নাসের মুস্তাফিজ
প্রিয় প্রধানমন্ত্রী,
বুকের ভিতর কষ্টটা কদিন থেকেই কুরে কুরে খাচ্ছে, কারন আমারও তো একটা মেয়ে আছে, আমার মেয়েটাকেও তো অনেক আদর সোহাগ ভালোবাসা যত্ন দিয়ে তিলতিল করে মানুষ করছি। যাদের হারিয়েছে তারা কষ্টটা বুঝতে পারছে নিশ্চয় যে সন্তান হারানোর বেদনা কত নিঠুর।
ফেসবুকে এখন আর লেখালেখি করিনা, কারন কেও পড়েনা। সকলে ছবি দেখতে পছন্দ করে। একটা সুন্দর ছবি দিলে সাথে সাথে অনেক ভিউ কমেন্ট আসে। কিন্তু একটা লেখা, বা সুন্দর একটা গল্প বা কবিতা কেও পড়তে চায়না, সময় কোথায় রে ভাই? এই লেখাটাও কেও পড়বেনা জানি, কোন কমেন্ট বা প্রতিবাদও কেও করবে না। কারন সকলে এখন ভয় পায়, যদি কিছু হয়ে যায়!
কদিন আগে নিউজপেপারে ছাপা একটা খবর সাথে ছবি বুকে দাগ কেটেছিলো। এক বোনের ধর্ষককে তার ৮/১০ বছরের ছোট ভাই খুন করেছে, পুলিশ তাকে হাতকড়া পড়িয়ে থানায় নিয়ে যাচ্ছে। বাহ! সে কি সুন্দর দৃশ্য! সে তো খুনি! সে তো অপরাধী। তার অপরাধ সে তার বোনের বিচার নিজে নিজেই করেছে। এই ছোট্ট বাচ্চাটা এই কঠিন সিদ্ধান্তটা কেন নিয়েছে বলুনতো? কারন এই নষ্ট ঘুনেধরা সমাজটা তাকে এটা করতে বাধ্য করেছে। আমি বলিকি ঠিক করেছে, একদম সঠিক করেছে। সাবাস বেটা! বাঘের বাচ্চা! আমার কিন্তু অতটা সাহস নেই ভাই, আমি শুধু দেখি আর স্ক্রল করি, ফেসবুক ইনিস্তা বা ইউ টিউব। কি দরকার ভাই, আমার মেয়ের তো আর ধর্ষন হয়নি তাইনা? আমার কি দরকার বাপু এত আগ বাড়িয়ে কিছু বলার। ঠিক আছে ভাই তবে আপনার কাধেও তো ভয়ের নিঃশ্বাস পড়ছে রে ভাই, অনুভুতি নেই নাকি? আরে আপনিওতো মেয়ের বাবা হে?
ধর্ষন!!!

হ্যা, ভাই প্রতিদিন পেপার খুলে পড়তে বসলে খুজে খুজে এই নিউজগুলো পড়তে ভালোই লাগে কি বলেন? কি পড়েন নাকি আপনিও? সাংবাদিকরাও বেশ রসালো করেই উপস্থাপন করেন যে, কারন সংবাদপত্রের কাটতিও তো একটা বিষয় তাইনা। যাহোক এই সমাজে কিন্তু নানা রকমের ধর্ষন আছে ভাইজান। এই যেমন ধরুন প্রেমিক প্রেমিকা, ভাই বোন, বাবা মেয়ে, দেবর ভাবি, স্বামীকে বেঁধে তার সামনেই স্ত্রীকে, নানা নাতনিকে, দাদা পুতনীকে, হুজুর ছাত্রীকে, বুড়ো ছুড়িকে,আবার পাট ক্ষেতে সকলে মিলেমিশে, বা স্ত্রী সহযোগীতায় শিশুকে, কট্ কট্ কট্ ব্লা ব্লা ব্লা…আর মনে করতে পারছি না ভাই, হাপিয়ে উঠেছি, তবে আপনি আরও কিছু জানলে কমেন্টে জানাবেন প্লিজ। তবে বর্তমানে মেয়ে ভুমিষ্ট হবার পর থেকে ১০০ বছরের বুড়িও কিন্তু এখন আর কেউই নিরাপদ নয়। মেয়ের বাবারা তাই সাবধান!!! নাকে সর্ষের তেল দিয়ে ঘুমানোর দিন কিন্তু শেষ। এবার একটু জাগুন দাদা!!! আমার এক বন্ধু আবার এসব চিন্তা করে তার মেয়েদের বিদেশ পাঠিয়ে দিয়েছেন, পয়সাকড়ি আছে, কিন্তু আমার আপনার কি হবে???
