বুধবার, সকাল ১১:৩১, ৬ই জ্যৈষ্ঠ, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

বুধবার, সকাল ১১:৩১, ৬ই জ্যৈষ্ঠ, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

হোম সাহিত্য

শান্তির টুকরোগুলো

শেয়ার: https://www.timebulletin24.com/news/lllu0n

কেকা অধিকারী

আচ্ছা, কিনৎসুগি কী জানেন?

এটা হলো একটা শিল্প। বিশেষ জাপানি শিল্প।

জাপানে সিরামিকের তৈজসপত্র ভেঙে গেলে ফেলে না দিয়ে, ভাঙা টুকরোগুলি উরুশি নামের আঠার সাথে সোনা, রূপা বা প্লাটিনাম দিয়ে জোড়া দেয়া হয়। এ ভাবে যে কেবল ভাঙা জিনিসটিকে জোড়া লাগানো হল তা নয়, বরং এর মাধ্যমে জীবনের একটি দর্শন প্রচার করা হলো – জীবন সব সময় আস্ত থাকে না। নানান বিপর্যয়ে তা চিনামাটির পাত্রের মতো ভেঙে খান খান হয়ে যেতে পারে। তারপরও মানুষের উচিত জীবনের ভাঙা অংশগুলোকে সানন্দে গ্রহণ করা এবং তাকে ফেলে না দিয়ে যত্নে জোড়া দিয়ে সুন্দর করে উপস্থাপন করা। জাপানি কিনৎসুগি জীবনের একটি গভীর দর্শনই বটে।

এ তো গেল জাপানি কিনৎসুগির কথা । এবার আমার কিনৎসুগির গল্প শোনেন।

অফিসের প্রোগ্রামে অংশ নিতে থাইল্যান্ডের চিয়াং মাই গিয়েছি। ওখানে একটা দ্বীপ আছে যেখানে বহুবছর আগে কুষ্ঠরোগীদের নির্বাসন দেওয়া হতো। কুষ্ঠ রোগে আক্রান্ত হলে সঠিক চিকিৎসার অভাবে একে একে হাত, পা থেকে আঙুলগুলো খসে পড়তে থাকে। নাকের মাথা, কানের লতিও পচে পড়ে যায়। হাত ও পায়ের হাড়ে গ্র্যাংরিনও হয় কখনও কখনও। তখন সার্জারি করে শরীর থেকে হাত-পা কেটে ফেলা হয়। তো সে দ্বীপে কুষ্ঠ রোগীদের জন্য একটা চিকিৎসা ও পূনর্বাসন কেন্দ্র স্থাপন করা হয়েছিল। আমরা গিয়েছিলাম কীভাবে সেই হাত,পা, নাক, কান না থাকা মানুষগুলি জীবন যাপন করছে, আয় রোজগারের কাজ করে জীবন ধারণ করছে তা দেখতে।

সব দেখা শেষে আমরা গিয়েছিলাম প্রতিবন্ধী মানুষগুলোর হাতে তৈরি জিনিসের বিক্রয়কেন্দ্রে। বিদেশে গেলে আমার যা হয় তা হচ্ছে পকেটে থাকে বড়জোর ২/৩ শ ডলার আর চোখের সামনে ভাসতে থাকে গোটা পঞ্চাশেক মানুষের মুখ – আহা এর জন্য একটা কিছু তো নিতেই হয়। ওর জন্য কিছু না নিলে চলে কী করে? তার জন্য কিছু একটা নিব না সে তো অসম্ভব। এ সব ভেবে সেই হ্যান্ডিক্রাফটসের দোকান থেকে বেশ কিছু জিনিস কিনে নিলাম। কাঠের, মোমের ও মেটালের। নিজের ঘরের জন্য সেল থেকে একটা গজদাঁত না থাকা কাঠের বিশাল হাতি ও একটা ফুলদানি অর্ধেকেরও কম দামে কিনে আনলাম।

এক দাদা-বৌদির কথা মনে করে একটা কাঠ কেটে তৈরি করা আকর্ষণীয় শব্দ কিনে এনেছিলাম। ইংরেজি পিস বা শান্তি শব্দটিকে ভীষণ আর্টিস্টিক ভাবে উপস্থাপন করা, যেন শান্তির পায়রা উড়ে যাচ্ছে। জিনিসটা ভীষণ সুন্দর ছিল যদিও যে কোন সময় ভেঙে যাওয়ার চান্স ছিল।

