শুক্রবার, রাত ৩:২০, ৮ই জ্যৈষ্ঠ, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

শুক্রবার, রাত ৩:২০, ৮ই জ্যৈষ্ঠ, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

হোম দর্শন

কোরবানী

শেয়ার: https://www.timebulletin24.com/news/4wa62j

কোরবানী অনুষ্ঠানের মূলে যে প্রেরণা তাহা আত্মবিস্মৃতি ভাব আনয়ন করা যদ্বারা জগত সংসার আচ্ছন্ন করিয়া মানব মন পার্থিব মোহপাশ কাটাইয়া উঠিতে পারে কারণ আল্লাহ লাভের পথে এইগুলি ঘোর অন্তরায়। সংসারী লোকের জন্য বস্তুজগতে জড়াইয়া থাকিয়াও উহার মোহপাশ হইতে মুক্ত হইয়া বাস করা সহজসাধ্য হইয়া উঠে না, তাই তাহার জন্য বৎসরে অন্তত এই দশ দিনের মহড়ার ব্যবস্থা দেওয়া হইয়াছে। মানুষ যখন নিজের আমিত্বের দাবিটুকুও ছাড়িয়া দেয় তখনই কেবলমাত্র তাহার অন্তর আল্লাহর সিংহাসনে পরিণত হইতে পারে। সুতরাং দেখা যায় কোরবানী অনুষ্ঠান অন্য সর্ব প্রকার ধর্মানুষ্ঠানকে ছাড়াইয়া গিয়াছে।এখানে জগতের সবচেয়ে প্রিয় আপন অন্তরের আমিত্ব বোধটুকুও বিসর্জন দেওয়ার ব্যাপার অর্থাৎ আল্লাহকেই অন্তরের সকল স্থান ছাড়িয়া দিয়া নিজে বিদায় গ্রহণের পালা। তাই এই দশ দিনের এক দিনের সৎ আমল ও চিন্তার তুল্য পুণ্য কাজ সারা বৎসরের সৎকর্ম হইতেও আল্লাহর নিকট অধিক শ্রেয় এবং ত্যাগ উদ্দেশে যে রোজা পালন তাহার এক একদিনের মর্যাদা সারা বৎসর রোজা রাখার সমতুল্য (হাদিস)।

মানুষের কর্তব্য হইল নির্লিপ্তভাবের সাহায্যে বস্তুবাদের সব আকর্ষণ অতিক্রম করিয়া যাওয়ার চেষ্টা করা মাত্র, কিন্তু তাহা ডিঙাইয়া যাওয়ার ক্ষমতা তাহার নাই ,যদি প্রভু তাহার চেষ্টার একাগ্রতার উপর সন্তুষ্ট হইয়া তাহাকে গ্রহণ না করেন ।

কোরবানী করার মূল কথা আমিত্বের লোপ সাধন করিয়া নিজকে সম্পূর্ণ আল্লাহর অর্পণ করার চেষ্টা করা। ধর্মসাধনায় যত প্রকার ব্যবস্থা রহিয়াছে যাহা দ্বারা প্রভুর নৈকট্য লাভের চেষ্টা করা হইয়া থাকে কোরবানী তাহাদের মধ্যে চরম ব্যবস্থা ।

ধন মান শক্তি সামর্থ্য ইত্যাদির সাহায্যে পরোপকার করার মধ্যে যত প্রকার ত্যাগ সাধনা রহিয়াছে তাহাতে প্রচুর পরিমাণ আত্মত্যাগ ও কঠোর সাধ্য সাধনা থাকিতে পারে কিন্তু কোরবানী তাহাদের সকল হইতে সম্পূর্ণ স্বতন্ত্র অনুষ্ঠান। এখানে রহিয়াছে আমিত্ব বোধের পূর্ণ বিস্মৃতি-একেবারে আমার আমি জ্ঞানটি লোপ করিয়া তোলার সাধনা। সেখানে বস্তুবাদের মধ্যেই থাকিয়া উহাকে আল্লাহর সেবায় নিয়োগ করা—আমার কোন খাহেসিয়াত না রাখিতে চেষ্টা করা আর এখানে রহিয়াছে একেবারে আত্মবলি—বস্তু নিরপেক্ষ সাধনা-পার্থিব সংশ্রব ত্যাগ। শুধু “লাব্বায়েক” আর “লাব্বায়েক” ভাব অর্থাৎ তাঁর সম্মুখে হাজির। তাঁর প্রেম অনুভূতির সাহায্যে সান্নিধ্য লাভের মধ্যে সংসারের অস্তিত্বজ্ঞান হারাইয়া ফেলা—ইহাই কোরবানীর সাধনা বা প্রচেষ্টা। এই চেষ্টা জিলহজ্ব মাসের প্রথম হইতে দশ দিন করিতে হইবে। হজ্বের প্রধান একটি শর্ত, “এহরাম” বাঁধা অর্থাৎ পার্থিব জীবনকে হারাম করিয়া দেওয়া। এখানেও ইহাই প্রধান শর্ত। এ না হইলে আত্মবলি ও আত্মবিস্মৃতি হইতে পারে না এবং এই শর্ত পালন না করিলে কোরবানী নিছক পশু হত্যায় পর্যবসিত হইয়া যায়। হজ্ব গমনে অপারগ ব্যক্তির জন্য কোরবানী অনুষ্ঠান হজ্বতুল্য। বহু দূরদূরান্তের লোকের জন্য প্রতি বৎসর হজ্ব যাত্রা সম্ভবপর কোনকালেই নহে কিন্তু এই কোরবানী অনুষ্ঠান পালনের দ্বারা আমরা সেই একইরূপ মহাকল্যাণের অধিকারী হইতে পারি। হজ্বব্রত সমাধানের মধ্যে যে মহাকল্যাণ নিহিত রহিয়াছে তাহা যদি সর্বসাধারণকে বিতরণ করিবার ব্যবস্থা আল্লাহর ধর্মে না থাকে তাহা হইলে আল্লাহ যে সবার উপর সমান সুবিচারক ও দাতা তাহার প্রমাণ দেওয়া শক্ত ।

