বুধবার, সকাল ১০:২৭, ৬ই জ্যৈষ্ঠ, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

বুধবার, সকাল ১০:২৭, ৬ই জ্যৈষ্ঠ, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

হোম সাহিত্য

একটি গল্পের প্লট

শেয়ার: https://www.timebulletin24.com/news/iizfmt

কেকা অধিকারী

দৈনিক পত্রিকায় গুটিকয় চিঠি এবং পরবর্তীতে একটি স্মৃতিকথামূলক লেখা ছাপা হলে পর নিয়ামত আলির অন্তরে এই বিশ্বাস দৃঢ় হয় যে, লেখক হওয়াই তার নিয়তি। অতএব নিয়তির কাছে নিজেকে সমর্পণ করে নিয়ামত। তার মতো ক্ষুদ্র লেখকের পক্ষে উপন্যাস কিংবা মহাকাব্য রচনা অসম্ভব বিধায় ছোট গল্প রচনায় মনোনিবেশ করার সিদ্ধান্ত নেয় সে। কিন্তু ‘লিখব’ বললেই তো লেখা যায় না। লেখার জন্যে পরিবেশ ও অনুপ্রেরণা প্রয়োজন যার কোনোটিই তার নেই। নিয়ামতের পরিবারে যারা একটু আধটু লেখাপড়া জানেন তারা তা করেছেন নেহাতই অন্নসংস্থানের পক্ষে সহায়ক শক্তি বিবেচনায়। তাদের কেউ কখনো পত্র-পত্রিকা পড়েন না; গল্পের বইও না; লেখালেখি করার চিন্তা অবান্তর। সংসারের চাপে বন্ধু-বান্ধবের বন্ধনও ঘুচেছে তার ম্যালা কাল। স্ত্রী মনোয়ারা বেগম ওরফে মনু বাজারের ফর্দটিই কেবল লিখতে পারেন যা উদ্দেশ্য প্রকাশে সদাসার্থক কিন্তু নির্ভুল নয়। ফলে মফস্বল শহরের বাসিন্দা ও একটি স্থানীয় এনজিও’র অফিস সহকারী অন্তর্মুখী নিয়ামত আলির পক্ষে সাহিত্যমনস্ক মানুষের সান্নিধ্যে আসার সম্ভাবনা ক্ষীণ।

এমতাবস্থায়ও বিসদৃশভাবে তার ভেতরে জেগে ওঠা সাহিত্যপ্রেমী মনটির তুলনা চলে শুধু বিবর্তনের নানা ধাপ পেরিয়ে আসা অবিকৃত তেলাপোকার সাথে। এ মনটিকে বাঁচিয়ে রেখেছে মূলত তার অফিসে রাখা দু’টি দৈনিক পত্রিকা। পিয়নের বদান্যতায় নিয়মিত নিয়ামত আলির হাতে আসে শুক্রবারের সাহিত্য পাতা। কাজে ফাঁকি দিয়ে আড্ডা দেয়া কিংবা সিগারেট ফুঁকতে বাইরে গিয়ে একেকবারে আধাঘণ্টা করে সময় কাটিয়ে আসা যেহেতু তার স্বভাব নয়, তাই তার একটু আধটু পত্রিকা পড়া নিয়ে কর্তৃপক্ষ তেমন উচ্চবাচ্য করেন না।

