জুলফিকার বকুল
নির্বাচন হলো সিদ্ধান্ত গ্রহণের এমন একটি আনুষ্ঠানিক প্রক্রিয়া, যার মাধ্যমে জনগণ প্রশাসনিক কাজের জন্য একজন প্রতিনিধি বেছে নেয়।’ দ্য স্পিরিট অব লজ ‘ বইয়ের ২য় খন্ডের ২য় অধ্যায়ে মন্টেসকিউই বলেছেন যে,প্রজাতন্ত্র অথবা গণতন্ত্র যে কোন ক্ষেত্রেই ভোটের মাধ্যমেই নির্বাচিত হয় প্রশাসক।আর জনগনই হচ্ছে এর মূল নির্ধারক এবং চালিকা শক্তি। ‘
সাম্প্রতিক নতুন সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর সিটি কর্পোরেশন,উপজেলা,পৌরসভা সহ স্থানীয় সরকারের অধীনে ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচন সম্পন্ন করার একটি পরিকল্পনার কথা ব্যক্ত করেছেন।দ্রুতই পর্যায়ক্রমে নির্বাচনগুলো অনুষ্ঠিত হতে পারে এমনটি সরকারের একটি সূত্র থেকে জানা গেছে।
বাংলাদেশের প্রত্যন্ত পল্লী এলাকার জন্য এ নির্বাচন একটি গুরুত্বপূর্ণ অর্থবহ নির্বাচন। যেখানে জনগণের স্বতঃস্ফূর্ত ভোটাধিকার প্রয়োগ করাটাও খুবই গুরুত্বপূর্ণ। একটি পরিবার উন্নত হওয়া মানেই সমাজ,জাতি তথা দেশের উন্নয়ন। আর এ উন্নয়নের ধারাবাহিকতা রক্ষায় দক্ষ,সৎ ও চিন্তাশীল যোগ্য নেতৃত্ব অনস্বীকার্য। তাই ভোটারদের যেমন বিচক্ষণতার সহিত প্রার্থী নির্বাচন করতে হবে তেমনি নির্বাচিত প্রতিনিধিদেরও হতে হবে আত্যপ্রত্যয়ী,বিচক্ষণ, দূরদৃষ্টি ও গ্রহনযোগ্য ব্যক্তিত্ব সম্পন্ন।

জুলফিকার বকুল
স্থানীয় সরকারের প্রতিনিধি সাধারণত নিজ নিজ এলাকার ব্যক্তিরাই হয়ে থাকে।নিজ এলাকার ভাল-মন্দ সম্পর্কে তাই তিনি বিশেষভাবে অবহিত থাকবেন।কিন্তু দুঃখজনক হলেও সত্য যে প্রতিনিধি নির্বাচনের ক্ষেত্রে শিক্ষিত, ভদ্র,প্রতিভাবান সৃজনশীল ব্যক্তিত্বকে উপেক্ষা করে অর্থকে বেশি মূল্যায়ন করা হয়।ফলে প্রভাবশালী ও বিত্তশালী ব্যক্তিরা অর্থের বিনিময়ে জনগণকে প্রভাবিত করে নির্বাচিত হওয়ার চেষ্টা করে।যে কারণে গ্রাম এলাকার উন্নয়ন কার্যত ব্যাহত হয়।একটি এলাকার উন্নয়ন বলতে শুধু মাত্র অবকাঠামোগত উন্নয়নকেই বুঝায় না। উন্নয়নের পূর্বশর্ত হচ্ছে শিক্ষা। মানব সম্পদ উন্নয়নে শিক্ষার কোন বিকল্প নেই।একটা সময় মানুষের ধারণা ছিল, যে দেশে যত প্রাকৃতিক সম্পদ বেশি সে দেশ ততোটা উন্নত। কিন্তু ধারণাটি এখন পাল্টে গেছে।আমাদেরকেও এলাকা ভিত্তিক শিক্ষার প্রসার ও উন্নয়নে জোরালো ভূমিকা রাখা প্রয়োজন। এক্ষেত্রে স্থানীয় প্রশাসনের যথেষ্ট ভূমিকা রয়েছে বলে আমি মনে করি।
আমি কয়দিন পূর্বেই গ্রাম থেকে ঘুরে এলাম। কি দেখলাম! প্রাকৃতিক সৌন্দর্যে ভরপুর বাংলার গ্রামীণ জীবনে কি নেই!