লিখতে লিখতে তো কলমের কালি শেষ হয়ে যাবে কিন্তু লেখা বেশি বড় হলেতো আবার আগ্রহ হারিয়ে যেতে পারে আপনার তাইনা? যাহোক বেশি প্যাঁচাল না পাড়ি আসল কথা যেটা বলতে চাচ্ছি এবার সে প্রসঙ্গে আসি কি বলেন?
নীচে তিনটা ছবি দিয়েছি যেগুলো কিন্তু বর্তমানে খুব ভাইরাল রে ভাই! প্রথমটাকে চিনতে পারছেন? একটু কষ্ট করে দেখুন তো, এই তো সেই অভাগী রামিসা। ছবিতে কিন্তু রামিসার খন্ডিত মস্তকখানা এফআরসিএস সার্জন দ্বারা নিক্ষুতভাবে সংযোজন করানো হয়েছে। তার নিষ্পাপ মুখের দিকে একবার তাকান তো? কতটা কষ্ট, কতটা ভয়, কতটা চিৎকার, কতটা ঘৃনা জমে আছে তার মুখখানাতে, বলুন তো!!! কি দেখা যায়??? ইস! মায়ের দরজা থাপড়ানো আর কান্নার আর্তনাদে রামিসা কি মৃত্যুভয় থেকে একটু হলেও বাঁচার আশা দেখেছিলো নাকি নর পিশাচ ততক্ষনে তার মাথা দেহ থেকে আলাদা করে ফেলেছে??? আমি আর ভাবতে পারছি না। আমার ছোখ ঝাপসা হয়ে গেছে, বুকটা ভারি হয়ে গেছে, আমি আর পারছি না। দ্বিতীয়টি ইয়েমেনে একজন ৫ বছর বয়সী শিশুকে ধর্ষনের অভিযোগে জন সম্মুখে গুলি করে শাস্তি দেবার পর ক্রেনে টানিয়ে সকলকে দেখানোর ছবি। আর ৩য় টি চিনতে পারছেন? হ্যা এই সেই কুলাঙ্গার, পিশাচ যে শিশু রামিসাকে স্ত্রী র সামনে ধর্ষন করে তার কেমল শরীরটাকে টুকরো টুকরো করেছে। দেখুন দেখুন সকলে দেখুন, কি সুন্দর করে বুলেটপ্রুফ জ্যাকেট আর হেলমেড পরিয়ে তাকে লাল গালিচা সংবর্ধনা দেয়া হচ্ছে???? বাহ!! বাংলাদেশ বাহ!!! আহা কি আনন্দ আকাশে বাতাসে!!!
এদেশে রামিসার ধর্ষকরা বারবার বুক ফুলিয়ে রাস্তায় ঘুরে বেড়ায়। আর তাদের পুলিশ প্রোটেকশনে আদালতে নেওয়া হয়।কালোটাকার কারসাজি, মিথ্যে অভিযোগ আর সাক্ষি প্রমানের অভাবে এই অন্ধ কানুন তাদের বারবার ক্ষমা করে দেয়।
আমি একজন ভীতু বাবা, হ্যা আমি একজন অসহায় বাবা! আমি কোন প্রতিবাদ করতে পারিনা, আমি বিচার চাইতে পারিনা, কারন এদেশে বিচার হয়না।
প্রিয় প্রধানমন্ত্রী,
হ্যা, আপনাকে বলছি। আপনিও তো একজন মেয়ের বাবা। একজন মেয়ের বাবা হয়েও আপনার বুকটা কি একটুও কাঁদেনা??? আর কত রামিসার রক্তাক্ত দেহ বলি হলে আপনার চোখ ফেটে একফোটা অশ্রু বেরোবে বলতে পারেন?
এটা একটা মেয়ে হারেনো অসহায় বাবার বুকফাটা আর্তনাদ…
লেখক – কবি, প্রাবন্ধিক, ব্যাংক কর্মকর্তা