ভেতরকার মানুষটি তাকে এমনভাবে অনুভব করায় যেন তার গল্পকার হওয়া মৃত্যুর মতো অবধারিত। দাদা মুন্সি মোতাহের আলি যেমন করে জানতেন তিনি জুম্মাবার ইন্তেকাল করবেন এবং যেটা তিনি করেও ছিলেন, তেমন করে নিয়ামত আলিও জানেন যে, তিনি একজন গল্পকার হবেন। পাঠকের ধৈর্যচ্যুতি ঘটতে পারে তথাপিও এ পর্যায়ে মোতাহের আলির মৃত্যুর কাহিনিটি বলা আবশ্যক। তিনি যে শুক্রবার ইন্তেকাল করেন তার সপ্তাহখানেক আগে থেকে সকলকে বলতে শুরু করেছিলেন, ‘সামনের জুম্মাবার আমি চলে যাব।’ কয়েকদিন জ্বরে ভোগা শক্ত-সমর্থ লোকটির এমন কথা মানুষ আমলে নেয় না। নিয়ামত আলির দাদীও মুখ ঝামটে বলেন, ‘ও আবার কেমনতর কথা!’ কিন্তু কয়েকবার কথাটি শোনার পরে তার মনে ‘ডর’ ধরে। তিনমাসের নিয়ামত আলিকে কোলে নিয়ে বুকের দুধ খাওয়াতে থাকা ছেলের বৌকে ডেকে বলে, ‘হুনছো বউ, তোমার শ্বশুর কী কয়? আমার তো ভালা ঠ্যাকতেছে না।’ শুক্রবার এলে মোতাহের আলি নিয়ামত আলির পিতা রহমত আলিকে ডেকে বলেন, ‘যাও বাপ, জুম্মার নামাজটা আদায় কইরা আসো। আমিও বিছানায় বইসা পড়ি। ফেরতে দেরি কইরো না কিন্তু।’ রহমত আলি তাড়াতাড়িই বাড়ি ফিরেছিলেন সেদিন। সবাই একসাথে দুপুরের ভাত খেয়েছেন। মোতাহের আলিও বিছানা ছেড়ে মাটিতে আসন পেতে সবার সাথে বসেছেন। নাতি নিয়ামত আলিকে আদর করেছেন, অন্যদেরকে আল্লাহর পথে চলতে নসিহত করেছেন। শেষে বলেছেন, ‘তোমরা তোমাগো কামে যাও, এহন আমি ঘুমাবো।’ বিকালে ডাকতে গিয়ে দাদী দেখেন তার দাদা আর বেঁচে নাই! বাবা-মা, দাদী আর পাড়া-পড়শির মুখে এ কাহিনি হাজারও বার শুনেছে নিয়ামত। ইদানীং ঘটনাটা তার মনে বারবার আসে। দাদার মতো তাকেও যেন কেউ জানিয়ে গেছে, ‘তুমি লেখক হবে।’ এ যেন স্বপ্নে পাওয়া বিধান!

নিয়তির বিধান মেনেই কাজের ফাঁকে নিয়ামত আলি নিজ মনে গল্পের কাহিনি সাজায়, চরিত্রদের সাথে আলাপচারিতায় মত্ত হয়। গল্পের চরিত্রদেরকে চারপাশে নিয়েই সে অফিসের যাবতীয় কর্ম সম্পাদন করে। কিন্তু গল্পের কোন চরিত্রই না তার কম্পিউটারের স্ক্রিনে, না সাদা কাগজের বুকে ধরা দেয়। অফিস শেষে ঘরে ফিরে খাটে বসে খাটের উপর কাঠের টুল তোলে। তারপর তার উপরে লাইনটানা খাতা রেখে তার গল্পের চরিত্রদের ধরার চেষ্টা চালিয়ে যায় সে। রাত জেগে কারেন্ট বিল বাড়িয়েও তার লেখাগুলি কেমন যেন গল্প হয়ে ওঠে না। মৃত্যু দাদার কাছে ধরা দিলেও গল্পরা তার অধরাই থেকে যায়। নাছোড়বান্দা নিয়ামত এক সময় উপলব্ধি করে কোনো বড় কাজই প্রস্তুতি ছাড়া সম্পন্ন হয় না।

