মঙ্গলবার, বিকাল ৪:০৯, ৮ই বৈশাখ, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

মঙ্গলবার, বিকাল ৪:০৯, ৮ই বৈশাখ, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

মহাবিশ্ব সৃষ্টিতে ডার্ক ম্যাটার 

ডার্ক ম্যাটার (Dark Matter) বা অদৃশ্য বস্তু নিয়ে সাম্প্রতিক প্রতিবেদনগুলোতে মহাবিশ্বের এই রহস্যময় উপাদানটি সম্পর্কে বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ তথ্য উঠে এসেছে। মহাবিশ্বের প্রায় ২৭% হলো ডার্ক ম্যাটার, অথচ এটি সরাসরি দেখা যায় না কারণ এটি আলো প্রতিফলন বা শোষণ করে না।

সাম্প্রতিক সময়ের প্রধান কিছু আপডেট নিচে দেওয়া হলো:

১. সাম্প্রতিক বৈজ্ঞানিক অগ্রগতি

  • ফার্মি টেলিস্কোপের তথ্য: নাসা-র ‘ফার্মি গামা-রে স্পেস টেলিস্কোপ’-এর ১৫ বছরের তথ্য বিশ্লেষণ করে বিজ্ঞানীরা আকাশগঙ্গার কেন্দ্রে এক ধরণের উচ্চ-শক্তির গামা রশ্মির সন্ধান পেয়েছেন। ধারণা করা হচ্ছে, ডার্ক ম্যাটার কণাগুলো একে অপরের সাথে সংঘর্ষে লিপ্ত হয়ে ধ্বংস হওয়ার ফলে এই রশ্মি তৈরি হতে পারে।
  • জেমস ওয়েব টেলিস্কোপের (JWST) ভূমিকা: এই শক্তিশালী টেলিস্কোপটি ‘গ্র্যাভিটেশনাল লেন্সিং’ (মহাকর্ষীয় লেন্সিং) ব্যবহার করে ডার্ক ম্যাটারের ম্যাপিং করছে। ডার্ক ম্যাটারের বিপুল ভরের কারণে মহাকাশের আলো যেভাবে বেঁকে যায়, তা পর্যবেক্ষণ করে এর অবস্থান বোঝার চেষ্টা চলছে।

২. ডার্ক ম্যাটার কী?

বিজ্ঞানীরা মনে করেন ডার্ক ম্যাটার সাধারণ প্রোটন, নিউট্রন বা ইলেকট্রন দিয়ে তৈরি নয়। এর প্রধান বৈশিষ্ট্যগুলো হলো:

মহাবিশ্ব সৃষ্টিতে ডার্ক ম্যাটার (Dark Matter) এর ভূমিকা অনেকটা পাখির পালকের মতো হালকা নয়, বরং এটি ছিল একটি বিশাল কাঠামো বা কঙ্কাল, যার ওপর ভিত্তি করে আজকের দৃশ্যমান মহাবিশ্ব দাঁড়িয়ে আছে। এর সৃষ্টির খুঁটিনাটি নিচে তুলে ধরা হলো:

১. মহাবিশ্বের আদি কাঠামো (The Cosmic Blueprint)

বিগ ব্যাং-এর ঠিক পরেই মহাবিশ্ব ছিল অত্যন্ত উত্তপ্ত এবং ঘন। সেই সময় সাধারণ পদার্থ (তড়িৎচৌম্বক বিকিরণের চাপে) স্থির হতে পারছিল না। কিন্তু ডার্ক ম্যাটার আলোর সাথে কোনো বিক্রিয়া করে না বলে এটি দ্রুত জমাট বাঁধতে শুরু করে। এটি অনেকটা জালের মতো ছড়িয়ে পড়ে, যা ‘কসমিক ওয়েব’ (Cosmic Web) নামে পরিচিত।

২. অভিকর্ষের কারিগর

ডার্ক ম্যাটারের এই অদৃশ্য জাল বা ‘পাখির পালকের মতো সূক্ষ্ম তন্তুগুলো’ তাদের মহাকর্ষ বল দিয়ে সাধারণ গ্যাস এবং ধূলিকণাকে টেনে আনতে শুরু করে। এই জমাট বাঁধা ডার্ক ম্যাটারের মাঝখানেই জন্ম নেয় প্রথম নক্ষত্র এবং গ্যালাক্সি। যদি ডার্ক ম্যাটার না থাকত, তবে সাধারণ পদার্থগুলো মহাবিশ্বে সমানভাবে ছড়িয়ে পড়ত এবং কোনো গ্যালাক্সি তৈরি হতো না।