যাক্ বিদেশের প্রোগ্রাম শেষে দেশে ফিরলাম। কয়েকদিনের মধ্যে যার জন্য যা এনেছিলাম সেসব উপহার বিতরণ করলাম। কিন্তু শান্তির পায়রাটা ঘরেই রয়ে গেল। আমার ছোটলোক মনটা সেই পিস-টিকে হাতছাড়া করতে কিছুতেই সায় দিচ্ছিল না। আবার মনে হচ্ছিল, দাদা-বৌদির কথা মনে করে কিনলাম। তাদেরকে দিব না? অবশেষে ছোটলোক মন জয়যুক্ত হলো। জয় যুক্ত হলো। জয় যুক্ত হলো। দাদা বৌদিকে অন্য কিছু জিনিস উপহার দিলাম। তাদের তো আর বলিনি যে, একটা বিশেষ জিনিস আমি তাদের কথা ভেবে কিনেছিলাম। মনকে অপরাধবোধ থেকে বাঁচাতে বোঝালাম, দাদা-বৌদি তো দেশ বিদেশ কত জায়গায় কাজে ও বেড়াতে যান। কত কী নিয়ে আসেন নিজেদের জন্য। কত সুন্দর সুন্দর শো পিস দিয়ে তারা ঘর সাজিয়েছেন। তার উপর আবার তারা আদিবাসী মানুষ, এমন কত সুন্দর জিনিসপত্র তাদের আছে।

মনকে এসব বলে জিনিসটা আমি আমার জিনিসপত্রের স্টকের মধ্যে রেখে দিলাম – যখন নিজের ফ্ল্যাটে উঠব তখন ওটা টানাব। একদিন আমরা নিজেদের ফ্ল্যাটে উঠলাম এবং শো পিসটি ড্রইং ডাইনিং রুমের মাঝের কাঠের আর্কের উপর লাগালাম। কিন্তু ঘটনা হলো যতবার ওটার দিকে আমার চোখ যায় ততবার নিজের ছোটলোকির কথা মনে পড়ে।

একদিন আমাদের সাহায্যকারী বিউটি বেগম ঝাড়ু দিয়ে ঘরবাড়ি সব পরিষ্কার করতে গিয়ে এমন বারি দিল যে, ওটা পেরেকসহ ছিটকে মাটিতে পড়ে তিন টুকরা হয়ে গেল। আমার মনটা যে কী খারাপ হলো। টুকরাগুলো সুপার গ্লু দিয়ে অনেক কষ্টে জোড়া দিলাম। ভালো ভাবে জোড়া লেগেও গেল।

অনেক বছর পার হলো। শান্তি শান্ত রূপে দেয়ালে ঝুলে রইলো। এরই মধ্যে হোসনে আরা বিউটি বেগমের স্থলাভিষিক্ত হয়েছে। একদিন ঘর পরিষ্কার করতে গিয়ে সেও একই কান্ড করল। পিস এবার ভেঙে তিন টুকরা নয়, মোট চার টুকরা হলো। এবার আর সুপার গ্লু নয়, ন্যান্সির কাছ থেকে গ্লু গান নিয়ে এসে শান্তি জোড়া লাগালাম।

হোসনে আরার বদলে এখন আমাদেরকে সাহায্য করছে খোদেজা বেগম। সেদিন সেও আমার চোখের সামনে ঝাড়পোঁছ করতে গিয়ে পিসটা ফ্লোরে ফেলে দিল। এবারও সেটা চার টুকরা হয়ে ছড়িয়ে ছিটিয়ে পড়ল। খোদেজা নিজের বুদ্ধিতে চলে। ওর হাতের গতিবিধি পর্যবেক্ষণ করে আমি তড়িৎ গতিতে রি রি করে উঠলাম

– না, না, না, ফেলো না। সব টুকরাগুলো তুলে ঐ ফুলদানিটার মধ্যে রেখে দাও। আমি পরে জোড়া দিব।

– ওগুলার আর কী জোড়া দিবেন? সব তো গুড়া গুঁড়া হয়ে গেছে।

– গুঁড়া হলে হোক। তুমি তুলে ফুলদানিটার মধ্যে রেখে দাও।

ভাগ্যিস সামনে ছিলাম। তা না হলে আজ ও টুকরাগুলো সব ময়লার বালতিতে নিয়ে ফেলতো।

গতকাল রাতে আমি ফুলদানিটার মধ্যে থেকে শান্তির টুকরাগুলো সেন্টার টেবিলের উপর রাখলাম। কাঠ জোড়া দেয়ার আইকা দিয়ে অংশগুলো লাগালাম। প্রতিটি জোড়ার লাগানোর পরে দু-হাত দিয়ে শুকানো না পর্যন্ত ধরে রাখছিলাম। আবার যদি খুলে যায়! এভাবে মোটামুটি জোড়া লাগিয়ে পুরোপুরি শুকানোর জন্য আমি ওটা টেবিলের উপর রেখে ঘুমাতে গেলাম।।

