সদর উদ্দিন আহ্মদ চিশতী

সম্যক গুরুর আশ্রয়ে থাকাই জান্নাত। ভোগের চাহিদা দেহের আদ্য চাহিদা এবং ইহাই আমাদের লজ্জার আদি উৎস। গুরুর দেওয়া সালাত ত্যাগ করিয়া যখন আদম_ও_তাহার_স্ত্রী প্রত্যক্ষভাবে বুঝিতে পারিলেন যে, দেহের আদ্য চাহিদাই তাহাদের সকল লজ্জা ও দুঃখের কারণ হইয়াছে তখন তাহারা তাহাদের ভুলের জন্য অনুতপ্ত হইলেন। আপাত সুখের নেশায় দেহের রসে মজিয়া থাকিলে চলিবে না। দেহের স্বাদ অর্থাৎ ইন্দ্রিয়সমূহের রসাস্বাদন ইন্দ্রিয়সমূহের সঙ্গেই জড়িত থাকা উচিত; মানবসত্তা উহা হইতে শুদ্ধ ও নিরপেক্ষ থাকা উচিত। দেহের ভোগ যে লজ্জাজনক ইহা যখন স্পষ্ট হইয়া উঠিল তখন তাহারা মুক্তির পরিবর্তে জান্নাতের পাতার আশ্রয়ে দেহের লজ্জাকে আচ্ছাদিত করিবার চেষ্টা করিলেন। অর্থাৎ মুক্তির পরিবর্তে অন্ততপক্ষে জান্নাতকে আশ্রয়রূপে গ্রহণের চেষ্টা করিলেন। কিন্তু ইহাতে লজ্জার পরিপূর্ণ অবসান হইতে পারে না । গুরুর প্রতি তাকওয়া এবং সালাতই দেহের সকল লজ্জা নিবারণের সঠিক পথ। এবং ইহাই মুক্তির পথ । (৭ঃ- ২২)।
শয়তানের প্ররোচনায় মুক্তির পথ ত্যাগ করিবার অপরাধে রব বলিলেন, “তোমরা অধঃপতনে নামিয়া যাও, সেখানে তোমাদের কতক অন্য কতকের শত্রু হইয়া থাক।” ইহা_অভিশাপ_নয়, বরং তাহাদের কর্মফলের কথাই ব্যক্ত করিয়াছেন। মুক্তির স্তর ব্যতীত নিম্নবর্তী সকল স্তরের জীবনেই কিছু লোক আছে যাহারা বস্তুস্বার্থের হানাহানি করিয়া একে অন্যের শত্রুতা করিয়া থাকে এবং মুক্তির পথ হইতে মানুষকে দূরে সরাইয়া রাখে। ইহার ফলে নিম্ন পর্যায়ভুক্ত লোকেরা অখণ্ড জীবন লাভের পরিবর্তে বারংবার জন্ম-মৃত্যুর চক্রে আবদ্ধ হইয়াই থাকে। তাহারা প্রতিবার সাময়িক জীবনে আশ্রয় গ্রহণ করিয়া জীবনের সাময়িক সুযোগ ভোগ করিয়াই চলে কিন্তু মুক্তির আস্বাদন এবং উহার কোন সন্ধান পায় না।
গুরুর আশ্রিত ‘সালাতী দল’ ব্যতীত অর্থাৎ মুক্তিকামী সাধক দল ব্যতীত নিম্নবর্তী সকল দলের মধ্যেই অল্প হইলেও কিছু না কিছু হিংসা-বিদ্বেষ এবং হানাহানি রহিয়াছে। জন্ম-মৃত্যুর চক্র হইতে মুক্ত না হইতে পারিলে স্থুল দেহের বন্দিশালায় আবদ্ধ থাকিয়া এই সকল আবিলতার মধ্যে দেহ হইতে দেহান্তরে আবর্তিত হইতে হয়। তদনুসারে আদম অধঃপতিত হইলেন এবং দেহের বন্ধন হইতে মুক্তি অর্জনের জন্য তাহাকে আর একটি সুযোগ দেওয়া হইল। (৭ঃ ২৩-২৫)।
