
কাকন রেজা:
সাম্প্রতিক সময়ে বিবিসি’র একটি খবরের শিরোনাম হচ্ছে, ‘বাংলাদেশ, ভারত, চীনসহ কয়েকটি দেশের বিরুদ্ধে বাণিজ্য তদন্ত শুরু যুক্তরাষ্ট্রের’। বিবিসি বাংলা ইচ্ছে করেই বাংলাদেশের নামটা আগে বসিয়েছে, যাতে দেশে ভারত বিরোধীতা ডাইভার্ট হয়ে যুক্তরাষ্ট্র বিরোধীতায় পৌঁছায়। এতে ভারতের উপর চাপটা কমে। বিবিসি বাংলা সবসময়ই ভারতকে সুবিধা দিতে চায় এবং এটা নতুন কিছু নয়। যেমন বাংলাদেশে ভারত সমর্থিতদের পাশে সবসময়ই সেইফগার্ডের কাজ করে এসেছে বিবিসি এমনকি চব্বিশ পরবর্তী সময়েও করছে। করুক। বিবিসি’র খবরে এবং যারা বাংলাদেশের সরকার বদলের কারিগর বলে নিজেদের ভাবতেন, তাদের উৎপাদিত বয়ানও আজকাল ব্যর্থ হয়। বাংলাদেশের তরুণ প্রজন্ম এদেরকে এখন পাত্তা দেয় না। তারা নিউজ ট্রিটমেন্টের বিষয়টা পুরোপুরিই বুঝে। বরং বিবিসি’সহ অন্যরা তরুণ তথা জেন-জি’দের চেয়ে পিছিয়ে। এরা এখনো বাংলাদেশের জেন-জি’দের পালস রিড করতে পারেনি।
যাকগে, এখন আসি যুক্তরাষ্ট্র কেন বাংলাদেশের বিরুদ্ধে তদন্ত শুরুর কথা বললো সে বিষয়ে। এখানে খুব বেশি ভাবাভাবির কিছু নেই। ভারতের সাথে যুক্তরাষ্ট্রের সম্পর্কের টানাপোড়েন চলছে ইউক্রেন-রাশিয়ার যুদ্ধের সময় থেকে। ভারতের উপর বিভিন্ন সময়ে নিষেধাজ্ঞা, শুল্ক আরোপসহ নানান বৈরিতা প্রদর্শন করেছে যুক্তরাষ্ট্রের ট্রাম্প প্রশাসন। যার প্রভাব পড়েছে দক্ষিণ এশিয়ার রাজনীতিতে। বাংলাদেশও এর বাইরে নয়। দেখবেন, ভারতের ভারুয়াগুলো বাংলাদেশের জুলাই বিপ্লবকে অ্যামেরিকার গোয়েন্দা কর্মকাণ্ড হিসেবে দাবি করে আসছে। অথচ এই ভারুয়াগুলোই একসময় যুক্তরাষ্ট্রের অনেক বিতর্কিত কর্মকাণ্ড সম্পর্কে চুপ ছিল। কারণ, তখন ভারতের চোখে যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশকে দেখতো। কিন্ত বিচ্ছেদ হবার পর যুক্তরাষ্ট্র ভারতের চোখে না দেখে নিজের চোখে দেখছে বাংলাদেশকে। আর সেখানেই সমস্যাটা। সেকারণেই জুলাই বিপ্লবকেও অ্যামেরিকার কারিশমা হিসেবে প্রমাণ করতে চাইছে ভারুয়ারা।
বলতে পারেন, তাহলে বাংলাদেশকে তদন্তের আওতায় আনার কথা কেন বললো যুক্তরাষ্ট্র। কেন বললো, সে প্রশ্নের উত্তরও খুব জটিল নয়, যদি বাংলাদেশে কথিত বুদ্ধিজীবীদের মতন জিলাপির গ্রাম্য প্যাঁচ মাথায় না থাকে। বলি, এখনও কি বাংলাদেশের রাজনীতি ভারতীয় বলয় থেকে পুরোপুরি বের হয়ে এসেছে? আসেনি। কিন্তু বের হয়ে আসার চেষ্টা চলছে। উদাহরণ দিই, ‘পুলিশ হত্যার বিচার হবে’ এটা ছিল ভারতীয় বয়ান। কিন্তু সেই বয়ানই উল্টে গেল, ‘জুলাই যোদ্ধাদের বিচার করতে হলে রাজাকার হত্যার দায়ে মুক্তিযোদ্ধাদেরও বিচার করতে হবে’ এমন লজিক্যাল আলাপে। ভারুয়া বয়ান মার খেলো। দ্বন্দ্বটা দেখতে পাচ্ছেন তো। অন্ধ হলেই প্রলয় বন্ধ থাকে না। আমার বন্ধুদের মধ্যে নামের আগে সিনিয়র লাগানো এক রিপোর্টার আছেন। একটু মাথামোটা, মাথায় মাল সাথে চুলও কম। অবশ্য মাথায় চুল কম থাকাটাকে কেউ কেউ বুদ্ধিজীবীতার উপসর্গ ভাবেন। যদিও সে ভাবনা পুরোটাই ভুলভাল। মাথায় মাল এবং চুল দুটোই কম থাকার কারনে বিষয়গুলো আমার বন্ধুর অ্যান্টেনার