পিস দ্বিতীয় বার ভাঙার সময় আমি কিনৎসুগি সম্পর্কে কিছু জানতাম না। কিন্তু খোদেজা ওটা ভাঙার আগেই কিনৎসুগি কী তা জেনেছি। তাই যখনই ওটা ভাঙলো আমি পিসকে জাপানি কনসেপ্টে জোড়া লাগাব বলে ঠিক করলাম। কিন্তু আমি গরীব মানুষ। সোনা, রুপা, ইউরেনিয়াম পাব কোথায়? বিকল্প নিয়ে ভাবতে গিয়ে প্রথমে ভেবেছিলাম পাউরুটির প্যাকেট যে সোনালি তার দিয়ে প্যাঁচানো থাকে তার কথা। কিন্তু ঐ সোনালি কাগজ মোড়া তার বেশিদিন সোনালি থাকবে না বুঝে ভাবলাম তামার তার দিয়ে জোড়ার অংশগুলো আমি প্যাঁচিয়ে দিব। কিন্তু গোল বাঁধল আশেপাশের কোন হার্ডওয়্যারের দোকানে তামার তার পাওয়া গেল না। এক দোকানদার জানালো তাদের তামার তার আছে। আমি তাকে দেখাতে বললে সে উল্টো জিজ্ঞেস করল, ঐ তার দিয়ে আপনি কী করবেন? মনে মনে বিরক্ত হলেও বর্ণনা করলাম। যথারীতি সে বুঝল না। আমি বোঝাতে না পেরে বললাম, “শিল্প-সংস্কৃতির কাজ করব। এবার মনে হয় সে বুঝল। কিশোর কর্মীকে আদেশ দিল আমাকে তার দেখাতে। দেখলাম ছেলেটি মেঝে থেকে নিচু হয়ে অনেক কষ্টে ভারী কিছু টেনে তুলল। আমার চোখে জিনিসটা পড়তেই, ” না, না, না। আমার এমন মোটা রডের মতো তার লাগবে না। আমি গুনা তার খুঁজছি। “

মনটা খারাপ হলো। আমার বুঝি আর কিনৎসুগি করা হলো না। সেদিন পাড়ার দোকানে ডালপুরি কিনতে গেছি। দেখি পাশের ইলেকট্রনিক্স সারাইয়ের দোকানে তামার তারের মতো কিছু চিকচিক করছে। কাছে গিয়ে দেখলাম তারটা খুব চিকন। রীল সুতার মতো। কী আর করা এটা দিয়েই না হয় চেষ্টা করব। কিন্তু ওরা অল্প একটু তার বিক্রি করবে কি না জিজ্ঞেস করতেই কাজে মনোযোগী দোকানদারটি আমার দিকে না তাকিয়েই এক বাক্যে না করে দিল। আমাকে তবুও দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে অপর দোকানীর বোধ হয় মায়া হলো। একটু তার দিতে রাজী হলো সে। আমি বিশ টাকা দিয়ে কেনা তারটুকু ব্যাগে পুরে রেখে দিলাম।

আজ সকালে পিসের ভাঙা জোড়াগুলো তামার তারে প্যাঁচিয়ে দিলাম। তারের পরিমান কম ছিল। তাই ঠিকমতো প্যাঁচানো গেল না। তবুও আমি খুশি। চীনামাটির না হোক ভাঙা কাঠের টুকরা জোড়া লাগিয়ে তো আমি কিনৎসুগি করতে পারলাম। হ্যান্ড স্যানিটাইজার বার্নিশের কাজ করল। পিস এখন চকচক করছে। আমার পিস পুনঃস্থাপিত হলো।

আমি একটু পিছনে সরে গিয়ে নিজের তৈরি কিনৎসুগির সৌন্দর্য দেখছি আর ভাবছি – থাক্ এটা আমার সামনে। যখনই চোখ পড়বে আমি স্মরণ করব আমার ছোটলোকি স্বভাবকে, আমার জীবনের শান্তি ভেঙে খানখান হওয়া সময়কে। উপলব্ধি করব আমি কখনোই পারফেক্ট নই, ছিলামও না, বরং একজন সীমাবদ্ধতা অতিক্রম করতে না পারা মানুষ আমি, জীবনে সব সময় শান্তি অক্ষুণ্ণ রাখতে ব্যর্থ এক মানুষ -তবুও যে ভালো-মন্দ মিশিয়ে জীবনটাকে প্রতি মুহূর্তে একটু বেশি সুন্দর করতে চেয়েছে।

মন্তব্য করুন

আপনার ইমেইল প্রকাশ করা হবে না। * চিহ্নিত ঘরগুলো আবশ্যক।

শেয়ার করুন