আদম_সন্তান’ অর্থ আদমের আদর্শ অনুসারী সন্তান। এখানে সম্যক গুরুর প্রতীকরূপে আদমকে উল্লেখ করিয়া তাঁহার সাধক শিষ্যবর্গকে ‘আদম সন্তান’ বলিয়া সম্বোধন করা হইয়াছে। এই সম্বোধন দ্বারা সর্বকালীন মুক্তিকামী শিষ্যগণকে সাবধান করা হইতেছে যেন তাহারা এইরূপ ভুলের বশবর্তী না হয়।
বাক্য দুইটি জাহের ও বাতেনের সমন্বয়ে প্রকাশিত। পোশাক দুই প্রকার দেহের পোশাক ও মনের পোশাক। মনের পোশাক হইল তাকওয়া। ইহাই উত্তম পোশাক। দৈহিক পোশাক দেহের লজ্জা আচ্ছাদন করে আর তাকওয়ার পোশাক মনের লজ্জা আচ্ছাদন করে; মনকে গুরু-ভাব দ্বারা গুরুগুণে সুশোভিত করে। তাকওয়ার পোশাক আল্লাহর পরিচয় বহন করে। ইহা দ্বারা আচ্ছাদিত হইলে আল্লাহর সংযোগ পাওয়া যায়। গুরুর প্রতি কর্তব্যপরায়ণ হইয়া গুরুর করণ করিলেই তাকওয়া করা হয়। তাকওয়ায় থাকিলে দুনিয়ার সকল ফেতনা অর্থাৎ অবাঞ্ছিত আপদ-বালাই হইতে রক্ষা পাওয়া যায়। শয়তান সালাত বিরোধী কুমন্ত্রণা দিয়া আদম ও তাঁহার স্ত্রীর তাকওয়ার লেবাস ছিনাইয়া নিয়া তাঁহাদের মনের লজ্জা অর্থাৎ কুভাব উন্মুক্ত করিয়া তাহাদিগকে অপদস্থ করিয়াছিল। সেই দৃষ্টান্ত হইতে আমাদিগকে সাবধান হইতে হইবে। সালাত বিরোধী বস্তুবাদী ধার্মিক লোকদের সালাত বিরোধী যুক্তি এত সূক্ষ্ম ও চক্রান্তমূলক যে, সাধারণ মানুষ তাহা বুঝিতেই পারে না। কোন্ দিক হইতে কেমন করিয়া যে মানুষকে বস্তুমোহে ভুলাইয়া ফেলে তাহা তাহারা মানুষ অনুধাবন করিতে পারে না।।
আদম সন্তানদের উপর একটি পোশাক নাজেল করা হইয়াছে।” এই কথা দ্বারা খাস করিয়া তাকওয়ার পোশাককেই বুঝায়। দৈহিক পোশাকের সঙ্গে ‘নাজেল’ কথাটি উপযুক্ত বা যুক্তিযুক্ত হয় না।(৭ঃ ২৬+২৭।)
প্রত্যেক কাজের উপর সালাত প্রয়োগ করিলে উহা ফাহেসামুক্ত হইয়া যায়। ফাহেসা মিশাইয়া কাজ করিবার আদেশ আল্লাহ দেন না। যৌন অশ্লীলতা হোক অথবা বস্তুমোহ মনে ধরিয়া রাখিবার অশ্লীলতা হোক সকলই ফাহেসা। আপাতদৃষ্টিতে দেখা যায় ফাহেসার কারণেই মানুষের সকল সৃজনীকর্ম গতিশীল হইয়া আছে। এমনকি আমাদের জন্মও পিতামাতার ফাহেসা হইতে হইয়াছে বলিয়াই আমরা মনে করিয়া থাকি। অতএব স্থূলদৃষ্টিতে দেখা যাইতেছে,বিশ্বসৃষ্টির মূল উৎসই ফাহেসা এবং ফাহেসার উৎস শেরেক। সুতরাং মানুষ মনে করে পরোক্ষভাবে হইলেও আল্লাহই ফাহেসার নির্দেশ আমাদিগকে দিতেছেন।এইরূপ মনোভাবের প্রতিউত্তরে কোরান বলিতেছেন, “আল্লাহ কখনও ফাহেসার আদেশ দেন না,” দিতে পারেন না। ইহার কারণ, ইহা দ্বারা মানুষ মুক্ত হইতে পারে না, সৃষ্টিতে আবদ্ধ হইয়া থাকে। (৭ঃ ২৮)।
