শনিবার, রাত ১১:০৪, ১২ই বৈশাখ, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

শনিবার, রাত ১১:০৪, ১২ই বৈশাখ, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

কিশোর বেলার কমিউনিস্ট

হারুন রশিদ

আমার কিশোরকালের একটা কাহিনী কই। সবে আমি তখন কমিউনিস্ট হইছি। মানে নতুন।গ্রামে গ্রামে কৃষক সমিতি গড়ে তোলার কাজ করি। নতুন কমিউনিস্ট হলি অনেক যন্ত্রণা। অনেক কঠিন কঠিন বই পড়তি হয়। অনেক নতুন শব্দ ব্যবহার করতে হয়। যেসবের অর্থ আমি ভালো জানতামনা। এই যেমন ঐতিহাসিক দ্ধান্দিক বস্তুবাদ, মুৎসুদ্দি বুর্জোয়া এইধরনের দাঁতভাঙা কথা। তবু না বুঝে এসব আমিও আওড়াতাম। আমি মার্ক্স এঙ্গেলসের কমিউনিস্ট পার্টির ইশতেহার ও লেনিনের রাষ্ট্র ও বিপ্লব বইগুলি তখন পড়েছি। কিন্তু কিছুই ভালো বুঝতে পারিনি। এর আগে আমি বেশী পড়তাম নভেল ও ডিটেক্টিভ বই।

