
কাকন রেজা:
বিবিসি বাংলা প্রশ্ন তুলেছে জুলাই বিপ্লব থেকে উঠে আসা তরুণদের দল এনসিপিকে নিয়ে। বিবিসি বাংলা’র প্রশ্ন, ‘এনসিপি কি ডানপন্থি রাজনৈতিক দল হয়ে উঠছে?’ বিবিসি তার অতিসাম্প্রতিক প্রতিবেদনে দেখিয়েছে, ইসলামপন্থী দলগুলোর সাথে নৈকট্য বাড়ছে এনসিপি’র।
এখন প্রশ্ন হলো রাজনৈতিক চরিত্রে ডান আর বামপন্থা বলতে আমরা কী বুঝি। মোটাদাগে ডানপন্থা হলো ঐতিহ্য, ধর্মীয় অনুশাসন, সামাজিক রীতি বজায় রাখার পক্ষে। অর্থনীতির ক্ষেত্রে অবাধ বাণিজ্য অর্থাৎ মুক্ত বাজার, ব্যক্তি মালিকানাকে সমর্থন করা। আর জাতীয়তাবাদের প্রশ্ন নিজ দেশের সংস্কৃতি, স্বার্থ, স্বাতন্ত্র্য ও সার্বভৌমত্ব রক্ষায় দৃঢ় অবস্থান।
আর বামপন্থার হলো, সামাজিক সাম্যতা বজায় রাখা, ধর্মকে প্রাধান্য না দেয়া, শ্রমিক শ্রেণিকে প্রাধান্য দেয়া। রাজনৈতিক ক্ষেত্রে মার্ক্সবাদ, সোশ্যালিজম ও কম্যুনিজমকে মূলমন্ত্র মানা। অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে ডানপন্থার বিপরীতে রাষ্ট্রীয় মালিকানাকে প্রতিষ্ঠা করাই বামপন্থার মূল লক্ষ্য।
এই হলো মোটাদাগে ডান ও বামপন্থার পার্থক্য। কিন্তু বিবিসি বাংলা’র রাজনৈতিক মোটিভটা হলো, ডানপন্থাকে পরোক্ষে র্যাডিকেল তথা উগ্রপন্থা হিসেবে প্রতিষ্ঠা করা। যার ফলেই ইসলামী দলগুলোর সাথে এনসিপি’র নৈকট্যকে সামনে এনে প্রকাশ্যে ডানপন্থী ট্যাগ দিয়ে পরোক্ষে র্যাডিকেল প্রমাণের চেষ্টাই হলো বিবিসি বাংলা’র প্রতিবেদনের সম্ভাব্য লক্ষ্য।
বিবিসি বাংলা’র সবসময়ের লক্ষ্য ছিল ইসলামপন্থীদের র্যডিকেল হিসেবে চিহ্নিত করা। একসময় বিএনপি’র সাথে জামায়াতকে ট্যাগ করে বিএনপি-জামাত এক করে বিএনপিকে র্যাডিকেল প্রমাণ করার প্রাণান্ত চেষ্টা ছিল বিবিসি বাংলা’র। বিএনপি জামায়াতকে ত্যাগ করায় এবং সম্ভবত তাদের ধারণা মতে কিছুটা বামপন্থার দিকে হেলে পড়ার কারণে বিএনপিকে সেই ট্যাগ থেকে আপাত বাইরে রেখেছে গণমাধ্যমটি। কিন্তু যখনই বিএনপি এবং জামায়াতের মত কোনো ক্ষেত্রে মিলে যায়, সেখানেই বিবিসি বাংলা বিএনপিকে সেই র্যাডিকেল হিসেবেই চিহ্নিত করতে চায়। সাম্প্রতিক সময়ে যারা বিবিসি বাংলাকে ফলো করেন, তারা বিষয়টি নিশ্চিত নোটিশ করবেন।
এখন প্রশ্ন ওঠে, ইসলামের কথা বললেই কি সেই দল র্যাডিকেল অর্থাৎ উগ্রপন্থী হয়ে ওঠে। তবে কি বিবিসি বাংলা’র মতন গণমাধ্যমগুলি ধরেই নিয়েছে ইসলাম মানেই উগ্রপন্থা! বাংলাদেশের কতিপয় গণমাধ্যমের চিন্তা ও প্রকাশের ভঙ্গিটা তেমনই। এদের চিন্তা অনুসরণ করলে মনে হয়, ইসলাম মানেই আইসিস বা আলকায়েদা। অথচ তাদের কাছে বাম এক্সট্রিমিস্টদের গুপ্ত সংগঠনগুলোকেও রাজনৈতিক দল বলে মনে হয়। আন্ডারগ্রাউন্ড বাম দলগুলোর প্রতিও তাদের একধরণের সহানুভূতি দেখা যায়, থাকে তাদের প্রতি পক্ষপাত। অথচ প্রকাশ্য ইসলামী দলগুলো তাদের ভাষায় এক্সট্রিমিস্ট, আজব না?