এখন রাস্তা-ঘাট, বাড়ি-ঘর প্রায় সবই উন্নত। প্রতিটি ঘরে ঘরে বিদ্যুৎ এর আলো,ফ্রিজ, টিভি,গ্যাস সিলিন্ডার, কম্পিউটার, এন্ড্রয়েড মোবাইল সব আছে। তবুও কেমন যেন একটা শূণ্যতা অনুভব করছিলাম। হারিয়ে গেছে সামাজিক পারস্পরিক মেলবন্ধন, সম্প্রীতি, হৃদ্যতা। নতুন প্রজন্মের শিক্ষার্থীদের মাঝে পারস্পরিক সম্মান, শ্রদ্ধাবোধ,কাংখিত আচরণের স্বল্পতা প্রতীয়মান। নতুন নতুন জ্ঞান অর্জনের প্রতি অনাগ্রহ। অভিভাবকরা গৃহপালিত পশু-পাখির যথাযথ পরিচর্যা করলেও নিজের সন্তানের প্রতি অনেকটাই যত্নহীন। সন্তান কোথায়, কি করছে,সন্ধ্যায় পড়ার টেবিলে নাই কেন ইত্যাদি বিষয়ে অভিভাবকদের বিচক্ষণতা ও সচেতনতা গভীরভাবে কাম্য।সামাজিকী করণের প্রথম ধাপ হচ্ছে পরিবার। পরিবার থেকে ইতিবাচক কোন আচরণ না শিখলে সমাজেও এর ব্যাপকতা ছড়িয়ে পড়ে। আধুনিক বিশ্বায়নের যুগে বেশিরভাগ শিক্ষার্থীই ফেসবুক, ইন্টারনেট এর সাথে সম্পৃক্ত। কোন কোন ক্ষেত্রে আসক্তও বটে।যেখানে ইতিবাচক অগ্রগতির মাধ্যমে ব্যক্তি উন্নয়নের পাশাপাশি জাতীয় উন্নয়নেও অবদান রাখবে তারা।কারণ, তারা ভবিষ্যৎ প্রজন্মের দেশ ও জাতির কর্ণধার। অনেক শিক্ষার্থী অভিভাবকদের কথা শোনে না এমন অভিযোগও রয়েছে। প্রকৃত পক্ষে একটি পরিবারই হলো নীতি,আদর্শ ও সুশিক্ষা দেওয়ার সবচেয়ে বড় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান। পরিবারের সঠিক নেতৃত্ব ও দিকনির্দেশনায় গড়ে উঠে একটি শিক্ষিত জনগোষ্ঠী,শিক্ষিত সমাজ ব্যবস্থা।
এখন প্রশ্ন হলো, এসব কিছুই তো ব্যক্তি বা পরিবার কেন্দ্রীক। এর সাথে স্থানীয় সরকারের সম্পর্ক কি?