আল্লাহ সর্ব বিষয়ে সাম্য প্রতিষ্ঠা করিয়াছেন আর যে বিষয়ে পূর্ণ সাম্যের প্রতিষ্ঠা নিজে না করিয়া আমাদিগের উপর ভার দিয়াছেন তাহার কোন মূল্যই আল্লাহর দৃষ্টিতে নাই। কারণ তিনি ধন-সম্পদ সম্বন্ধে বলিয়াছেন,-যদি দুনিয়ার সমস্ত ধনের মূল্য আল্লাহর দৃষ্টিতে মাছির একটি ডানার সমানও হইত তাহা হইলে তিনি এক ঘোট জলও কাফেরকে পান করিতে দিতেন না (হাদিস)। আমরা সেই মূল্যহীন জিনিসেরই অসাম্য জগতে দেখিতে পাই সবচেয়ে বেশি যার জন্য এত হানাহানি ।

কোরবানী সবার জন্য ফরজ কিন্তু আনুষ্ঠানিক ক্রিয়া হিসাবে ইহা সবার জন্য ফরজ করা হয় নাই। যাহার আর্থিক সামর্থ্য আছে তার জন্য ওয়াজেব করা হইয়াছে। এখানেও এক মহা হেকমত বিদ্যমান রহিয়াছে। যদি কোরবানী ফরজ করা হইত তবে সমস্ত মুসলিম জাহান এই দশ দিন প্রায় অচল হইয়া যাইত। সামাজিক দিক হইতে ইহা অবাস্তব। তাহা ছাড়া চরম ব্যবস্থা ফরজ হইতে পারে না। অথচ ধনী নির্ধন সবাই ইচ্ছা থাকিলেই কোরবানী করিতে চেষ্টা করিতে পারে । পশুকে প্রতীক করিয়া উহার উপর অন্তরের উৎসর্গ ভাবটির বহিঃপ্রকাশটুকু সমাধা করা যাহার আর্থিক সামর্থ্য আছে তাহার জন্য ওয়াজেব করা হইয়াছে। কিন্তু কোনরূপ ত্যাগের মনোভাব সৃষ্টি করার প্রয়াস না পাইয়া শুধুই ছুরি চালনার ক্রিয়াকে পশু হত্যা ছাড়া কিছুই বলা চলে না এবং তাহা অন্য সময়ে হইলেই বা ক্ষতি কি। পশু হত্যা করিয়া উহার মাংসাদি গরীবদিগকে লইয়া ভোগে লাগাইলেই হইল। কিন্তু তাহা নয়।কোরবানী অনুষ্ঠান মাংস ত্যাগ বা সমতুল্য অর্থ ত্যাগ নয়, ইহা একেবারে আত্মত্যাগের মহড়া।

কোরবানী ইমান ও আমলের অনুষ্ঠান নয়। মুসুল্লিপনা, সমাজে সত্য প্রতিষ্ঠার চেষ্টা ইত্যাদি যত প্রকার সদানুষ্ঠান আছে তাহা পালনের দ্বারা উত্তম ও সচ্চরিত্রবান মানুষ হওয়া যায় কিন্তু এই মহা অনুষ্ঠান এই সব হইতে সম্পূর্ণ স্বতন্ত্র। ইহা দ্বারা বস্তুবাদের কঠিন পরদা ছেদন করার প্রয়াস, অর্থাৎ মানুষের আমিত্বটুকুও বাদ দিলে আল্লাহ ছাড়া যে কিছুই আর থাকে না এই মহাজ্ঞান লাভের প্রয়াস। তাই যার কোরবানী কবুল হইয়া যায় সে আল্লাহর একান্ত আপন হইয়া যায় আর যার কবুল হওয়ার মত না হয় সে লাভ করে তার চেষ্টার কারণে অসীম সওয়াব বা কল্যাণ ।

সদর উদ্দিন আহ্‌মদ চিশ্‌তী

মন্তব্য করুন

আপনার ইমেইল প্রকাশ করা হবে না। * চিহ্নিত ঘরগুলো আবশ্যক।

শেয়ার করুন