বুধবার, দুপুর ১২:২৯, ৬ই জ্যৈষ্ঠ, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

বুধবার, দুপুর ১২:২৯, ৬ই জ্যৈষ্ঠ, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

হোম খবর

নীরব দুর্ভিক্ষের পথে হাওর: দায় এড়ানোর আর সুযোগ নেই

শেয়ার: https://www.timebulletin24.com/news/m1d17b

বাংলাদেশের হাওর অঞ্চল শুধু প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের আধার নয়, এটি দেশের অন্যতম প্রধান খাদ্যভাণ্ডার। এখানকার কৃষকরা প্রতিকূল প্রকৃতির সঙ্গে লড়াই করে যে ফসল উৎপাদন করেন, তা জাতীয় খাদ্য নিরাপত্তার গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি। কিন্তু সাম্প্রতিক হাওর বিপর্যয় স্পষ্ট করে দিয়েছে—এই অঞ্চলের মানুষ কেবল প্রকৃতির সঙ্গে নয়, মানুষের তৈরি এক গভীর সংকটের সঙ্গেও লড়াই করছে।

এবারের অকাল বন্যা কোনো একক প্রাকৃতিক দুর্যোগ নয়; এটি বহু বছরের অব্যবস্থাপনা, দুর্নীতি ও নীতিগত ব্যর্থতার ফল। ফসল রক্ষা বাঁধ নির্মাণে অনিয়ম, বরাদ্দের অর্থ আত্মসাৎ এবং দায়িত্বপ্রাপ্ত সংস্থাগুলোর জবাবদিহিতার অভাব পরিস্থিতিকে ভয়াবহ করে তুলেছে। যখন কৃষক তার শেষ সম্বল দিয়ে ফসল বাঁচাতে লড়াই করছে, তখন দায়িত্বশীলদের একাংশ সেই ব্যবস্থাকেই ভেঙে দিয়েছে।

সরকারি উদাসীনতা এই সংকটকে আরও গভীর করেছে। এখনো হাওরকে পূর্ণাঙ্গ দুর্গত এলাকা ঘোষণা করা হয়নি, ত্রাণ কার্যক্রমও পর্যাপ্ত নয়। ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের জন্য ঋণ মওকুফ বা পুনর্বাসনের কার্যকর উদ্যোগের অভাব তাদের অনিশ্চয়তার দিকে ঠেলে দিচ্ছে।

অন্যদিকে, জলমহাল ইজারা প্রথা হাওরবাসীর জীবনে এক নির্মম বাস্তবতা হয়ে দাঁড়িয়েছে। ফসলহারা মানুষের জন্য মাছ ধরা যখন বেঁচে থাকার শেষ অবলম্বন, তখন সেই পথও বন্ধ করে দেওয়া হচ্ছে। প্রভাবশালী ইজারাদারদের নিয়ন্ত্রণে সাধারণ মানুষ নিজেদের জমিতেও মাছ ধরার অধিকার হারিয়েছে—যা কেবল অন্যায় নয়, মানবিকভাবেও অগ্রহণযোগ্য।

এই পরিস্থিতি কেবল অর্থনৈতিক সংকট নয়; এটি সামাজিক অস্থিরতা ও দীর্ঘমেয়াদি খাদ্য ঝুঁকির ইঙ্গিত বহন করছে। শিক্ষার্থীদের ঝরে পড়া, জীবিকা হারানো, পরিবেশের ক্ষয়—সব মিলিয়ে হাওর আজ এক বহুমাত্রিক সংকটের মুখে।

এখন প্রয়োজন তাৎক্ষণিক ও দীর্ঘমেয়াদি উভয় ধরনের পদক্ষেপ। প্রথমত, ফসল রক্ষা বাঁধে দুর্নীতির সঙ্গে জড়িতদের দ্রুত বিচারের আওতায় আনতে হবে। দ্বিতীয়ত, ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের ঋণ মওকুফ ও পর্যাপ্ত ক্ষতিপূরণ নিশ্চিত করতে হবে। তৃতীয়ত, জলমহাল ইজারা প্রথা পুনর্বিবেচনা করে স্থানীয় মানুষের জন্য উন্মুক্ত করার উদ্যোগ নিতে হবে। পাশাপাশি নদীর নাব্যতা রক্ষা, পরিবেশ সংরক্ষণ এবং টেকসই কৃষিনীতি প্রণয়ন জরুরি।

হাওরের মানুষ বারবার প্রমাণ করেছে—তারা লড়াই করতে জানে। কিন্তু রাষ্ট্র যদি তাদের পাশে না দাঁড়ায়, তাহলে এই লড়াই একসময় আর টিকবে না। নীরব দুর্ভিক্ষের দিকে এগিয়ে যাওয়া একটি অঞ্চলের আর্তনাদ উপেক্ষা করা মানে ভবিষ্যতের বৃহত্তর বিপর্যয়কে আমন্ত্রণ জানানো।

এখনই সময়—দায় স্বীকার, জবাবদিহিতা নিশ্চিত এবং কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণের। হাওরকে বাঁচানো মানে দেশের খাদ্য নিরাপত্তা ও মানবিক মর্যাদাকে রক্ষা করা।

এবার তাদের সামনে প্রশ্ন—বাঁচা না মরার।

প্রধান দাবিসমূহ:

১. বিএডিসির বীজ সংক্রান্ত অভিযোগের বিচার বিভাগীয় তদন্ত
২. কৃষকের সকল প্রকার ঋণ মওকুফ ও অন্তত দুই মাস কিস্তি স্থগিত
৩. জলমহাল ইজারা বাতিল করে উন্মুক্ত জলাশয়ে মাছ ধরার অধিকার নিশ্চিত
৪. ফসল রক্ষা বাঁধে দুর্নীতির সাথে জড়িতদের বিচার
৫. ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকের ক্ষতিপূরণ ও পশুখাদ্য নিশ্চিতকরণ

হাওরের মানুষ আজ নতুন করে তাদের অধিকার আদায়ে প্রস্তুত। এই মানবসৃষ্ট বিপর্যয়ে নিঃস্ব হয়ে যাওয়া মানুষের পাশে দাঁড়ানো এখন সময়ের দাবি।

ওমর ফারুক




মন্তব্য করুন

আপনার ইমেইল প্রকাশ করা হবে না। * চিহ্নিত ঘরগুলো আবশ্যক।

শেয়ার করুন