বুধবার, রাত ১২:২৮, ১৩ই জ্যৈষ্ঠ, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

বুধবার, রাত ১২:২৮, ১৩ই জ্যৈষ্ঠ, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

হোম দর্শন

বাঙালির প্রাণের কবি কাজী নজরুল ইসলাম

শেয়ার: https://www.timebulletin24.com/news/7lb45a

ড. হাসান রাজা

বিশ্বসাহিত্য সভার আলোকিত পরিমণ্ডলে বাঙালি কবি হিসেবে কাজী নজরুল ইসলামের ভূমিকা অনন্য। কাব্যসৃষ্টির উৎসভূমিতে চিরপ্রকৃতির অনিঃশেষ প্রকাশ, বেদনার মূর্তিমান রূপ এবং মানবমুক্তির চেতনা তাঁকে বিশ্বজনীন কবির মর্যাদায় অধিষ্ঠিত করেছে। তিনি ছিলেন শোষিত, বঞ্চিত ও নির্যাতিত মানুষের কণ্ঠস্বর। তাঁর সাহিত্যকর্মে যেমন বিদ্রোহের দীপ্ত উচ্চারণ রয়েছে, তেমনি প্রেম, সাম্য, মানবতা ও অসাম্প্রদায়িকতার অমোঘ আহ্বানও সমানভাবে প্রতিফলিত হয়েছে।

কাজী নজরুল ইসলাম (২৪ মে ১৮৯৯ – ২৯ আগস্ট ১৯৭৬) বাংলা সাহিত্যের অন্যতম শ্রেষ্ঠ কবি, সংগীতজ্ঞ, সাংবাদিক, দার্শনিক ও বিপ্লবী চেতনার ধারক। তিনি বাংলাদেশের জাতীয় কবি। বাংলা ভাষা ও সাহিত্যে তাঁর অবদান অতুলনীয়। তাঁর কবিতা, গান, প্রবন্ধ ও সাহিত্যকর্মে নিপীড়নের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ, সাম্যের আহ্বান এবং মানুষের মুক্তির আকাঙ্ক্ষা বারবার উচ্চারিত হয়েছে।

জন্ম ও শৈশব

ভারতের পশ্চিমবঙ্গের বর্ধমান জেলার আসানসোল মহকুমার চুরুলিয়া গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন কাজী নজরুল ইসলাম। তাঁর পিতা কাজী ফকির আহমদ ছিলেন স্থানীয় মসজিদের ইমাম ও খাদেম। শৈশব থেকেই নজরুল আরবি, ফারসি ও ইসলামী শিক্ষার সঙ্গে পরিচিত হন। অল্প বয়সে পিতৃহারা হওয়ায় সংসারের দায়িত্ব কাঁধে নিতে হয় তাঁকে। জীবিকার তাগিদে মক্তবে শিক্ষকতা, মসজিদে মুয়াজ্জিনের কাজ এবং লেটো দলে অংশগ্রহণ—সবকিছুই করেছেন তিনি।

লেটো দলে যোগদানের মধ্য দিয়েই তাঁর সাহিত্যচর্চার সূচনা। সেখানে গান লেখা, অভিনয় ও নাট্যরচনা করতে গিয়ে তাঁর প্রতিভার বিকাশ ঘটে। একই সঙ্গে হিন্দু পুরাণ ও সংস্কৃত সাহিত্য পাঠের মাধ্যমে তিনি এক অসাম্প্রদায়িক চেতনার ভিত গড়ে তোলেন।

শিক্ষা ও সাহিত্যজীবনের সূচনা

অর্থনৈতিক সংকটের কারণে নিয়মিত পড়াশোনা চালিয়ে যেতে পারেননি নজরুল। বিভিন্ন স্কুলে পড়াশোনার পর ১৯১৭ সালে তিনি ব্রিটিশ ভারতীয় সেনাবাহিনীতে যোগ দেন। করাচি সেনানিবাসে অবস্থানকালে সাহিত্যচর্চা আরও গভীর হয়। সেখানেই তিনি লেখেন তাঁর প্রথমদিকের গল্প, কবিতা ও প্রবন্ধ।

যুদ্ধ শেষে কলকাতায় ফিরে তিনি সাংবাদিকতা ও সাহিত্যচর্চায় মনোনিবেশ করেন। ‘মোসলেম ভারত’, ‘বঙ্গীয় মুসলমান সাহিত্য পত্রিকা’, ‘ধূমকেতু’ প্রভৃতি পত্রিকায় তাঁর লেখা প্রকাশিত হতে থাকে। খুব দ্রুত তিনি সাহিত্যজগতে আলোড়ন সৃষ্টি করেন।