মোটাদাগে আন্ডারগ্রাউন্ড বাম এক্সট্রিমিস্ট সংগঠনগুলোর সাথে র্যাডিকেল আইসিস বা আলকায়েদার দৃশ্যমান মিল রয়েছে। বামরা শ্রেণিশত্রু নাম দিয়ে মানুষ হত্যাকে বৈধ করেছে, আর আইসিস করেছে কাফের বা বিধর্মী তকমায়। কিন্তু কাজ একই, মানুষ খুন। জানি, আমার এই বক্তব্যে দু’একজন গণমাধ্যমের বিগশটরা আপত্তি করবেন, আমাকে মূর্খ বলবেন। কিন্তু তাদের জ্ঞানের পরিধি আমার জানা আছে। তারা মূর্খতাকেও ডিজার্ভ করেন না, তারা মূলত ডগমাটিক, মতান্ধ। মূর্খদের বোঝানো যায়, মতান্ধদের নয়। সুতরাং মতান্ধ মানেই র্যাডিকেল, উগ্রপন্থী। ‘মতান্ধদের দিনরাত্রি সমান, অন্ধকার হাতড়ে তারা অন্ধকারই জমান।’ এবং এটাই সত্যি।
যাকগে, কথা হচ্ছিল এনসিপি কি ডানপন্থার দিকে ঝুঁকছে কিনা সে প্রশ্নে। বিবিসি বাংলাকে উল্টো প্রশ্ন করি, এনসিপি কবে বামপন্থায় ছিল? এনসিপি বাংলাদেশপন্থার কথা বলে, বাংলাদেশ হলো এনসিপি’র চিন্তার মৌলিক বিষয়। বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদ, ধর্ম, সামাজিক অনুশাসন সবই বাংলাদেশপন্থার মধ্যে রয়েছে। সুতরাং এনসিপিকে বামপন্থার দল মনে করা হলো অকাট চিন্তা, মূর্খতা।
বিগত রেজিমে বিবিসি বাংলা প্রকাশ্যে বিএনপিকে ডানপন্থা হিসেবে র্যাডিকেল প্রমাণ করতে চেয়েছে, এখন লেগেছে এনসিপি’র পিছে। অর্থাৎ যে দলই বাংলাদেশের কথা বলে, বাংলাদেশপন্থার কথা বলে সেই দলই বিবিসি বাংলা’র মতন গনমাধ্যমগুলোর কাছে র্যাডিকেল তথা উগ্রবাদী হয়ে ওঠে। এখন প্রশ্ন হলো এই আলাপ আসলে কার। এই আলাপ মূলত ভারতের বিজেপি’র। ভারতশাসিত পশ্চিমবঙ্গে বিজেপি’র জয়ের পরে এই বিষয়গুলো দিবালোকের মতন পরিষ্কার হয়ে গেছে। শুভেন্দুর কাছে একমাত্র গ্রহণযোগ্য দল হলো আওয়ামী লীগ। আওয়ামী লীগের বাম লেজুরগুলোর কথা না বলি। কারণ বাংলাদেশের ভোট ও জনসমর্থনের দিক দিয়ে এরা প্রায় অস্তিত্বহীন। কারণ হলো, এই দলগুলো বাংলাদেশপন্থার নয়। এরা বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদে বিশ্বাস করে না, যেমন করে বিএনপি ও এনসিপি। ইসলামপন্থী দলগুলোও বাংলাদেশপন্থার বাইরে নয়। যে দু’একটা আছে, তাদেরও খুঁটির জোর হিন্দুস্তানে। যেমন, আলকায়েদাকে দীর্ঘদিন পাকিস্তানপন্থী হিসেবে আখ্যায়িত করার পর দেখা গেল, তাদের মূল সুতো ভারতে। তাদের যুদ্ধ হয় পাকিস্তানের সাথে, আর বন্ধুত্বের আলাপ হয় ভারতে বসে।
শেষ কথায় আসি, বাংলাদেশপন্থাকে যারা ডানপন্থি বলে র্যাডিকেল হিসেবে আখ্যায়িত করতে চান, তারা মূলত বিজেপি’র সুরে কথা বলেন। যারা বাংলাদেশ এবং বাংলাদেশপন্থার দলগুলো নিয়ে দিল্লির সাউথব্লকের ভাষা ব্যবহার করেন, তারা নিশ্চিত বাংলাদেশবান্ধব নয়। তারা বাংলাদেশবিরোধী। তারা জুলাইয়ের বিরোধী। তারা বিএনপি, এনসিপিসহ সকল বাংলাদেশপন্থার দলগুলোর বিরোধী। এবং তারা কার বা কাদের সমর্থক তা আলাদা করে বলার অপেক্ষা রাখে না।
ফুটনোট: শ্রীলঙ্কায় যখন বিপ্লব ঘটে, দক্ষিণ এশিয়ার প্রথম বিপ্লব, তখনই বিবিসি বাংলাকে নিয়ে কথা বলেছিলাম, লিখেছিলাম। বিবিসি বাংলা শ্রীলঙ্কার বিপ্লবী পরিবর্তনকে স্রেফ প্রধানমন্ত্রীর পদত্যাগ বলে উল্লেখ করেছিল। আর বিপ্লবকালীন পরিস্থিতিকে আখ্যা দিয়েছিল ‘চলমান সহিংসতা’ হিসেবে। বিবিসি বাংলা’র তৎকালীন শিরোনাম ছিল, ‘শ্রীলংকায় বিক্ষোভের জেরে প্রধানমন্ত্রীর পদত্যাগ এবং চলমান সহিংসতার চিত্র’। বোঝেন অবস্থা। এই হলো মতান্ধ সাংবাদিকতা এবং যা প্রমাণিত।
লেখক – কবি, কলামিস্ট, প্রাবন্ধিক