লেখক হবার বাসনায় কিছু প্রস্তুতি সম্পন্ন করে নিয়ামত আলি। সে জেনেছে ভালো লিখতে হলে ভালো বই পড়তে হয়। কিন্তু ভালো বই কোনগুলি? কোন বইগুলি পড়া জরুরি? তাছাড়া এ মফস্বল শহরে ভালো বইয়ের দোকান কোথায়? তারচেয়ে বড় কথা সে সব বই কেনার সাধ্য কি তার আছে? এমন সময় সস্তায় ভালো বই পড়ার একটি উপায় পেয়ে বর্তে যায় সে। একদিন তার চোখে পড়ে বাসার গলির মাথায় জাহাঙ্গীর ভ্যারাইটি স্টোরের সামনে দাঁড়িয়ে বিশ্ব সাহিত্যকেন্দ্রের ভ্রাম্যমাণ লাইব্রেরির গাড়িটি। মুহূর্তেই তার সমস্যার সমাধান হয়ে যায়। পকেটের প্রায় সব কটি টাকা খরচ করে সে বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্রের সদস্য হয়। তারপর থেকে প্রতি রবিবার বিভিন্ন নামকরা লেখকের ছোট গল্পের বই এনে পড়া শুরু করে। ইতোমধ্যে নিয়ামত রবীন্দ্রনাথ, বিভূতিভূষণ, যশবন্ত সিং, আন্তন চেখভের ছোট গল্পসমগ্র পড়ে শেষ করেছে। যশবন্ত সিং-এর বই থেকে ছোট গল্পের চরিত্র সম্পর্কে জেনেছে। গভীর ভাবনায় ডুবে থেকে নিজে নিজে ছোট গল্পের প্রকৃতি বোঝার চেষ্টা চালিয়েছে। এভাবেই অকস্মাৎ তার চোখ খুলে যায়। বইয়ের ভূমিকায় আন্তন চেখভের জীবনী পড়তে পড়তে সে জানতে পারে যে, এই লেখক অর্থের বিনিময়ে গল্পের প্লট সংগ্রহ করতেন। আইডিয়াটি দারুণ, ভেবে দেখার মতো বৈকি! গল্পের প্লট ঠিক করতে তার তো অন্যের উপরেই নির্ভর করতে হবে। ‘অফিস টু বাসা, বাসা টু অফিস’ জাতীয় নিরামিষ জীবনের কাহিনি নিয়ে কি গল্প হয়? নানান স্তরের হাজারো মানুষের সাথে মেলামেশা, ভ্রমণের অভিজ্ঞতা না থাকলে ভালো গল্প লেখা যায় না।

কিছুদিন থেকে অফিসের রিসেপশনিস্ট মেয়েটি তার সাথে একটু আধটু কথা বলতে শুরু করেছিল। এ দিকে স্মৃতিকথামূলক লেখাটা পত্রিকায় ছাপা হয়েছে। সেটা কাউকে দেখাতে নিয়ামত আলির মনটাও ছটফট করছে। কিন্তু কাকে দেখাবে? তেমন মানুষ কই? মেয়েটি একদিন কাছে এসে দাঁড়াতে আবেগের বশবর্তী হয়ে লেখাটা তার সামনে ধরে সে। মেয়েটির চোখে বিস্ময়। এরপর থেকে মেয়েটি তাকে সমীহ করতে শুরু করেছে। সময়ে অসময়ে এসে তার কাছে দাঁড়ায়, লেখালেখির খবর জানতে চায়। সেও লজ্জা কাটিয়ে নিজের লেখা, লেখার পরিকল্পনা নিয়ে কথা বলে। তার গল্পকার হবার স্বপ্ন, স্বপ্ন বাস্তবায়নের পথে অন্তরায় সম্পর্কেও মেয়েটির সাথে আলাপ করতে পেরে সে অনেকটা হালকা বোধ করে। ‘নিয়ামত ভাই, গল্প কতদূর?’ লেখার অগ্রগতি নিয়ে মেয়েটির সাধারণ একটি প্রশ্নই তাকে সাগরসমান অনুপ্রেরণা যোগায়।