বিদ্রোহী কবির আবির্ভাব

১৯২২ সালে প্রকাশিত ‘বিদ্রোহী’ কবিতার মাধ্যমে নজরুল সমগ্র বাংলা সাহিত্যকে আলোড়িত করেন। কবিতাটিতে তিনি অন্যায়, শোষণ ও অবিচারের বিরুদ্ধে দুর্বার প্রতিবাদের ভাষা উচ্চারণ করেন। তিনি লিখেছিলেন—

“আমি চির-বিদ্রোহী বীর —
বিশ্ব ছাড়ায়ে উঠিয়াছি একা চির-উন্নত শির!”

এই কবিতার মাধ্যমেই তিনি ‘বিদ্রোহী কবি’ হিসেবে পরিচিতি লাভ করেন।

নজরুলের সাহিত্য ও সংগীত

নজরুল ছিলেন বহুমাত্রিক প্রতিভার অধিকারী। তিনি প্রায় পাঁচ হাজারেরও বেশি গান রচনা করেন, যা ‘নজরুলসংগীত’ নামে পরিচিত। প্রেম, ভক্তি, সাম্য, দেশপ্রেম, ইসলামী চেতনা, শ্যামাসংগীত, কীর্তন, গজল—সব ধারাতেই তিনি অসামান্য অবদান রাখেন।

বাংলাদেশের রণসংগীত ‘চল চল চল’ তাঁরই রচনা। তাঁর সংগীতে যেমন বিদ্রোহ আছে, তেমনি গভীর মানবপ্রেমও আছে। তিনি হিন্দু-মুসলিম সম্প্রীতির এক অনন্য প্রতীক ছিলেন।

কারাবরণ ও সংগ্রাম

ব্রিটিশবিরোধী লেখালেখির কারণে নজরুলকে কারাবরণ করতে হয়। ‘ধূমকেতু’ পত্রিকায় প্রকাশিত ‘আনন্দময়ীর আগমনে’ কবিতার জন্য তাঁকে গ্রেফতার করা হয়। কারাগারে বসেই তিনি লেখেন বিখ্যাত ‘রাজবন্দীর জবানবন্দী’। সেখানে তিনি সত্য ও ন্যায়ের পক্ষে তাঁর অবস্থান স্পষ্টভাবে তুলে ধরেন।

অসুস্থতা ও শেষ জীবন

১৯৪২ সালে নজরুল দুরারোগ্য ব্যাধিতে আক্রান্ত হন। ধীরে ধীরে তিনি বাকশক্তি হারিয়ে ফেলেন। দীর্ঘ চিকিৎসার পরও তাঁর অবস্থার উন্নতি হয়নি। ১৯৭২ সালে বাংলাদেশের জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের আমন্ত্রণে তিনি বাংলাদেশে আসেন এবং এখানেই জীবনের শেষ দিনগুলো কাটান।

১৯৭৬ সালের ২৯ আগস্ট তিনি মৃত্যুবরণ করেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় মসজিদের পাশে তাঁকে সমাহিত করা হয়।

নজরুলের চেতনা

নজরুল ছিলেন প্রেম, সাম্য ও মানবমুক্তির কবি। তিনি লিখেছিলেন—

“মানুষের চেয়ে বড় কিছু নাই, নহে কিছু মহীয়ান।”

তাঁর সাহিত্য আজও বাঙালির চেতনাকে জাগ্রত করে। অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ, মানবতার পক্ষে অবস্থান এবং সাম্প্রদায়িকতার বিরুদ্ধে সংগ্রামে নজরুল আজও সমান প্রাসঙ্গিক।

উপসংহার

কাজী নজরুল ইসলাম শুধু একজন কবি নন; তিনি বাঙালির আত্মার প্রতীক। তাঁর সাহিত্য, সংগীত ও জীবনদর্শন যুগে যুগে মানুষকে অনুপ্রাণিত করবে। বিদ্রোহ, প্রেম ও মানবতার অমর কণ্ঠস্বর হিসেবে নজরুল চিরকাল বেঁচে থাকবেন বাংলা ভাষা ও সংস্কৃতির অন্তরে।

ড. হাসান রাজা
লেখক ও গবেষক
রাজশাহী
E-mail: [email protected]

মন্তব্য করুন

আপনার ইমেইল প্রকাশ করা হবে না। * চিহ্নিত ঘরগুলো আবশ্যক।

শেয়ার করুন