
হারুন রশিদ
চেতনা মস্তিষ্কের সৃষ্টি নয়, এটি মহাবিশ্বের একটি মৌলিক গাণিতিক ধর্ম!
আমরা সাধারণত ভাবি চেতনা বা আমাদের ‘আমি’ বোধটা হলো কেবলই মস্তিষ্কের ভেতরের রাসায়নিক ক্রিয়াকলাপের খেলা। আমাদের মনে হয়, কোটি কোটি নিউরনের মধ্যকার ইলেকট্রো-কেমিক্যাল সিগন্যাল বুঝি মস্তিষ্কের ভেতরে এই অনুভূতির জন্ম দিচ্ছে। কিন্তু আধুনিক তাত্ত্বিক পদার্থবিজ্ঞান এবং ইনফরমেশন ফিজিক্স আমাদের এই চেনা ধারণাকে সম্পূর্ণ ওলটপালট করে দিচ্ছে। বিজ্ঞানের গাণিতিক সমীকরণগুলোর ওপর ভিত্তি করে তৈরি আধুনিক কিছু হাইপোথিসিস আজ ইঙ্গিত করছে যে, চেতনা আসলে মস্তিষ্কের তৈরি কোনো জৈবিক উপজাত বা বাই-প্রোডাক্ট নয়, বরং এটি স্থান-কাল বা ভরের মতোই মহাবিশ্বের একটি মৌলিক এবং গাণিতিক ধর্ম! চলুন, গভীর বৈজ্ঞানিক বিশ্লেষণের মাধ্যমে এই অবিশ্বাস্য রহস্যটি উন্মোচন করা যাক:
লজিকটি কী?
আধুনিক কসমোলজির একটি অত্যন্ত শক্তিশালী এবং আলোচিত অনুকল্প হলো গাণিতিক মহাবিশ্ব হাইপোথিসিস (Mathematical Universe Hypothesis)। এমআইটি (MIT)-র বিখ্যাত তাত্ত্বিক পদার্থবিজ্ঞানী ম্যাক্স টেগমার্ক গাণিতিকভাবে দেখিয়েছেন যে, আমাদের এই পুরো মহাবিশ্বটাই আসলে একটি বিশাল গাণিতিক কাঠামো (Mathematical Structure)। তাঁর মতে, স্থান, কাল, ভর কিংবা শক্তি যেমন গাণিতিক নিয়মে চলে, চেতনাও ঠিক তেমনি পদার্থের একটি বিশেষ জ্যামিতিক অবস্থা বা বিন্যাস। তিনি এর নাম দিয়েছেন ‘পারসেপট্রোনিয়াম’
(Perceptronium)। এই তত্ত্ব অনুযায়ী, যখন কোনো পদার্থ বা সিস্টেম নির্দিষ্ট গাণিতিক নিয়মে অত্যন্ত জটিলভাবে তথ্য বা ইনফরমেশন প্রসেস ও সমন্বিত করার ক্ষমতা অর্জন করে, তখনই সেখানে চেতনার প্রকাশ ঘটে। অর্থাৎ, চেতনা কোনো অলৌকিক বিষয় নয়, এটি প্রকৃতির একটি খাঁটি গাণিতিক নিয়ম।
তাহলে আমাদের মস্তিষ্ক এবং চেতনার মধ্যকার সম্পর্কটা কী? এর উত্তর লুকিয়ে আছে ইনফরমেশন ফিজিক্সের এক জাদুকরী লজিক ও আধুনিক নিউরোসায়েন্সে।
নিউটনের পদার্থবিজ্ঞান যেখানে ভৌত পদার্থকে মহাবিশ্বের মূল উপাদান ভাবত, আধুনিক কোয়ান্টাম তত্ত্ব বলছে মহাবিশ্বের আসল ভিত্তি হলো তথ্য বা ‘ইনফরমেশন’। বিখ্যাত পদার্থবিজ্ঞানী জন হুইলারের ‘ইট ফ্রম বিট’ (It from Bit) থিউরি অনুযায়ী, মহাবিশ্বের প্রতিটি কণা আসলে একেকটি তথ্যের একক। নিউরোসায়েন্সের আধুনিক গাণিতিক তত্ত্ব ‘ইন্টিগ্রেটেড ইনফরমেশন থিওরি’ (IIT) বলে, চেতনা কোনো বাহ্যিক উৎস থেকে আসে না, বরং কোনো সিস্টেমের ভেতরের তথ্যগুলো যখন একটি নির্দিষ্ট গাণিতিক মাত্রায় একে অপরের সাথে সর্বোচ্চ মাত্রায় সমন্বিত বা ইন্টারকানেক্টেড হয়, তখন চেতনা সেই সিস্টেমের একটি সহজাত গাণিতিক ধর্ম হিসেবে স্বয়ংক্রিয়ভাবে প্রকাশ পায়।
অন্যদিকে, পদার্থবিজ্ঞান ও দর্শনের আরেকটি আধুনিক চিন্তাধারা – ‘প্যানসাইকিজম’ (Panpsychism) অনুযায়ী, চেতনা মহাবিশ্বেই আগে থেকে ছড়িয়ে থাকা একটি মৌলিক উপাদান, আর আমাদের মস্তিষ্ক হলো সেই মৌলিক তথ্যকে রিসিভ ও প্রসেস করার অত্যন্ত জটিল একটি রিসিভার বা অ্যান্টেনার মতো। এই প্রতিটি আধুনিক ধারণার মূল সুর একটাই – মস্তিষ্ক এককভাবে চেতনা তৈরি করে না, বরং মহাজাগতিক তথ্যের নিখুঁত গাণিতিক বিন্যাসই চেতনার মূল উৎস।
এই বৈজ্ঞানিক চিন্তাধারা আমাদের নিজেদের অস্তিত্বকে দেখার দৃষ্টিভঙ্গি সম্পূর্ণ বদলে দেয়।
আমরা যদি চেতনাকে কেবলই মস্তিষ্কের রাসায়নিক বিক্রিয়ার সৃষ্টি ভাবি, তবে মৃত্যুর সাথে সাথে বা মগজের কোষ নষ্ট হওয়ার সাথে সাথে আমাদের অস্তিত্বের সমীকরণটি শূন্য হয়ে যায়। কিন্তু চেতনা যদি মহাবিশ্বের একটি মৌলিক গাণিতিক ধর্ম বা ক্যানভাস হয়, তবে তার অর্থ অত্যন্ত গভীর। এর মানে দাঁড়ায়, এই মহাজগত কোনো অন্ধ বা মৃত ক্যানভাস নয়। আমরা যখন চোখ মেলে রাতের আকাশ দেখি, তখন আসলে আমাদের মস্তিষ্কের এই জটিল নেটওয়ার্ক ব্যবহার করে এই মহাবিশ্ব নিজেই নিজের গাণিতিক সৌন্দর্যকে অবলোকন করে! আমরা মহাবিশ্বের বাইরের কেউ নই, বরং প্রকৃতির সেই সচেতন অংশ, যার মাধ্যমে মহাজাগতিক সমীকরণগুলো নিজেদের অস্তিত্ব টের পায়।
লেখক – অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক, কথা সাহিত্যিক, বীর মুক্তিযোদ্ধা