সেজদার স্থান বা বস্তুকে মসজিদ বলে। যাহার উপরে সমর্পণ হওয়া যায় উহাই মসজিদ। ইন্দিয়পথে আগমনকারী বিষয়সমূহের মধ্যে যেগুলির প্রতি মানুষ সমর্পিত হয় সেইগুলি তাহার এক একটি মসজিদ। চেহারা অর্থ ইন্দ্রিয়গুলির অভিব্যক্তিসমূহের প্রকাশকেন্দ্র । প্রতিটি মসজিদের নিকটে চেহারাকে দাঁড় কর অর্থ আগমনকারী ধর্মরাশির উপর প্রতিটি বিষয়ের নিকটে চেহারাকে অর্থাৎ উহার জন্য যে ইন্দ্রিয় কার্যকরী সেই ইন্দ্রিয়কে দাঁড় কর এবং সরলভাবে আল্লাহকে ডাক যেন সেই বিষয়টি শেরেক বা মোহ উৎপন্ন করিতে না পারে। আল্লাহ ফাহেসার আদেশ দেন না কিন্তু সকল কর্ম সুবিচারের সহিত করিতে আদেশ দেন।
অর্থাৎ সালাতের সাহায্যে ফাহেসা বর্জন করিয়া সকল ধর্ম-কর্ম সম্পাদনের আদেশ দেন। মাতৃগর্ভ হইতে বাহির হইয়া আসিবার পর প্রাথমিক অবস্থায় মস্তিষ্ক ছিল একেবারেই শেরেকশূন্য । মস্তিষ্কে সঞ্চিত মোহ উচ্ছেদ করিয়া সালাতের সাহায্যে পুনরায় সেই অবস্থায় ফিরিয়া যাইবার নির্দেশ দিতেছেন। এই সালাতের মূল স্বরূপ নিম্নরূপঃ জন্মলাভের সঙ্গে সঙ্গে মানুষের ইন্দ্রিয়পথে ধর্মরাশি অবিরত আসিতে থাকে।এইগুলির মোহ হইতে অর্থাৎ শেরেক হইতে মুক্তির জন্য আল্লাহকে ডাকিতে হইবে। আমাদের মনের মাঝে যাহা কিছু চিন্তা ঘটিয়া থাকে তাহা মোহগ্রস্ততার উন্মাদনার সাথেই ঘটিয়া থাকে।মনের ধারাকে এই মোহ হইতে মুক্ত করিবার জন্য প্রতিটি ইন্দ্রিয়ের মাধ্যমে যাহা কিছু আমাদের মনে প্রবেশ করে তাহার উপরে সজাগ দৃষ্টি রাখা প্রয়োজন। এই দৃষ্টি রাখিবার পদ্ধতি হিসাবে নিজ দেহ-মনের প্রতিটি কর্মকাণ্ডকে আমিত্ব বর্জিত অবস্থায় চালনা করিতে হইবে। দেহের প্রতিটি অঙ্গভঙ্গি ‘আমা দ্বারা নয়’ বরং বিশ্ববিধানের নিয়মের দ্বারাই সংঘটিত হইতেছে, আমি শুধু নিমিত্ত মাত্র । এইরূপ নিরপেক্ষভাব অর্জনের চেষ্টা করিতে হইবে। তবেই নিজ দেহ-মন হইতে ‘আমি ভাব’ বর্জিত হইয়া দেহ-মনের সকল কর্মকাণ্ড ক্রমশ মোহমুক্ত হইয়া যাইবে।(৭ঃ ২৯)।
যাহারা সম্যক গুরুর নিকট আত্মসমর্পণ করে না এবং সেরাতুম মোস্তাকীমের জন্য সালাত করে না তাহারা যত ধর্মীয় অনুষ্ঠানই পালন করুক না কেন কোরান অনুযায়ী তাহারা বিভ্রান্ত, যদিও তাহারা নিজদিগকে হেদায়েতপ্রাপ্ত বলিয়াই মনে করে।(৭ঃ ৩০)।