রবিবার, রাত ১:৩২, ১০ই জ্যৈষ্ঠ, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

রবিবার, রাত ১:৩২, ১০ই জ্যৈষ্ঠ, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

হোম সাহিত্য

কোরবানির

শেয়ার: https://www.timebulletin24.com/news/fr5khq

গল্প-১

হারুন রশিদ

তোমেজ পরামানিক করোনাকালে অনেক কায়ক্লেশে তার সাদা গরুটাকে বড়ো করছে। গরুটা সে কোরবানির হাটে বিক্রি করবে। সিরাজগঞ্জ টাউনের চান্দালির মোড়ে গরুর হাটে কয়দিন পরে সে গরুটাকে তুলবে। চর লুবানে আমান্দা ঘাষ। গরু ছাগল ভেড়া সেই ঘাষ খায়। কাওরারা শীতের শেষে যমুনার চরে শুয়োরের পাল চরাতে আসে। তারা ঘাষের মুলসুদ্ধ উপড়ে সাবাড় করে।

চর লুবানে তারা মাত্র তেইশঘর। মাছধরা, ধান, কাউন, বাদাম চাষ করে কায়ক্লেশে কোনরকমে সংসার চলে। প্রতি বরষায় যমুনার পানি বাড়লে তারা ওয়াপদার বাঁধের উপরে অস্থায়ী পলিথিনের তাবু গাড়ে। তবে এবার সর্বকালের রেকর্ড ছাড়ায়ে গেছে। এবার তারা বাধের ভিতর ইশকুল বাড়িতে আশ্রয় নিয়েছে। তাদের সাদা গরুটিও সাথে এনেছে। তোমেজ তার স্ত্রী রোমেছা ও ছোটমেয়ে রীনা। বড়োছেলে ও মেঝমেয়ে গাজীপুরে গার্মেন্টসে কামকাজ করে। বাবা, ছেলে-মেয়ে মিলে কয় বছরে কিছু টাকা তারা সঞ্চয় করেছিলো। ছেলেটি সৌদিতে যাবার তাল করে টাকাগুলি গচ্চা দিছে, আরো দেনাদায়িক হয়েছে। ম্যান পাওয়ারের চিটিং কোম্পানী মতিঝিল থেকে হাওয়া। কয়েকবার ঘুরে ঘুরে দেখা পাইনি। পরে শুনিছে তাগোর মেলা পাওয়ার। থানা কোর্টকাছারি সব তারগে কাছে মামুলি ব্যাপার। সবচেয়ে বড়মেয়ে আম্বিয়া। বেশ ডাঙ্গর । গায়ের রঙ একটু ময়লা আছাল। চরে ইশকুল নেই তাই পড়ালেখা করতে পারেনি। তবে আম্বিয়ার মা তাকে ছেপারা পড়িয়েছে। শীতের মৌসুমে যমুনার ওপার ভূয়াপুর থেকে এক হুজুর এসে ছেপারা কোরান পড়িয়ে, দোয়া কালাম তাবিজ বেঁচে নাও ভরে ধান নিয়ে যমুনা পাড়ি দিতো। রঙ ময়লা থাকায় কোন ডাঙর পোলা আম্বিয়ার সাথে ঘর বাধতে আসেনি। দুই একজন খাটাশ কিসিমের বেটা আসলেও তাদের আবার খাসলত খারাপ।