৩. গ্যালাক্সির সুরক্ষা কবচ

প্রতিটি গ্যালাক্সির চারপাশে ডার্ক ম্যাটারের একটি বিশাল বলয় বা ‘হ্যালো’ (Halo) থাকে। এটি গ্যালাক্সিগুলোকে তাদের আকৃতি ধরে রাখতে সাহায্য করে। নক্ষত্রগুলো যে প্রচণ্ড গতিতে ঘোরে, ডার্ক ম্যাটারের টান না থাকলে সেগুলো পালকের মতো উড়ে মহাকাশে হারিয়ে যেত।

৪. আধুনিক গবেষণার তথ্যাদি

সাম্প্রতিক প্রতিবেদন অনুযায়ী, বিজ্ঞানীরা আদি মহাবিশ্বের এমন কিছু গ্যালাক্সি খুঁজে পেয়েছেন যেগুলোতে ডার্ক ম্যাটারের পরিমাণ অনেক বেশি। এটি প্রমাণ করে যে, মহাবিশ্বের শৈশবে ডার্ক ম্যাটারই ছিল মূল চালিকাশক্তি।

ডার্ক ম্যাটার কীভাবে গ্যালাক্সিগুলোকে ধরে রাখে, তার প্রক্রিয়াটি বেশ রোমাঞ্চকর। বিজ্ঞানের ভাষায় একে বলা হয় ‘মহাকর্ষীয় আঠা’ (Gravitational Glue)। নিচে সহজভাবে এর ধাপগুলো দেওয়া হলো:

১. ঘূর্ণন গতির রহস্য (The Rotation Problem)

১৯৭০-এর দশকে জ্যোতির্বিজ্ঞানী ভেরা রুবিন লক্ষ্য করেন যে, গ্যালাক্সির বাইরের দিকের নক্ষত্রগুলো অত্যন্ত দ্রুত গতিতে ঘুরছে। পদার্থবিজ্ঞানের সাধারণ নিয়ম অনুযায়ী, কেন্দ্রের চেয়ে দূরের নক্ষত্রগুলোর গতি কম হওয়ার কথা ছিল (যেমনটা আমাদের সৌরজগতে সূর্যের দূরের গ্রহগুলোর ক্ষেত্রে হয়)।

২. ডার্ক ম্যাটার ‘হ্যালো’ (Dark Matter Halo)

বিজ্ঞানীরা আবিষ্কার করেন যে, প্রতিটি গ্যালাক্সি আসলে একটি বিশাল এবং অদৃশ্য ডার্ক ম্যাটারের গোলকের ভেতর অবস্থিত। একে বলা হয় ‘ডার্ক ম্যাটার হ্যালো’

  • এই হ্যালোটির ভর দৃশ্যমান নক্ষত্রগুলোর ভরের চেয়ে অনেক বেশি (প্রায় ৫ থেকে ১০ গুণ)।
  • এই অতিরিক্ত ভর একটি শক্তিশালী মহাকর্ষ বল তৈরি করে, যা দ্রুতগামী নক্ষত্রগুলোকে কক্ষপথে আটকে রাখে।

৩. কসমিক ওয়েব বা মহাজাগতিক জাল

ডার্ক ম্যাটার কেবল গ্যালাক্সির ভেতরেই নয়, বরং গ্যালাক্সিগুলোর মধ্যবর্তী শূন্যস্থানেও জালের মতো ছড়িয়ে আছে। এই জালটি অনেকটা মাউন্টেন গাইডের মতো কাজ করে; এটি মহাকর্ষের মাধ্যমে সাধারণ গ্যাস ও ধূলিকণাকে নির্দিষ্ট পথে পরিচালিত করে নতুন নক্ষত্র তৈরির পরিবেশ তৈরি করে।

৪. মহাকর্ষীয় লেন্সিং (Gravitational Lensing)

আমরা ডার্ক ম্যাটার দেখতে না পেলেও এর উপস্থিতি নিশ্চিত করি আলোর গতিপথ দেখে। যখন দূরের কোনো গ্যালাক্সির আলো আমাদের দিকে আসে, তখন মাঝপথে থাকা ডার্ক ম্যাটারের প্রবল মহাকর্ষ সেই আলোকে কিছুটা বাঁকিয়ে দেয়। এটি প্রমাণ করে যে সেখানে অদৃশ্য কোনো বিশাল বস্তু (ডার্ক ম্যাটার) আছে যা গ্যালাক্সিটির কাঠামো ধরে রেখেছে।

সংক্ষেপে: ডার্ক ম্যাটার হলো সেই অদৃশ্য শক্তি যা মহাবিশ্বের “সবকিছুকে ছিটকে যাওয়া থেকে রক্ষা করে”।

মন্তব্য করুন

আপনার ইমেইল ঠিকানা প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত ক্ষেত্রগুলো আবশ্যক।

Scroll to Top