব ফল কেনার অভ্যাস ছিল বাবার। পানিফল, তালশাঁস কোন কিছুই কিনতে ভুল করতেন না। কিন্তু খই খেয়ে মন ভরেনি আমার। আরও খেতে মন চাইতো। রাস্তা, ঘাটে, স্কুলের সামনে, পথে চলতে যখনই দেখতাম খুব খেতে ইচ্ছে করতো। লোভ করা বারণ ছিল। তাই লোভ ছিল অপ্রকাশিত। খুব একটা আবদার করার স্বভাবও ছিল না। আর যেহেতু হাতে টাকা পয়সা দেয়া হতো না তাই মন ভরে খইফল খাওয়া হয়নি সে সময়। বলিনি বলে বাবা জানতেই পারেননি মেয়েটা তার খইফল খাওয়ার ইচ্ছে মনের মধ্যে বন্ধ করে রেখেছে। হয়তো তার সাধ অপূর্ণই থেকে যাবে। পূরণ হবে না কখনও।
তারপর অনেক যুগ পরে একসময় নিজে খুলনা এলাম চাকরি নিয়ে। তখনও মনে মনে ভাবতাম, এবার মন ভরে খইফল খাব। কিন্তু সোনাডাঙা সেকেন্ড ফেজের ফলওয়ালাদের কাছে এ ফল কোনদিন দেখিনি। স্থানীয় কলিগদের অনুরোধ করেছি এনে দিতে। কেউ দেননি। তারাও হয় তো বাবার মতো বুঝতে পারেননি আমি কতোটা লোভাতুরের মতো এ ফল খেতে চাইতাম!
আজ সকাল আটটায় তার ফোন পেলাম। জিজ্ঞেস করলেন
– আপনি কোথায়?
– হোটেলে। কেন, কিছু বলবেন? একটু পর অফিসে যাব।
– আপনার জন্য খইফল যোগাড় করেছি। কখন নেবেন?
ইফতারের আগে তাকে তার নির্ধারিত জায়গা, হোটেল সিটি ইনের সামনে পেয়ে গেলাম। গত বছর থেকে তিনি এখানে বসেই ভিক্ষা করেন। আমার জন্য অপেক্ষা করছিলেন। কাছে আসতে নীরব উত্তেজনায় মিষ্টি হেসে আমার হাতে এক পলিব্যাগ ভরা খইফল তুলে দিলেন। আহা আমার সাধের খইফল! সবুজ গোলাপি রঙের মধ্যে উঁকি দিচ্ছে সাদা সাদা শৈশবে দেখা সেই কাঙ্ক্ষিত ফলের শাঁস।
রোজা রাখা মানুষটি ভোরে ঘুম থেকে উঠে খুঁজতে বেরিয়েছেন আমার খইফল। তিন বাজার ঘুরেও এ ফলের দেখা পাননি তিনি। অবশেষে কিনতে না পেরে ফল ভরা গাছ খুঁজেছেন। এক জায়গায় খুঁজে পেতে তারপর এক বালককে টাকা দিয়ে গাছে উঠিয়ে পরে যোগাড় করলেন আমার আবদারের বিশেষ খাবার।
মৃদু স্বরে ফল সংগ্রহের গল্প শেষ করে সাথে আরও একটু যোগ করলেন,
– এগুলি ঢাকায় নিয়ে যাবেন। সাদা অংশটুকু আলাদা করে চিংড়ি মাছ দিয়ে রেঁধে খাবেন। ভালো লাগবে।
আজ দুপুরে আমার খাওয়া হয়নি। ভীষণ ক্ষুধা লেগেছিল। হোটেলে ফিরে দেরি না করে বোতলের জলে ধুয়ে খেলাম সেই ফল, আমার লোভজড়ানো খইফল। আয়রন আছে বুঝতে পারছি। একটু খেতেই পেট ভরে গেছে। তবে পেট না যতোটা ভরেছে, মন ভরেছে তারচেয়ে অনেক বেশি।
অনেক ধন্যবাদ বন্ধু আমার। ভালো থাকবেন প্রিয় শফিকুল ইসলাম।