সহসা অনুপ্রেরণার স্রোত ক্ষীণ হয়ে এল। মেয়েটির সাথে ইদানীং অফিসের অবিবাহিত সহকারী হিসাবরক্ষকের খুব ভাব দেখা যাচ্ছিল। কী জানি মেয়েটি হয়তো ভবিষ্যৎ রচনায় ব্যস্ত। অনুপ্রেরণায় ঘাটতি পড়াটা নিঃসন্দেহে পীড়াদায়ক, কিন্তু সে প্রকৃত অর্থে উদ্বিগ্ন হল এই ভাবনায় যে, এমন ভালো মেয়েটি অমন বাজে লোকের পাল্লায় পড়ল কি না। লোকটির সাথে যে শুধু নিয়ামত আলির সম্পর্ক খারাপ তা নয়। অফিসের নিম্নপদস্থ সবার সাথেই খারাপ। সহকারী হিসাবরক্ষক নিজে উচ্চপদস্থ নয়। তারপরেও সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন জীবনের টানাপোড়েনে তার কোনো সহানুভূতি নাই। অফিসে বেতন অ্যাডভান্স দেয়ার নিয়ম থাকলেও তা নিয়ে নানা তালবাহানা করে সে; যেন মানুষ তার কাছে টাকা ধার চাইছে কিংবা দিলেও এমনভাবে দেয় যেন নিজের পকেট থেকে দিচ্ছে। তার ভাবভঙ্গি যেমন অসহ্য তেমনি তার মুখের ভাষাও বিশ্রী, সময় বিশেষে অশালীনও বটে। এমন নীচ স্বভাবের একটি লোকের সাথে মেয়েটির সম্পর্ক! সে যাক। যার যার জীবন তার তার, প্রত্যেকে নিজের জীবন সম্পর্কে সিদ্ধান্ত নেয়ার মালিক। কিন্তু ফল যা হল তা হচ্ছে নিয়ামত আলির গল্প এগোচ্ছে না, কারণ সমস্যা সমস্যার জায়গাতেই রয়ে গেছে। সেই পুরানো সমস্যা — গল্পের প্লট সংকট। তার মনে হচ্ছিল গল্পের প্লট পাওয়ার চেয়ে দরিদ্র লোকের পক্ষে ডেভেলপারদের কাছ থেকে বাড়ির প্লট বুঝে পাওয়া সহজ।

গীবত গাওয়া নিয়ামত আলির স্বভাববিরুদ্ধ কিন্তু কী মনে করে একদিন মেয়েটির কাছে হিসাবরক্ষকের স্বভাব বিষয়ে দু’একটি কটু মন্তব্য করে ফেলেছিল। সে কারণেই কি মেয়েটি তার কাছে ইদানীং কম আসছে? কথাটা কি সে হিসাবরক্ষককে বলে দিয়েছে? লোকটি কি ওকে নিয়ামতের কাছে আসতে মানা করেছে? মনে তার নানা সংশয়। কিন্তু মেয়েটি আবার তার কাছে আসতে শুরু করল। তাকে অবাক করে দিয়ে নিত্যনতুন গল্পের প্লট পাবার এক অনন্য উপায়ও বাতলে দিল। উপায়টির কার্যকারিতা সম্পর্কে সন্দেহ প্রকাশের অবকাশ না দিয়ে মেয়েটি নিয়ামতের কম্পিউটারের কী-বোর্ডটি নিজ দখলে নিয়ে তার নামে ফেসবুকে একটি অ্যাকাউন্ট খুলে দিল। এ অ্যাকাউন্ট থেকেই মেয়েটি নিজের এবং অফিসের আরো কয়েকজনকে ফ্রেন্ড রিকোয়েস্ট পাঠালো। শেষে চেয়ার থেকে উঠতে উঠতে তার দিকে তাকিয়ে বলল, ‘দেখবেন কত্ত সহজে আপনার সমস্যার সমাধান হয়! আপনি গল্পের কত্ত প্লট পেয়ে যান!’ নিয়ামত আলির মন অদ্ভুত আনন্দে আপ্লুত হল। সত্যিই কি এত সহজে তার সমস্যার সমাধান হবে? সে একজন গল্পকার হয়ে উঠতে পারবে?