সামাজিক উন্নয়নে শিক্ষিত জনগোষ্ঠী তৈরি করার জন্য সুষ্ঠু পরিবেশ তৈরি করা ইউনিয়ন পরিষদ এর ঐচ্ছিক কাজ হলেও এই চ্যালেন্জিং কাজটিই পারে এলাকার সার্বজনীন উন্নয়ন ঘটাতে।কারণ,ব্যক্তির চেতনায় সৃষ্টিশীল, কল্যাণময় জ্ঞানচর্চায় আত্মিক উন্নয়নই পারে প্রিয় মাতৃভূমি বাংলাদেশকে বিশ্বমানচিত্রে রক্তিম আলোয় উদ্ভাসিত করতে। তাই স্মরণীয়, বরণীয় হতে হলে মানব কল্যাণে নিজেকে উৎসর্গ করার মানসিকতা থাকাটা অবশ্যই প্রয়োজন।তবেই জনপ্রিয় ও সমাজ পরিবর্তনের মহান পুরুষ হয়ে বেঁচে থাকবেন লক্ষ হৃদয়ে। ভাল ও সৃজনশীল কাজের মাধ্যমেই মৃত্যুর পরও মানুষের অন্তরে বাস করা যায়।
একটি নির্দিষ্ট এলাকার শিক্ষার সুষ্ঠু পরিবেশ ও মান উন্নয়নে একটি শিক্ষা- বান্ধব মানসিকতার নেতৃত্বই যথেষ্ট। তাই প্রয়োজন মানবিক গুণাবলী সম্পন্ন জনপ্রতিনিধি। যার যোগ্য ও শক্তিশালী নেতৃত্বে প্রতিটি গ্রাম হয়ে উঠবে শহর কেন্দ্রীক এবং আত্মনির্ভরশীল। সমাজে প্রতিষ্ঠিত হবে সততা ও ন্যায়বিচার। মানবতাকে সর্বোচ্চ প্রাধান্য দিয়ে গ্রামীণ জনগোষ্ঠীকে মানবিক করে তুলবেন,গ্রামে-গ্রামে,পাড়ায় পাড়ায় শিক্ষা উপ-কমিটি গঠন করে শিক্ষার অনুকূল পরিবেশ সৃষ্টি, নিয়মিত অধ্যয়ন,সামাজিক অপরাধ মূলক কাজ হতে বিরত থাকা,দেশ ও জাতির প্রতি শ্রদ্ধাবোধ সৃষ্টি করা,মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতিকে লালন করে দেশের জন্য নিজেকে সম্পদে পরিনত করা,সরকারের গৃহিত জন কল্যাণমূখী কাজে স্ব-প্রণোদিত হয়ে সহযোগিতা প্রদান করা,সমাজের শৃংখলা বজায় রাখতে আইনের প্রতি শ্রদ্ধাশীল থাকতে উদ্বুদ্ধ করণ ইত্যাদি বিষয়ে কঠোর ও যুগান্তকারী পদক্ষেপ গ্রহণ করা একান্ত জরুরি। শিক্ষিত ব্যক্তিকে যথাযথ মূল্যায়ণের মাধ্যমে শিক্ষার প্রতি শ্রদ্ধাশীল মনোভাব গড়ে তোলা সমাজের জন্য এখন নতুন করে ভাবনার বিষয়। সমাজ ব্যবস্থা দিন দিন ক্ষমতা ও টাকার বেড়াজালে বন্দী হয়ে যাচ্ছে, যেখান থেকে আমাদের বেড়িয়ে আসা প্রয়োজন। উন্নত জাতি গঠনে প্রকৃত মেধার মূল্যায়ন করে নতুন প্রজন্মকে মেধাবী হতে উৎসাহিত করাও একটি মননশীল পদক্ষেপ।
তাই আগামী স্থানীয় সরকার নির্বাচনে আমাদের এমন প্রত্যাশা থাকা উচিৎ যে, একজন নির্বাচিত জনপ্রতিনিধি তাঁর নিজ এলাকার প্রতিটি পরিবারের জন্য যেন দায়িত্বশীল হয়। নানা প্রতিকূলতার মাঝেও যেন নিয়মানুবর্তিতার ব্যত্যয় না ঘটে। তিনি যেন অন্ততপক্ষে প্রগতিশীল, রুচিসম্মত অবস্থান তৈরী করার প্রত্যয় ব্যক্ত করে একটি রোডম্যাপ তৈরী করে আধুনিক সমাজ ব্যবস্থার সূচনা করেন। এ পরিকল্পনা দীর্ঘ মেয়াদী হলেও একসময় আলোর মুখ দেখবে আমার বিশ্বাস। প্রতিটি গ্রাম হবে এক একটি ছোট শহর।উন্নত বিশ্বে মাথা উচু করে দাঁড়াবে স্বপ্নের বাংলাদেশ।
-লেখক–শিক্ষক,ঢাকা ইঞ্জিনিয়ারিং ইউনিভার্সিটি স্কুল, ডুয়েট ক্যাম্পাস,গাজীপুর