বুধবার, সকাল ১১:৩১, ৬ই জ্যৈষ্ঠ, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

বুধবার, সকাল ১১:৩১, ৬ই জ্যৈষ্ঠ, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

হোম মতামত

রবীন্দ্রনাথ কার সৃষ্টি, তাঁর সৃষ্টি কোন শ্রেণির পক্ষে?

শেয়ার: https://www.timebulletin24.com/news/4hb9on

অধ্যাপক নজরুল ইসলাম

রবীন্দ্রনাথকে নিয়ে লেখা সহজ কাজ নয়। কারণ তিনি বিশ্বকবি। মধ্যবিত্ত বাঙালির আবেগ, চিন্তা ও বিশ্বাসের গভীরে রবীন্দ্রনাথ এমনভাবে অবস্থান করেন যে তাঁকে নিয়ে সমালোচনা করাও সহজ নয়। সত্যিই তো, মানুষ যখন অনেক উঁচুতে অবস্থান করে, তখন তাকে নিয়ে সমালোচনা করার কাজটি কঠিন হয়ে যায়। আবার রবীন্দ্রনাথকে নিয়ে আলোচনা করার যোগ্যতাও আমার খুব সামান্য। কারণ রবীন্দ্রসাহিত্য নিয়ে আলোচনা করতে গেলে তাঁর বিশাল শিল্পকর্ম মনোযোগ দিয়ে পাঠ করতে হয়। আমি স্বীকার করছি, আমি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের খুব গভীর পাঠক নই। তবে শৈশবেই —
“আমাদের ছোট নদী চলে আঁকে বাঁকে,
বৈশাখ মাসে তার হাঁটু জল থাকে…” —
এই কবিতার মধ্য দিয়েই রবীন্দ্রনাথের প্রতি শ্রদ্ধা, ভালোবাসা ও আকর্ষণ জন্মেছিল হৃদয়ের গভীরে।

রবীন্দ্রনাথ বাঙালি হৃদয়ের আবেগ ও অনুভূতির নাম। শিক্ষিত, অর্ধশিক্ষিত, মধ্যবিত্ত ও উচ্চবিত্ত বাঙালি পরিবারে ঘরের দেয়ালে রবীন্দ্রনাথের দরবেশসদৃশ একটি ছবি বহুদিন ধরে ঝুলতে দেখা যেত। কোনো কোনো বাড়িতে সেই ছবিতে শুকনো ফুলের মালাও ঝুলত। তাঁর রচিত গান, কবিতা, গল্প ও উপন্যাস বাংলা সাহিত্যের অসাধারণ সৃষ্টি। কিন্তু একটি সহজ প্রশ্নই বিশাল বিতর্কের জন্ম দেয় — রবীন্দ্রনাথ কার সৃষ্টি? তাঁর সাহিত্য কোন শ্রেণির পক্ষে?

শ্রেণিবিচারে রবীন্দ্রনাথ ছিলেন জমিদারপুত্র। স্বভাবতই জমিদার পরিবারে তাঁর জন্ম, বেড়ে ওঠা ও সাহিত্যচর্চা। কোনো লেখক বা শিল্পীর সৃষ্টিতে তাঁর জীবন ও আচরণের ছাপ অবশ্যই পড়ে। তাই প্রশ্ন উঠতেই পারে — রবীন্দ্রনাথের জীবনে কি ঠাকুর পরিবারের উচ্চবিত্ত শ্রেণির ছাপ ছিল? তা কি তাঁর রচনায় প্রকাশ পেয়েছে? যারা গভীরভাবে রবীন্দ্রনাথ পড়েছেন, তাঁকে জানেন, বোঝেন ও গবেষণা করেছেন, তাঁরা নিশ্চয়ই আমার মন্তব্যের মর্মার্থ উপলব্ধি করবেন।

বাঙালি সমাজে একটি কথা প্রচলিত আছে — “রক্ত কথা বলে।” রবীন্দ্রনাথের শরীরেও সেই জমিদারি রক্ত প্রবাহিত ছিল, তা অস্বীকার করার কোনো উপায় নেই। তিনি সরাসরি জমিদারি দেখাশোনা ও পরিচালনা করেছেন। মূলত জমিদারি কার্য পরিচালনার জন্যই তিনি পূর্ববঙ্গ ভ্রমণ করেছিলেন। সেই ভ্রমণকালে রচিত কবিতা ও ছোটগল্পে তার ঐতিহাসিক দলিল ও প্রমাণ পাওয়া যায়।

