রবিবার, রাত ২:৪০, ১০ই জ্যৈষ্ঠ, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

রবিবার, রাত ২:৪০, ১০ই জ্যৈষ্ঠ, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

হোম তথ্য ও প্রযুক্তি

মহাবিশ্বের প্রথম নক্ষত্রের সন্ধান? জেমস ওয়েব টেলিস্কোপে ধরা পড়ল ১৩ বিলিয়ন বছর পুরোনো ‘ফসিল’ গ্যালাক্সি LAP1-B

শেয়ার: https://www.timebulletin24.com/news/vtnvwk

ডেস্ক রিপোর্ট

ঢাকা, ২৪ মে ২০২৬: মহাবিশ্বের সৃষ্টিরহস্য উন্মোচনে জ্যোতির্বিজ্ঞানের ইতিহাসে এক যুগান্তকারী মাইলফলক স্পর্শ করল নাসা (NASA)-এর জেমস ওয়েব স্পেস টেলিস্কোপ (JWST) [1]। গভীর মহাবিশ্বে সন্ধান মিলেছে অত্যন্ত প্রাচীন এবং অতি-ঝাপসা (Ultra-Faint) এক বামন গ্যালাক্সির, যার নাম দেওয়া হয়েছে LAP1-B [1, 2]। বিজ্ঞানীদের মতে, এটি কোনো সাধারণ গ্যালাক্সি নয়, বরং এটি একটি “মহাজাগতিক জীবাশ্ম” (Cosmic Fossil)।

বিজ্ঞানীদের দাবি, এই গ্যালাক্সিটি থেকে যে আলো আজ পৃথিবীতে এসে পৌঁছেছে, তা প্রায় ১৩ বিলিয়ন (১৩০০ কোটি) বছর আগের [1, 2]। অর্থাৎ, বিগ ব্যাং বা মহাবিস্ফোরণের মাত্র ৮০০ মিলিয়ন বছর পরের আলো এটি [2]। এই গ্যালাক্সির তারাগুলোর বয়স ১২ বিলিয়ন বছরেরও বেশি এবং এর মধ্যে মহাবিশ্বের ইতিহাসের প্রথম প্রজন্মের নক্ষত্র বা পপুলেশন ৩ (Population III) স্টার লুকিয়ে থাকতে পারে বলে জোরালো প্রমাণ মিলেছে [2]。

কীভাবে ধরা পড়ল এই ঝাপসা গ্যালাক্সি?
মহাবিশ্বের এত দূরের এবং অস্পষ্ট একটি অবয়ব সাধারণ পদ্ধতিতে দেখা অসম্ভব ছিল। কিন্তু প্রকৃতির নিজস্ব এক চমৎকার কৌশলে এটি সম্ভব হয়েছে, যাকে পদার্থবিজ্ঞানের ভাষায় মহাকর্ষীয় লেন্সিং (Gravitational Lensing) বলা হয়। পৃথিবী এবং LAP1-B এর ঠিক মাঝখানে অবস্থিত ‘MACS J0416’ নামক একটি বিশাল গ্যালাক্সি ক্লাস্টার তার তীব্র মাধ্যাকর্ষণ শক্তির মাধ্যমে পেস্থনের LAP1-B থেকে আসা আলোকে প্রায় ১০০ গুণ বাড়িয়ে (Magnify) দিয়েছে [2]। এই প্রাকৃতিক আতশিকাচের সহায়তায় জেমস ওয়েব টেলিস্কোপ এর নিখুঁত ইনফ্রারেড স্পেকট্রাম ধারণ করতে সক্ষম হয় [2]।

কেন এই আবিষ্কার এত গুরুত্বপূর্ণ?
বিজ্ঞান সাময়িকী Nature এবং The Astrophysical Journal Letters-এ প্রকাশিত গবেষণাপত্র অনুযায়ী, LAP1-B গ্যালাক্সিটি বর্তমান জ্যোতির্বিজ্ঞানের বেশ কিছু থিওরি বা তত্ত্বকে সরাসরি প্রমাণ করে [2]।

প্রথমত, এই গ্যালাক্সির গ্যাস ক্লাউডে অক্সিজেনের মাত্রা সূর্যের তুলনায় মাত্র ০.০০৪ গুণ [2]! জ্যোতির্বিজ্ঞানী অধ্যাপক মাসামি ওউচি (Masami Ouchi) জানান, এতে ভারী কোনো মৌলিক উপাদান (ধাতু) নেই [2]। এটি সম্পূর্ণ আদিম হাইড্রোজেন ও হিলিয়াম গ্যাস দ্বারা গঠিত, যা বিগ ব্যাং-এর ঠিক পর মুহূর্তের পরিবেশকে নির্দেশ করে [2]।

দ্বিতীয়ত, গ্যালাক্সিটি থেকে তীব্র আয়োনাইজিং বা অতিবেগুনী রশ্মি নির্গত হচ্ছে [2]। বিজ্ঞানীরা বলছেন, এটি কেবল তখনই সম্ভব যদি সেখানে প্রথম প্রজন্মের এমন কিছু নক্ষত্র থাকে যা আমাদের সূর্যের চেয়ে প্রায় ১০০ গুণ বেশি ভরসম্পন্ন এবং অত্যন্ত উত্তপ্ত [2]।

তৃতীয়ত, গতিশীল ভর বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, এই গ্যালাক্সিটির নিজস্ব তারার ভর (Stellar Mass) অত্যন্ত কম (৩,৩০০ সৌর ভরের নিচে) হলেও এটি একটি বিশাল এবং শক্তিশালী ডার্ক ম্যাটার হ্যালো (Dark Matter Halo) দ্বারা আবৃত [2]।

মিল্কিওয়ের পূর্বপুরুষের সন্ধান
বিজ্ঞানীরা অত্যন্ত বিস্মিত হয়েছেন কারণ এই LAP1-B গ্যালাক্সিটির গঠন ঠিক আমাদের নিজস্ব মিল্কিওয়ে গ্যালাক্সির আশেপাশে থাকা আধুনিক অতি-ঝাপসা বামন গ্যালাক্সিগুলোর (UFDs) মতো [2]। এত বছর ধরে বিজ্ঞানীরা কেবল তাত্ত্বিকভাবে ধারণা করতেন যে আজকের বামন গ্যালাক্সিগুলো হয়তো প্রাচীন কোনো গ্যালাক্সির অবশিষ্টাংশ [2]। LAP1-B আবিষ্কারের মাধ্যমে সেই ধারণার বাস্তব প্রমাণ মিলল [2]।

মহাবিশ্বের প্রথম আলো কীভাবে জ্বলে উঠেছিল, কীভাবে প্রথম রাসায়নিক উপাদানগুলো ছড়িয়ে পড়েছিল এবং পরবর্তীতে কীভাবে গ্যালাক্সি, গ্রহ বা জীবনের অনুকূল পরিবেশ তৈরি হয়েছিল—তার সম্পূর্ণ ব্লুপ্রিন্ট বা নকশা এখন এই LAP1-B গ্যালাক্সিটির মাধ্যমে উন্মোচিত হতে চলেছে [2]।

মন্তব্য করুন

আপনার ইমেইল প্রকাশ করা হবে না। * চিহ্নিত ঘরগুলো আবশ্যক।

শেয়ার করুন