কয়েকদিন যেতেই নিয়ামত আলির ফেসবুক বন্ধু সংখ্যা দাঁড়ালো ২১ জনে। এবার মেয়েটির পরামর্শে চেখভের মতো সেও ফেসবুক ওয়ালে গল্পের প্লট আহ্বান করল। ‘… নির্বাচিত গল্পের প্লট প্রদানকারীকে ৫০০ টাকার প্রাইজবন্ড পুরস্কার দেয়া হবে।’ অচিরেই ফল পেল সে। দু’একজন তাদের জীবন-কাহিনি সবিস্তারে লিখে জানাতে লাগল যেগুলি ভ্রষ্টকালের ঢাকাই সিনেমার নষ্ট গল্পের মতো। নিয়ামত আলি অপেক্ষায় থাকে। আর কিছুক্ষণ পরপর নিজের ফেসবুক অ্যাকাউন্ট চেক করে — যদি কেউ ভালো প্লট দেয়! এমন করে যখন দেড় মাস গত, আশা মৃতপ্রায়, কাজে অমনোযোগিতার জন্যে একাধিকবার বসের ঝাড়ি হজম হয়েছে ঠিক তখনই সে একটি ভালো প্লট পেল।

‘সম্ভবপর গল্পের প্লট’ — সময়কাল : দেশ বিভাগের কিছু পূর্বে। এক দম্পতি। স্বামীটি বাঁশি অন্তঃপ্রাণ। চরম অর্থকষ্টে থেকেও যিনি আত্মসম্মানবোধ হারান না। এদের সাথে ঘনিষ্ঠ হয়েছিল এক সম্পর্কিত ভাগ্নে। এক সময় অভাবের তাড়নায় তারা শহর ছাড়েন। পরে এক ট্রেন দুর্ঘটনায় স্বামীটি মারা যান। ঘটনাচক্রে ভাগ্নের সাথে মামীর দেখা হয়। মামী প্রতিবছর দুর্ঘটনার স্থানটিতে স্বামীর মৃত্যুদিনে তীর্থ করেন। মামার বাঁশিটি মামী ভাগ্নের কাছ থেকে চেয়ে নেয়। বাঁশিটি হয় তার আজীবনের বেঁচে থাকার অবলম্বন।
নিয়ামতের সংশয় থাকে না যে, একে গল্পরূপ দেয়া গেলে তা একটি অসাধারণ গল্প হবে।

অচেনা ঘোরের মধ্যে পরের পনেরটি দিন অতিবাহিত হল। নিয়ামত গল্প নিয়ে অনেক পরিশ্রম করেছে, কখনো কাগজ-কলমে, কখনো চলতে ফিরতে মনে মনে গল্পের সব খুঁটিনাটি ভেবেছে। মাঝে প্লট প্রদানকারী তেইশ-চব্বিশ বছরের ছেলেটি অফিসে এলে সে তার সাথে আলোচনা করে গল্পের প্লটটি আরো ভালো করে বুঝে নিয়েছে। দেখে অবাক হয়েছে এমন প্লট এই ছেলের মাথায় এল কী করে! কিন্তু এখনকার ছেলে-মেয়েরা কত কিছু জানে। তাদের চিন্তা-চেতনার গভীরতা চেহারা দেখে বোঝার উপায় নেই। প্রাইজবন্ড কয়টি ছেলেটির হাতে তুলে দিতে টানাটানির সংসার চালানো নিয়ামত আলির মনে কষ্ট হলো না বরং মনে হল, ‘আরেকটু বেশি দিতে পারলে ভালো হতো!’ যাক, গল্প শেষ হল। নিয়ামত গল্পটি সর্বাধিক পঠিত দৈনিকের সাহিত্য সম্পাদক বরাবর ই-মেইল করে পাঠিয়ে তবে শান্ত হল।

