
আব্দুল কুদ্দুস
এখনও অনেকেই মনে করেন মানুষকে প্রকৃতিকে ‘জয়’ করতে হবে, মানে প্রকৃতির উপর আধিপত্য কায়েম করতে হবে! নিজেকে প্রকৃতির ঊর্ধ্বে ভাবা বা প্রকৃতিকে জয় করার এই মানসিকতাই আধুনিক সভ্যতার অন্যতম সংকটের কারণ। আমরা যখন মনে করি প্রকৃতিকে আমাদের বুদ্ধিবৃত্তিক ও প্রযুক্তিগত উপায়ে জয় করতে হবে, তখন প্রকৃতি একটি ‘জীবন্ত সত্তা’ থেকে কেবল একটি ‘বস্তু’ বা ‘কাঁচামাল’-এ পরিণত হয়।
আর যে কোন উপায়ে সেই কাচামাল দখল ও লাভের জন্য ব্যবহার করতে মানুষ উদগ্রীব হয়, ভবিষ্যতের কথা না ভেবেই। তখন বনভূমি আমাদের কাছে কেবল কাঠ, পাহাড় কেবল খনিজ সম্পদ এবং নদী কেবল বিদ্যুৎ উৎপাদনের মাধ্যম হয়ে দাঁড়ায়। এই দৃষ্টিভঙ্গি মানুষের মধ্যে এক ধরনের ‘মালিকানা বোধ’ তৈরি করে। প্রকৃতি ধ্বংসের পায়তারা চলে এই মালিকানা বোধ থেকেই।
এই মালিকানা বোধ থেকেই জন্ম নেয় লাগামহীন ভোগবাদ। এর ফলেই জলবায়ু পরিবর্তন, জীববৈচিত্র্য হারানো এবং বাস্তুসংস্থানের ভারসাম্য নষ্ট হওয়ার মতো মহাবিপদ আমরা আজ প্রত্যক্ষ করছি। প্রকৃতিকে জয় করার চেষ্টা আসলে এক ধরনের ‘প্যারাসাইটিক’ বা পরজীবী আচরণ, যা শেষ পর্যন্ত তার আশ্রয়দাতা প্রকৃতিকেই ধ্বংস করে ফেলে। অন্যদিকে, প্রকৃতির সাথে একাত্ম হওয়ার ধারণা আমাদের শেখায় যে মানুষের অস্তিত্ব প্রকৃতির ওপর নির্ভরশীল, মালিকানা নয়।
আমাদের প্রতিটি শ্বাস, প্রতিটি কোষের বিভাজন এবং আমাদের মস্তিষ্কের নিউরাল নেটওয়ার্ক—সবই প্রকৃতির দান। আমরা যেমনটি ভাবি যে ‘স্ব’ বা ‘self’ একটি জৈবিক কল্পনা, সেই কল্পনার কারিগরও কিন্তু প্রকৃতিই। তাই নিজেকে প্রকৃতি থেকে আলাদা ভাবা আসলে এক ধরনের ‘অস্তিত্বগত ভ্রান্তি’।
প্রকৃতির একটি নিজস্ব ছন্দ আছে। যখন মানুষ এই ছন্দের বিরুদ্ধে যায়, তখন সে মানসিকভাবে অশান্ত এবং শারীরিকভাবেও অসুস্থ হয়ে পড়ে। প্রকৃতির সাথে মিলে থাকা মানে আদিম অবস্থায় ফিরে যাওয়া নয়, বরং আমাদের জ্ঞান ও প্রযুক্তিকে এমনভাবে ব্যবহার করা যা প্রকৃতির বিনাশ নয় বরং বিকাশ ঘটায়।
আমরা যখন প্রাণীকুল বা বনের প্রতি মমতা অনুভব করি, তখন তা কেবল দয়া নয়, বরং সেটি আমাদের নিজস্ব প্রজাতির টিকে থাকারই একটি বিবর্তিত কৌশল। নিজেকে প্রকৃতির অংশ ভাবলে অন্যের কষ্ট অনুভব করাও সহজ হয়। এই ‘কানেক্টেডনেস’ বা সংযুক্তির বোধ মানুষকে নিঃস্বার্থ হতে শেখায়, যা জন্ম দেয় প্রকৃত সামাজিক ও প্রাকৃতিক সহমর্মিতা।
এখন আমরা জানি যে, মাটির কাছাকাছি থাকা বা বনের নিস্তব্ধতায় সময় কাটানো আমাদের কর্টিসল (মানসিক চাপের হরমোন) কমায় এবং নাইট্রিক অক্সাইডের প্রবাহ ঠিক রাখে। অর্থাৎ, আমরা শরীর ও মনে তখনই সেরা অবস্থায় থাকি, যখন আমরা প্রকৃতির সাথে কৃত্রিম দূরত্ব কমিয়ে আনি।
মানুষের দম্ভ তাকে শিখিয়েছে প্রকৃতিকে শাসন করতে, কিন্তু মানুষের প্রজ্ঞা তাকে শেখায় প্রকৃতির সাথে বাস করতে। নিজেকে প্রকৃতির অংশ হিসেবে দেখা মানে দুর্বল হওয়া নয়, বরং নিজের অস্তিত্বের শেকড়কে চেনা। একা সুখী হওয়া যেমন অসম্ভব, তেমনি প্রকৃতিকে ধ্বংস করে মানুষের টিকে থাকা বা সুখী হওয়াও অসম্ভব। আমাদের মুক্তি কোনো ‘বিচ্ছিন্নতায়’ নয়, বরং এই বিশাল প্রাণের স্পন্দনের সাথে নিজেকে একীভূত করার মধ্যেই নিহিত।
লেখক – গবেষক,কলাম লেখক, চিকিৎসক