বুধবার, দুপুর ১২:৩৩, ৬ই জ্যৈষ্ঠ, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

বুধবার, দুপুর ১২:৩৩, ৬ই জ্যৈষ্ঠ, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

হোম মতামত

পৃথিবীর দ্বান্দ্বিক রূপ এবং চরমপন্থার মনস্তাত্ত্বিক সীমাবদ্ধতা

শেয়ার: https://www.timebulletin24.com/news/ut0uy8

রিয়াজুল সবুজ

উগ্রবাদ বা চরমপন্থা যখনই কোনো আদর্শের সাথে যুক্ত হয়েছে, তখনই তা অন্য পক্ষের অস্তিত্বকে অস্বীকার করার চেষ্টা করেছে। তখন সেটি আর কেবল একটি ‘মতবাদ’ থাকে না, বরং একটি ‘অস্ত্র’ হয়ে দাঁড়ায়। উগ্রবাদীরা অন্য পক্ষকে আদর্শিকভাবে ‘শত্রু’ মনে করে এবং শত্রুকে ধ্বংস করাকে আদর্শিক দায়িত্ব হিসেবে মনে করে। সত্য’ কেবল একটিই এবং সেটি কেবল তাদের কাছেই আছে। এই ধারণা থেকেই তারা অন্যদের অস্তিত্বকে অর্থহীন বা ক্ষতিকর মনে করতে শুরু করে। অথচ পৃথিবীর ভারসাম্য বজায় রাখার জন্য বিপরীতমুখী শক্তির অবস্থান মেনে নেওয়াটা মানবিকতার একটা বড় পরিচয়। যারা কেবল নিজের মতকেই চূড়ান্ত সত্য বলে মনে করে, তারা প্রায়ই প্রতিটি ক্ষেত্রেই পৃথিবীর এই বিশালতা এবং বৈচিত্র্য বুঝতে ব্যর্থ হয়। ইতিহাস এবং সৃষ্টিতত্ত্ব পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, এখানে বিপরীতধর্মী শক্তির সহাবস্থান অনিবার্য। দিন থাকলে রাত থাকে, ঠিক তেমনি মঙ্গলের পাশাপাশি অমঙ্গলের অস্তিত্ব অনস্বীকার্য। দর্শনের ভাষায় একে ‘দ্বান্দ্বিকতা’ বলা হয়। ব্যবহারিক অর্থে, পৃথিবীটা যেমন সৃজনশীল বা ঐশ্বরিক শক্তির, ঠিক তেমনি ধ্বংসাত্মক বা নেতিবাচক শক্তিরও অবাধ বিচরণক্ষেত্র। দিনশেষে সহনশীলতা আর সবকিছুর অস্তিত্বকে স্বীকার করে নেওয়ার মধ্যেই সম্ভবত প্রকৃত শান্তি লুকিয়ে আছে। পৃথিবীর ভারসাম্য রক্ষার জন্য বৈপরীত্যের প্রয়োজন আছে। দুঃখ না থাকলে যেমন সুখের কোনো সংজ্ঞা থাকত না, তেমনি মন্দের অনুপস্থিতিতে ভালোর মাহাত্ম্য বোঝা অসম্ভব হতো। দার্শনিক ও মরমী সাধকদের মতে, এই মহাবিশ্ব মূলত আলো এবং ছায়ার এক সম্মিলিত ক্যানভাস। কোনো একটি পক্ষকে সম্পূর্ণ মুছে ফেলার দাবি করা মানে প্রকৃতির স্বাভাবিক নিয়মকে স্বজ্ঞানে অস্বীকার করা। উগ্রবাদের মূল ভিত্তি হলো নিজেকেই একমাত্র সত্য বলে মানা। এই মনস্তত্ত্বের কিছু বৈশিষ্ট্যও লক্ষ্য করা যায়। উগ্রপন্থীরা বিশ্বাস করে যে পৃথিবীতে কেবল পরম সুন্দরের বা ঈশ্বরের আধিপত্য থাকবে, আর যা কিছু তাদের সংজ্ঞার বাইরে তা বর্জনীয় এবং তার ধ্বংস নিশ্চিত করতে হবে। তারা জগতের অন্ধকার দিক বা বিপরীত শক্তিকে শয়তানি শক্তি বলে বাস্তব হিসেবে মেনে নিতে পারে না। এই অস্বীকারের ফলেই জন্ম নেয় ঘৃণা এবং অসহনশীলতা। ইতিহাস বলে, যারা বিপরীত মত বা শক্তিকে স্বীকার করেনি, তারা পৃথিবীর বৈচিত্র্য নষ্ট করে রক্তক্ষয়ী সংঘাতের জন্ম দিয়েছে। সমাজের একটি অংশ যখন কেবল নিজেদের আদর্শকে একমাত্র ধ্রুব সত্য মনে করে এবং অন্যের অস্তিত্বের গুরুত্ব অস্বীকার করে, তখন পৃথিবী তার ভারসাম্য হারায়। যেখানে মানুষ বাস্তবতাকে আংশিকভাবে গ্রহণ করে এবং পূর্ণতাকে উপেক্ষা করে। উগ্রবাদী দৃষ্টিভঙ্গি মানুষকে মানবিক হওয়ার চেয়ে বিচারক হতে বেশি প্রলুব্ধ করে। বিচারক হওয়ার এই প্রবণতা থেকে এক ধরণের অহংকার জন্ম নেয়। সে তখন অন্যের ভুল ধরা বা অন্যদের ওপর নিজের মতামত চাপিয়ে দেওয়াকেই জীবনের প্রধান উদ্দেশ্য ও লক্ষ্য বানিয়ে ফেলে।

