বৃহস্পতিবার, রাত ১০:৩৬, ১০ই বৈশাখ, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

বৃহস্পতিবার, রাত ১০:৩৬, ১০ই বৈশাখ, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

গুপ্ত রাজনীতির করচা

ডঃ সাইফুদ্দীন একরাম

গুপ্ত রাজনীতি – শব্দটা শুনলেই এক ধরনের রহস্য, এক ধরনের ছায়া-নাটকের অনুভূতি আসে। চোখের সামনে যা দেখি, তার পেছনে যে অদৃশ্য স্রোতধারা বয়ে চলে, সেটাই যেন গুপ্ত রাজনীতি। ক্ষমতার লড়াই, প্রভাবের খেলা, আর সিদ্ধান্তের অদৃশ্য নির্মাণ – সব মিলিয়ে এটি রাজনীতির এক নীরব কিন্তু শক্তিশালী স্তর।

প্রথমে একটু পেছনে যাওয়া যাক। ইতিহাস বলছে, রাজনীতি কখনোই পুরোপুরি প্রকাশ্য ছিল না। প্রাচীন ভারতীয় রাষ্ট্রচিন্তক কৌটিল্য তার বিখ্যাত গ্রন্থ অর্থশাস্ত্র-এ স্পষ্টভাবে বলেছেন, রাষ্ট্র পরিচালনায় গোপনচর, কৌশল, এবং অদৃশ্য প্রভাব অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। রাজা শুধু দৃশ্যমান শক্তি দিয়ে নয়, অদৃশ্য তথ্য আর কৌশলের মাধ্যমে ক্ষমতা ধরে রাখে। এই ধারণাই গুপ্ত রাজনীতির ভিত্তি। একইভাবে ইউরোপীয় রাজনৈতিক চিন্তায় নিকোলো মাকিয়াভেলি তার দ্য প্রিন্স-এ দেখিয়েছেন, ক্ষমতা টিকিয়ে রাখতে হলে অনেক সময় এমন সিদ্ধান্ত নিতে হয় যা প্রকাশ্যে বলা যায় না। নৈতিকতা আর বাস্তবতার মাঝখানে যে সূক্ষ্ম রেখা, সেখানে দাঁড়িয়েই গুপ্ত রাজনীতি কাজ করে। এখন যদি আমরা আধুনিক যুগে আসি, দেখব এই গুপ্ত রাজনীতি শুধু রাজা বা শাসকের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। রাষ্ট্র, কর্পোরেট, এমনকি আন্তর্জাতিক সম্পর্কেও এটি গভীরভাবে প্রোথিত। উদাহরণ হিসেবে CIA বা অতীতে KGB-এর কার্যক্রমের কথা বলা যায়। ঠাণ্ডা যুদ্ধের সময় এই সংস্থাগুলো সরাসরি যুদ্ধের বদলে তথ্য, প্রভাব, এবং গোপন অপারেশনের মাধ্যমে বিশ্ব রাজনীতিকে প্রভাবিত করেছে। কিন্তু প্রশ্ন আসে, এই গুপ্ত রাজনীতি কি সবসময় নেতিবাচক? উত্তরটা এত সহজ নয়। একদিকে, গুপ্ত রাজনীতি কখনো কখনো রাষ্ট্রকে বড় বিপদ থেকে রক্ষা করে। গোপন কূটনীতি, ব্যাক-চ্যানেল আলোচনা, বা নিরাপত্তা সংক্রান্ত গোপন তথ্য বিনিময় – এসব ছাড়া অনেক বড় সংঘাত এড়ানো সম্ভব হতো না। উদাহরণ হিসেবে, কিউবান মিসাইল সংকট-এর সময় যুক্তরাষ্ট্র ও সোভিয়েত ইউনিয়নের মধ্যে গোপন আলোচনাই বিশ্বকে একটি সম্ভাব্য পারমাণবিক যুদ্ধ থেকে বাঁচিয়েছিল। ভারতের স্বাধীনতার জন্য স্বদেশী শক্তি গুপ্ত রাজনীতি করেছে, বাংলাদেশেও অনেক বাম রাজনৈতিক দল গুপ্ত রাজনীতির মাধ্যমেই টিকে ছিল।

অন্যদিকে, এই একই গুপ্ত রাজনীতি ক্ষমতার অপব্যবহার, দুর্নীতি, এবং জনগণের আস্থা নষ্ট করার কারণও হতে পারে। যখন সিদ্ধান্তগুলো জনস্বার্থের বাইরে গিয়ে ব্যক্তিগত বা গোষ্ঠীগত স্বার্থে নেওয়া হয়, তখন এই গোপনীয়তা হয়ে ওঠে বিপজ্জনক। তাহলে সফলতা কোথায়? গুপ্ত রাজনীতির আসল সফলতা তখনই, যখন এটি দৃশ্যমান রাজনীতির সঙ্গে ভারসাম্য রাখে। যেখানে প্রয়োজন সেখানে গোপনীয়তা থাকবে, কিন্তু সেটি জনস্বার্থের বিরুদ্ধে যাবে না। একটি রাষ্ট্র বা নেতৃত্ব তখনই পরিপক্ব, যখন তারা জানে কখন আলোতে দাঁড়াতে হবে, আর কখন ছায়ায় কাজ করতে হবে। শেষ পর্যন্ত, গুপ্ত রাজনীতি আসলে মানুষের মনস্তত্ত্ব, ক্ষমতার আকাঙ্ক্ষা, এবং নিরাপত্তার চাহিদার এক জটিল মিশ্রণ। এটি পুরোপুরি ভালো নয়, আবার পুরোপুরি খারাপও নয়। এটি এক ধরনের প্রয়োজনীয় বাস্তবতা – যা সঠিক হাতে শক্তি, আর ভুল হাতে বিপদ। আর হয়তো এটাই সত্য যে রাজনীতির সবচেয়ে বড় ঘটনাগুলো কখনো মঞ্চে নয়, বরং পর্দার আড়ালেই সংঘটিত হয়।

লেখকঃ গবেষক ও চিকিৎসক

মন্তব্য করুন

আপনার ইমেইল ঠিকানা প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত ক্ষেত্রগুলো আবশ্যক।

Scroll to Top