বাইরে দিয়ে যায়। তখন তিনি সেটার সঠিক জবাব না দিতে পেরে বকাবাজি করেন। অশ্লীল কথা বলেন। বলবেন তো, হাদিও অশ্লীল কথা বলতো। বলি, হাদির বলা আর ওই মাথামোটার বলার মধ্যে পার্থক্য হলো হাদি লজিকটা জানতেন। কী বলছেন, কেন বলছেন, তা জানতেন। ওই মাথামোটা কিছু না জেনে এবং না বুঝেই উল্টোপাল্টা বকেন। আমাদের বুদ্ধিজীবী এবং এক্টিভিস্টদের বেশিরভাগই ওই মাথামোটার মতই। কারো কারো অবশ্য মাথায় চুল থাকলেও, মালটা, মানে মগজটা কম।
মুল কথায় আসি, মাথামোটাদের কথা থাক। ওই যে পুলিশ হত্যা নিয়ে কথাটার মধ্যে দ্বন্দ্বের বিষয়টা বললাম, সেখানেই আমাদের কেন বাণিজ্য তদন্তের আওতায় রাখা হলো, তার উত্তরটা রয়েছে। অর্থাৎ আমাদের প্রথম কথায় আমরা আমাদের বন্ধু রাষ্ট্রের বলয়ে আছি তা দৃশ্যমান। যখন আবার প্রমাণের প্রয়োজন পড়ে আমরা বলয়ে নেই, তখন কথা রিভার্স হয়। এই কন্ট্রাস্টটাই এখন আমাদের রাজনীতির সবচেয়ে ইন্টারেস্টিং ব্যাপার। অনেক ক্ষেত্রেই এই কন্ট্রাস্ট দৃশ্যমান। ‘শ্যাম রাখ না কুল রাখি’ অবস্থা। এনিয়ে আর কথা না বাড়াই। সবকথা সবসময় বলতে নেই এবং তা রাষ্ট্রের স্বার্থেই।
খেয়াল করবেন, রাশিয়া থেকে তেল কিনতে যুক্তরাষ্ট্রের অনুমতির প্রয়োজন বাংলাদেশের। ভারতের সাথে রাশিয়ার সম্পর্ক প্রশ্নাতীত। ইউক্রেন যুদ্ধে রাশিয়া থেকে প্রয়োজনের বেশি তেল কিনে তার মূল্য ডলারে পরিশোধ করেছে ভারত। যারফলে রাশিয়া তার ডলার সংকটে অনেকটাই রেহাই পেয়েছে। যেখানে ঋণ পরিশোধের জন্য ডলারের কোনো বিকল্প ছিল না রাশিয়ার। যুক্তরাষ্ট্রের নিষেধাজ্ঞার ফলে ভয়াবহ ডলার সংকটে পড়েছিল রাশিয়া। সেই সংকট উত্তরণে অনেকটাই ত্রাতা ছিল ভারত। ভারতের সাথে যুক্তরাষ্ট্রের বৈরিতা এখানেই। বাংলাদেশ ইচ্ছে করলেই ভারতের সহায়তায় রাশিয়া থেকে তেল কেনা সহজতর করতে পারতো। রাশিয়া থেকে না কিনে ভায়া ভারত হয়ে কিনতে পারতো। সম্প্রতি যেভাবে ডিজেল কিনেছে বাংলাদেশ। কিন্তু তা যদি হতো, তাহলে রুষ্ট হতো যুক্তরাষ্ট্র। বাংলাদেশের ভারতের ভারুয়ারা যাই বলুক না কেন, সরকার জানে যুক্তরাষ্ট্রের সাথে বৈরিতা তাদের বিপদে ফেলতে পারে। কারণ বাংলাদেশের রপ্তানি বাণিজ্যের বড় স্টেক হোল্ডার হচ্ছে যুক্তরাষ্ট্র। সুতরাং বাধ্য হয়েই যুক্তরাষ্ট্রের অনুমতি প্রার্থনা করতে হয়েছে। আর খোদ ভারতই নিজেকে রক্ষায় যুক্তরাষ্ট্রের অনুমতি নিয়েছে। মার্কিন নিষেধাজ্ঞাকে মূল্য দিতে হয়েছে ভারতকে। ধারণা করি, তারপরেও যুক্তরাষ্ট্রের সাথে বৈরি সম্পর্কের আরো মাশুল দিতে হবে ভারতকে।
আর আমাদের ক্ষেত্রে যদি বলয়প্রীতিটা কাটাতে না পারি, বলয়ের মধ্যে থাকা যে বলদগুলো রয়েছে তাদের উপেক্ষা করতে না পারি, তাহলে গ্লোবাল পলিটিক্সে আমাদেরও বৈরিতার সম্মুখীন হতে হবে। বিগত রেজিম আমাদের অর্থনৈতিক অবস্থা যা করে রেখে গেছে, তাতে সে বৈরিতা সেধে নেয়া হবে স্রেফ আত্মহত্যার শামিল। সুতরাং বৃত্তাবদ্ধ বুদ্ধিজীবী, আর বন্ধু দেশে পোঁতা খুঁটির জোরে নাচা বলদদের কথায় কান না দিয়ে সরকারকে নতুন বাংলাদেশ গড়ায় কৌশলী হতে হবে। এবং সময়োপযোগী কৌশলের কোনো বিকল্প নেই।