মৃত্যু আছে বলেই জীবন এত মূল্যবান। দিন ও রাতের চক্র যেমন অবিচ্ছেদ্য, তেমনি জগতের ভালো-মন্দ, সৃষ্টি-ধ্বংস বা জয়-পরাজয় সবই একে অপরের পরিপূরক। একটিকে বাদ দিয়ে অন্যটির অস্তিত্ব কল্পনা করা অসম্ভব। পদার্থবিজ্ঞান থেকে জীববিজ্ঞান সবখানেই বিপরীত শক্তির ভারসাম্যই স্থিতিশীলতা বজায় রাখে। বিপরীত মেরু বা শক্তির আকর্ষণ ও বিকর্ষণই জগতকে সচল রাখে। যারা কেবল নিজের পক্ষকে সত্য মনে করে অন্যকে মুছে দিতে চায়, তারা আসলে সেই মহাজাগতিক ভারসাম্যকেই নষ্ট করার অপচেষ্টায় লিপ্ত। পরিশেষে বলা যায়, পৃথিবী কোনো একপাক্ষিক মঞ্চ নয়। এখানে অন্ধকারও আলোর মতোই একটি ধ্রুব সত্য। যারা এই বৈচিত্র্য এবং বিপরীত শক্তির সহাবস্থান স্বীকার করে না, তারা আসলে জগতের সামগ্রিক রূপটি দেখতে ব্যর্থ হয়। প্রকৃত প্রজ্ঞা নিহিত আছে সবকিছুর অস্তিত্ব মেনে নিয়ে সহনশীলতার মাধ্যমে পৃথিবীর এই জটিল রূপকে বোঝার মধ্যে। ‘সহনশীলতা’ কেবল একটি নৈতিক গুণ নয়, এটি একটি উচ্চতর প্রজ্ঞা। যারা বিপরীত শক্তির অস্তিত্ব মেনে নিতে পারে, তারাই জীবনের বিশালতা এবং বৈচিত্র্যকে পূর্ণাঙ্গভাবে উপলব্ধি করতে পারে।

রিয়াজুল সবুজ

সম্পাদক ও প্রকাশক

সাঃ জনতার সংগ্রাম উল্লাপাড়া, সিরাজগঞ্জ।

মন্তব্য করুন

আপনার ইমেইল প্রকাশ করা হবে না। * চিহ্নিত ঘরগুলো আবশ্যক।

শেয়ার করুন