বুধবার, দুপুর ১২:২৫, ৬ই জ্যৈষ্ঠ, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

বুধবার, দুপুর ১২:২৫, ৬ই জ্যৈষ্ঠ, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

হোম মতামত

বাংলা নিয়ে প্যান্ডোরার বাক্স এবং নয়া বাংলাবাজগণ

শেয়ার: https://www.timebulletin24.com/news/x6jhy3

কাকন রেজা :

ভাষা নিয়ে প্যান্ডোরার বাক্স খুলে দেয়ার কাজটার কৃতিত্ব মূলত বাংলাদেশের ‘প্রথম আলো’ নামক মাধ্যমটির। কিন্তু সময় যখন খারাপ থাকে তখন সবকিছুই ব্যাকফায়ার করে। বৃটিশ বিরোধী আন্দোলন থেকে শুরু করে জুলাই রেভ্যুলেশন পর্যন্ত সকল বিপ্লব ও আন্দোলনে ব্যবহৃত শব্দগুলিকে নিয়ে প্রশ্ন তোলায় সুবিধা হয়েছে অনেক। এতে বাংলা ভাষার শব্দভাণ্ডার বিষয়ে মানুষ সম্যক জানতে পারছে, তেমনি অনেকের চরিত্রও উন্মোচিত হচ্ছে।

পিআইবি’র ডিজি ফারুক ওয়াসিফ, প্রথম আলো যার প্রাক্তন, তিনি চমৎকার একটি লেখা শেয়ার করেছেন বাংলা শব্দের উৎপত্তি নিয়ে। যদিও লেখাটি তার নয়, কিন্তু প্রয়োজনীয়। এ সময়ে যারা বাংলাবাজি’র বাকোয়াজ করছেন তাদের জন্য উপযুক্ত। কথোপকথনের ভঙ্গিতে সেই লেখার সামান্য অংশ তুলে দিই। আশা করি তাতেই নব্য বাংলাবাজ’দের ধুতি খুলে যাবে।

“’রাস্তা’য় ‘ফির’তে গেলেও আরবি-ফারসি !

–  এখন তো দেখছি, আরবি-ফারসি ছাড়া কদম ফেলাই যাবে না !

–  কী করে যাবে ! ‘কদম’ শব্দটাও তো আরবি। আরেকটা চমকপ্রদ তথ্য শুনুন, আমরা এই যে কথায় কথায় বাঙালি, বাংলা ইত্যাদি বলছি, এর ‘বাংলা’ শব্দটাই তো ফারসি !

–  সে কী !  জানতাম না তো !  বাংলা শব্দটাও ফারসি। কী আশ্চর্য !”

হ্যাঁ, এই নব্য বাংলাবাজ’দের পদে পদে আশ্চর্য হতে হবে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের যে বাংলার অধ্যাপককে প্রথম আলো সামনে এনেছে সেই বেচারার জন্য আমার দুঃখ হয়। বেচারা সম্ভবত ইচ্ছে করে বাংলা নেয়নি। বিষয় হিসেবে তার কপালে বাংলা জুটে গেছে। কপাল শব্দটাও বাংলা নয়, সংস্কৃত। ওই অধ্যাপক ভদ্রলোক বাংলা পড়াতে গিয়ে হয়তো ভুলেই গেছেন বাংলা ভাষার প্রায় সত্তর শতাংশ শব্দই অন্য ভাষা থেকে নেয়া।

সমরেশ মজুমদার এক সাক্ষাতকার পর্বে বাংলা ভাষায় বিদেশী শব্দ নিয়ে তার একটি স্মৃতিচারণ করেছিলেন। সেসময় তার সঙ্গে আমাদের অধ্যাপক আবদুল্লাহ আবু সায়ীদ ছিলেন। সমরেশ মজুমদারের ভাষ্য অনুযায়ী তাকে তার এক শিক্ষক বাংলা ভাষায় আত্মীকৃত বিদেশী শব্দ দিয়ে একটি সম্পূর্ণ বাক্য গঠনের জন্য বলেছিলেন। তিনি যে লাইনটা বলেছিলেন, সেটা হলো, ‘সরু নরম গরম কোমর পছন্দ’। নব্য বাংলাবাজ’রা কি বিশ্বাস করতে পারেন যে, ‘সরু, নরম, গরম, কোমর, পছন্দ’ সবগুলি শব্দই বিদেশী। কি বিশ্বাস হয়, রামঅজ’র পাল?

কলকাতাকে যারা বাংলা’র তীর্থ মানেন, তাদের বলি, বাংলায় যারা চলিতরীতিকে প্রতিষ্ঠিত করেছেন তাদের পথ প্রদর্শক প্রমথ চৌধুরী বলেছিলেন, ‘আরবি ফারসি বাদ দিলে বাংলা ভাষাই থাকে না’। তার আরেকটি অবিস্মরণীয় কথা রয়েছে, ‘সুশিক্ষিত লোকমাত্রই স্বশিক্ষিত’। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সেই অধ্যাপক সার্টিফিকেট অর্জন করেছেন ঠিকই কিন্তু সুশিক্ষিত হতে পারেননি। যেমন পারবেন না আমাদের নয়া বাংলাবাজ’রা।

ধুর বাদ দিই, কাদের নছিহত করি। আল্লাহ তো কিছু লোক সম্পর্কে বলেই দিয়েছেন, তাদের তিনি বধির ও অন্ধ করে দিয়েছেন। এদেরকে জ্ঞান দান করে নিজের শক্তি ক্ষয় মূলত ‘উলু বনে মুক্তো ছড়ানো’। কী মুশকিল এখানে উৎপত্তিগত ভাবে ‘উলু’ যা মূলত ধ্বনি, হিন্দু সম্প্রদায় পূজোর সময় দেয়, তাও বাংলা নয়, সংস্কৃত। ‘বন’ শব্দটাও বাংলা নয়, ইন্দো-ইউরোপীয় ভাষা থেকে এসেছে। ‘মুক্তা’ শব্দটিও বাংলা নয়! কী জ্বালা বলেন তো দেখি।

নোট: রাজনীতিবিদদের বলি, ইনকিলাব, আজাদি, ইনসাফ এসব নিয়ে বাংলাবাজি করতে যাবেন না দয়া করে। আপনাদের ধুতিও কিন্তু খোলা শুরু হয়েছে। কোট, পাতলুন, লুঙ্গি বা ধুতি খোলার পর যা থাকে সেটাও কিন্তু বাংলা নয়। অতএব ধীরে ভাইলোক।

লেখক – কবি, কলামিস্ট, প্রাবন্ধিক

মন্তব্য করুন

আপনার ইমেইল প্রকাশ করা হবে না। * চিহ্নিত ঘরগুলো আবশ্যক।

শেয়ার করুন