এরপর শুরু হল দিন গোনা, দিন-রাত অস্থিরতা — গল্পটি পড়ে পাঠক প্রতিক্রিয়া কেমন হবে? গল্পটিকে ঘিরে তার কত স্বপ্ন! রিসেপশনিস্ট মেয়েটির কৌতূহল তাকে আরো বেশি স্বপ্নচারী করে তোলে। একটি হঠাৎ খবর নিয়ামত আলিকে বিষণ্ন করে। তাদের রিসেপশনিস্ট চাকরি ছেড়ে দিয়েছে। তার হবু স্বামীর মেয়েদের চাকরি করা পছন্দ নয়। আগামী মাসে সহকারী হিসাবরক্ষকের সাথে তার বিয়ে। অফিসের সবাই বিয়ের দাওয়াত পেয়েছে। আর চাঁদা তুলে উপহার কেনার দায়িত্ব পড়েছে নিয়ামত আলির উপর।

এবার নিয়ামত আলির সত্যিই মন খারাপ করার কারণ ঘটল। যে পত্রিকায় সে লেখা পাঠিয়েছিল তার সাহিত্য সম্পাদক তাকে ই-মেইল দিয়েছেন। ‘নকল বা চুরি করে কখন সাহিত্যিক হওয়া যায় না। চুরি করতেও জ্ঞান-বুদ্ধি লাগে। আপনার দেখছি তাও নেই। থাকলে মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের “অতসীমামী” শীর্ষক বহুল পঠিত গল্পটি নিয়ে এমন দুঃসাহস দেখাতেন না। আশা করব ভবিষ্যতে এমন কাজ থেকে বিরত থাকবেন।’
রাগে-দুঃখে, লজ্জা আর অপমানে নিয়ামত আলি ম্রিয়মাণ হয়। ভাগ্যিস মেয়েটি অফিসে নেই!

দেখতে দেখতে সহকারী হিসাবরক্ষকের বিয়ের দিন চলে আসে। অফিসের পক্ষে কয়েকজন দাওয়াত রক্ষা করতে যান। খাওয়া শেষে তারা নববর-বধূকে শুভেচ্ছা জানাতে সমানে স্টেজের দিকে এগিয়ে যায়। সেখানে দাঁড়িয়ে থাকা গল্পের প্লট দেয়া সেই ছেলেটির মুখে নিয়ামত আলির চোখ আটকে যায়। হ্যান্ডশেক করতে সে বরের দিকে হাত বাড়ালে ছেলেটি উচ্চকণ্ঠে নববধূকে বলে ওঠে, ‘ভাবী, আপনাদের নিয়ামত ভাইয়ের গল্পটা ছাপা হল কি না খোঁজ নিয়েছেন?’ উত্তরে নববধূর ভ্রুকুটি আর বরবেশে থাকা সহকারী হিসাবরক্ষকের ঠোঁটের বাঁকা হাসি কারো চোখ এড়ায় না।

সকলের কৌতূহলী দৃষ্টি উপেক্ষা করে কমিউনিটি সেন্টারের গেট পেরোনোর মুহূর্তে মোটা মাথার সোজা মানুষটির উপলব্ধি হয় লেখক হওয়া নয় বরং একমাত্র অবধারিত সত্য হচ্ছে মৃত্যু। শহরের মধ্য দিয়ে যাওয়া রেললাইন ধরে হাঁটতে থাকে সে। সামনের দিক থেকে হুইসেল বাজিয়ে ট্রেন ছুটে আসছে। সিদ্ধান্ত নিতে এক মুহূর্ত বিলম্ব হয় না তার — আর কখনো লিখবে না সে। দাদা মোতাহের আলির পথ ধরে আমাদের গল্পকার নিয়ামত আলি নিশ্চিত মৃত্যুকেই বরণ করে।

মন্তব্য করুন

আপনার ইমেইল প্রকাশ করা হবে না। * চিহ্নিত ঘরগুলো আবশ্যক।

শেয়ার করুন