এইসব পড়ে মজা পেতাম। বিপ্লবের আকাঙ্খায় মজা আছে তবে কঠিন কঠিন থিওরি হজম করা কঠিন। এই যেমন প্রিন্সিপাল এস্পেক্ট অব কন্ট্রাডিকশন। মানে প্রধান দ্বন্দের প্রধান দিক। এই সব শুনে মাথা ঘুল্লি খাতো। কয়েকজন পন্ডিত কমরেড মোটা ইংরেজি বই খুলে এইসব আমাগে পড়াতো। আরো কতো ফাল্টকুলুস শব্দ কইতো এন্টি ডুরিং, নারোদাবাদ এইসব। সব কি এখন আর মনে আছে। গ্রামে গ্রামে গরীব কৃষকদের নিয়ে আলোচনা করে তাদের সংগঠিত করার চেষ্টা করতাম। একদিন খুলনা শহরে আসলে পার্টির একজন ডান্টেল নেতা আমারে পিঠ চাপড়ায়ে কইলেন, এটা হচ্ছে বিশ্ব বিপ্লবের যুগ আমাদের বিপ্লবের কাজকে তরান্বিত করতে হবে। তিনি আরো বললেন, তোমাদের এলাকায় আমি ওমক তারিখ আসবো। তুমি কিছু ভুমিহীন ও প্রান্তিক চাষিদের ডাকবা। আমি তাদের সাথে আলোচনা করবো। তবে সাবধান থাকবা সামন্তপ্রভু ও শ্রেণিশত্রুদের বিষয়ে তারা যেন আমাদের মিটিঙের ব্যাপারে টের না পায়। আমি নেতারে প্রোগ্রাম দিলাম। নিদৃষ্ট দিনে সেই নেতা আসলেন সাথে একজন তরুন বিপ্লবী। লঞ্চঘাট থেকে তাকে আমরা নিয়ে আসলাম। তিনি কইলেন, ডিস্টিকবোর্ডের বড়রাস্তা দিয়ে যাওয়া যাবেনা। বিলের ভিতরের মেঠোপথ দিয়ে যেতে হবে। আমরা তাই করলাম। এক মাইলের পথ তিনমাইল ঘুরে ঝিনাইখালি মহোরদের বাড়ি আসলাম। তখন দুপুর। দুপুরের খাবারে দেখি কয়েক রকম আইটেম কুকড়োর গোস্ত, রুইমাছ সাথে ডাইল, কুমড়ো ভাজি আর দানাগুড় দিয়ে গরুর দুধ। মহোরের আব্বাও কৃষক সমিতি করেন। তাই তিনি কমরেডের আসার কথা শুনে ক্ষেপলা জ্বাল ছেড়া ছিলো, তা সেরেসুরে পুকুরে ক্ষেপণ দিয়ে কয়েকটা রুই মাছ ও খুপির নিজেদের মুরগী। আমাগের লিডার এতো ভালো খাবার দেখে রাগারাগি করে কইলেন এইসব আয়োজন কেনো করেছেন? এইসব সামন্তবাদী আপ্যায়নের কালচার থেকে আমাদের বেরিয়ে আসতে হবে। আমাদের ভুমিহীন গরীব কৃষকের সাথে একাত্ম হতে হবে। এই কথা বলে উনারা তৃপ্তি সহকারে খেতে শুরু করেন। মহোরের আব্বা বালের মার্কা সামন্ত কালচারের কিছুই না বুঝে উপরের হাপাল থেকে বরইমাখা গুড় পেড়ে নিয়ে কাঁসার বাটি ভরে সামানে দিয়ে কলেন আমি নিজে খাজুরগাছ কাটি আর এই বরই আমাগের বাড়ির গাছের। সন্ধ্যার দিক বিলের মধ্যে মোসাব্দি ফহিরের বটতলায় বেশ কিছু গরীব কৃষকেরা হাজির হলো। উদ্বোধনী ভাষণে আমি কিছু কইলাম। তবে আমার গলা সুখায়ে আসতিছিলো। যদি ভুলচুক কিছু কয়ে ফেলি, তাইলে নেতা ভাববে কি! আমার পরে নারায়ণ মাষ্টার, ওমেদ বিশ্বাস কিছু কথা কইলেন। বর্গাচাষ, মহাজনদের চড়াসুদে টাকা লাগানি, মাতব্বরদের জোরকরে জমি দখল ইত্তকার বিষয়ে। শেষকালে আমাগের খুলনা টাউন থেকে আগত নেতা আলোচনা শুরু করলেন। মাও সে তুঙের চিংকাং মাউন্টেনের ঘাটি থেকে লংমার্চ পর্যন্ত রিফারেন্স দিয়ে আলোচনা চালিয়ে যেতে থাকেন। নোনা মাটির গরীব কৃষকদের দু:খ দুর্দশার নিয়েও কিছু বললেন।শেষে উনি লড়াইয়ের ডাক দিলেন। তারপর বলতে থাকলেন সাম্রাজ্যবাদ, সামাজিক সাম্রাজ্যবাদ, আধিপত্যবাদ, সম্প্রসারণবাদ, সামন্তবাদ, আধা সামন্তবাদ, আমলা মুৎসুদ্দি পুঁজিবাদ, সংশোধনবাদ, নয়া সংশোধনবাদের বিরুদ্ধে আমদের লড়াই চালাতে হবে। তখন আমাদের এই নাবাড় আবাদ এলাকার মুরুব্বি গরীব চাষীদের নেতা গোছের আরমান ফারাজি কাকা সভার মধ্যে উঠে দাড়ায়ে গলা খাকারি দিলেন। চৈত্র মাসের সন্ধ্যা বেলা। সবাই বাড়ি থেকে খেজুরের পাটি এনে বসেছে। কোনো হ্যাজাক বা হেরিকেন নেই। আকাশে চাঁন্দের ফকফকা আলো। হাতাওয়ালা গেঞ্জিপরা, কান্ধে গামছা আরমান ফারাজি দাড়ায়ে বললেন করমেট, আমি এট্টা কথা কবো, পারমিশন দেন। তখন আমরা যারা কমিউনিস্ট হইছিলাম তারগে এই এলাকার মানুষজন করমেট কয়ে ডাকতো। কমরেড বলতে পারতোনা। আমাগের খুলনার লিডার উনাকে বলার অনুমতি দিলেন। এইবার মুরুব্বী ফারাজি কইতে থাকলেন,আপনিতো বক্তৃমা দিয়ে সব বাদ দিয়ে দিচ্ছেন। কি কি বাদ দিচ্ছো তাও ঘোড়ার আন্ডা কিচ্ছু বুঝতি পারিনি। তা করমেট সব বাদ দিলি আমাগের থাকপেনে কি? এই কথা কয়ে উনি বসে পড়লেন। মিটিঙির অনেকেই হো হো করে হাসি দিয়ে উঠলো।

লেখক – অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক, কথা সাহিত্যিক, বীর মুক্তিযোদ্ধা

মন্তব্য করুন

আপনার ইমেইল ঠিকানা প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত ক্ষেত্রগুলো আবশ্যক।

Scroll to Top