কেউ কেউ দাবি করেন, রবীন্দ্রনাথ ছিলেন প্রজাবান্ধব বা দরদী জমিদার। কিন্তু জমিদারি চরিত্র থেকে রবীন্দ্রনাথকে সম্পূর্ণ আলাদা করে দেখার চেষ্টা অনেক সময় একটি বিশেষ দৃষ্টিভঙ্গির ফল। কারণ, সমালোচকদের অনেকেই কোনো না কোনোভাবে পুঁজিবাদী সমাজব্যবস্থা বা চিন্তাকে ধারণ করেন। রবীন্দ্রনাথও সেই বাস্তবতা জানতেন।

ঠাকুরবাড়িতে কলকাতার প্রথম দিককার নাট্যমঞ্চ প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল। সেখানে যেসব নাটক মঞ্চস্থ হতো, তার দর্শক ও অতিথিদের মধ্যে ইংরেজ সাহেবরাও থাকতেন। নাট্যচর্চার পেছনে ইংরেজ সংস্কৃতির প্রতি আকর্ষণ ও প্রভাব কাজ করেছিল — এমন ধারণা অমূলক নয়। রবীন্দ্রনাথের পরিবারের সদস্যরাও অভিনয়ে অংশ নিতেন, আবার পেশাদার অভিনেতা-অভিনেত্রীরাও অভিনয় করতেন। শাসক ইংরেজরা সেই অভিনয় বহুবার উপভোগ করেছেন — এমন তথ্য বিভিন্ন গ্রন্থে পাওয়া যায়। জমিদারি সূত্রেই ঠাকুরবাড়িতে ইংরেজদের আগমন ঘটত, এ নিয়ে নতুন করে প্রমাণ হাজির করার প্রয়োজন নেই।

এখন প্রশ্ন হলো — যে ইংরেজরা গোটা ভারতবর্ষে শোষণ, নির্যাতন, হত্যা ও বিভীষিকার রাজত্ব কায়েম করেছিল, যখন ভারতবর্ষের মানুষ তাদের বিতাড়িত করার জন্য আন্দোলন-সংগ্রাম ও আত্মত্যাগে লিপ্ত, ঠিক সেই সময়ে ঠাকুরবাড়িতে তারা সমাদৃত ও আপ্যায়িত হচ্ছিল কেন? আমার এই লেখার বিরোধিতায় অনেকে নানা যুক্তি তুলে ধরবেন। কারণ আমাদের দেশের বহু বুদ্ধিজীবী শ্রেণিচেতনার প্রতিনিধিত্ব করেন না; তাঁরা রবীন্দ্রনাথের ভক্ত ও অন্ধ অনুরাগী। অথচ অন্ধত্ব যেকোনো চিন্তার ক্ষেত্রেই ভয়াবহ।

প্রকৃত সত্য হলো — শ্রেণি সর্বত্র বিরাজমান। শিল্প, সাহিত্য, এমনকি পারিবারিক ও ব্যক্তিজীবনেও শ্রেণির অবস্থান আছে। সেখানে শিল্প ও সাহিত্যে শ্রেণির প্রভাব থাকবে না — এ কথা মানার কোনো যুক্তি নেই। সাহিত্য কেবল মানুষের হৃদয়, অনুভূতি ও আবেগের বহিঃপ্রকাশ নয়; সাহিত্য তখনই পূর্ণতা পায়, যখন তাতে রক্ত-মাংসের গন্ধ, ঘামের গন্ধ থাকে। তা না হলে সাহিত্য খণ্ডিত থেকে যায়। কারণ সাহিত্য যদি মানুষের জন্য হয়, তবে বিশাল জনগোষ্ঠীকে বাদ দিয়ে রচিত সাহিত্য মানবতার সাহিত্য হতে পারে না।

যাঁরা গণমানুষের পক্ষে দাঁড়িয়ে ক্ষুধা, দারিদ্র্য ও জীবনসংগ্রাম নিয়ে সাহিত্য রচনা করেছেন, তাঁরাও এক ধরনের শ্রেণিচেতনা ধারণ করেন। প্রশ্ন হলো — পরিবর্তিত পৃথিবীতে, পুরোনো সমাজব্যবস্থাকে পেছনে ফেলে যে নতুন সমাজ গড়ে উঠছে, সেই বাস্তবতাকে অস্বীকার করে রচিত সাহিত্য কি পরিপূর্ণ হতে পারে?

,লেখকবাংলা বিভাগ, পুন্ড্র বিশ্ববিদ্যালয়।

মন্তব্য করুন

আপনার ইমেইল প্রকাশ করা হবে না। * চিহ্নিত ঘরগুলো আবশ্যক।

শেয়ার করুন