বিয়েতে নগদ টাকা দাবি করে। তখন নিজেরাই তারা খেতে পায়না তা আবার যৌতুক মারাবে কী দিয়ে। গত সনে বন্যার সময় আম্বিয়া পেটের জ্বালায় ঢাকা উত্তরায় এক বাসায় কাজ নেয়। বাড়ির কর্তা ছিলো আধবুড়ো এক ঝুনো সাংবাদিক। খুব মানি লোক। মন্ত্রী মিনিস্টারদের সাথে তেনার ওঠা বসা আছে। তিনি টেলিভিশনে নারী নির্যাতন ও গরীবদের নিয়ে টকশোতে দামি দামি কথা কন। বাসার মেমসাহেব ও উনার ছেলেমেয়েরা তা দেখে সোফা থেকে ফাল মেরে ওঠে। যেনো তারা চর রামদিয়ার এড়েগরুর লড়াই দেখতেছে। মেম সাহেবের কোমর টিপতে টিপতে আম্বিয়া সুশীল চাচাকে টিভিতে দেখে ভাবতো আহ তার বাজান যদি এইরকম মানিগুনি বেটা হইবার পারতো!

সেদিন ছিলো শুক্রবার। আল্লাহর দিন।মেমসাহেবের ইশকুল বন্দ। উনি মেয়েদের ইশকুলের টিচার। তাই মেমসাহেব উনার পোলামেয়ে নিয়া দেশের বাড়ি বেড়াতে যান। মানিগুনি চাচার অনেক কাম আছাল ঢাকা শহরে। এই ধরেন মানববন্ধন, মন্ত্রীদের হো ত্যাল মারা, ওসি সাহেবের জন্য বিদেশী বোতল যোগাড় করা, সেমিনার এই কিসিমের উন্নয়ন কাজকাম। সেদিন রাত্র দশটার পর মানিগুনি চাচা সাথে একজন পুলিশের ভুড়িওয়ালা ওসিকে নিয়ে বাসায় আসেন। তারপর তিনি আম্বিয়াকে সাজগোজ করতে কন। আম্বিয়া বলে চাচা সাজনের কাম কী? ওসি সাহেব তোর জন্য জামাই দ্যাখবে। সেদিন সারারাত ওসি সাহেব ও মানিগুনি চাচা আম্বিয়ার জামাই হয়ে গেলো। অনেক জবরদস্তি হাক্কামাকা চলে আম্বিয়ার উপর। আম্বিয়া জ্ঞান হারায়। শিলাজুত খেয়ে দানব দুটি ঘুমে পাটায় থাকে। সকালেও তারগো ঘুম ভাঙেনা। আম্বিয়া চেতন হইয়া আর খাড়াইতে পারেনা। অনেক কষ্টে হুট করে একখান শাড়ি ব্লাউজ পিন্দা সে বাসার বাইরে চলে আসে। আম্বিয়া চর লুবানে ফিইরা আসে। এই ঘটনা তার মাকে কয়। তার মা মুখ চাইপ্যা ধরে কয়, এই চরত কুনো পাখিকুলিও যেনো এইডা জানতে না পারে। খবরদার। রাতে তার মা তার তলপেটে ছ্যাঁক দেয় আর রসুন ছেঁচে তেলে গরম করে ভাত মেখে খাওয়ায়। সেদিন রাত্রে আম্বিয়ার মায় তারে জড়াইয়া ধরে অনেক কান্দন লয়। করোনা আহোনের কয়েকমাস আগে বগুড়ার দিক থেকে একলোক চর লুবানের দিক আসে। চর লুবান, গাজীর চর, চর সুলতানে সে ঘোরাফেরা করে। কীসব ইটিং পিটিং বিজনেসের কথা কয়। লোকে কিছু বোঝে আবার কিছু বোঝেনা। খুব দিলদরিয়া লোক। পোশাক বাহারে বেশ রইচ ভাব। চরের পোলাপানদের জন্য ফ্রি চকলেট চিপস খাওয়ায়। মাঝ বয়সি লোক। এই সু্যোগে যুবতি গরীব মেয়েদের সাথে ইটিশ পিটিশ কথা বলতে থাকে। মেয়েদের মায়েদের টাকাও ধার দেয়। আবার সে বয়াতি চমেৎকার। সারিগানেও সে বেশ একখান ভালো গাহেক। একদিন সকালে উঠে দেখা গেলো চর লুবান, চর সুলতানে কান্নার রোল। আম্বিয়া, বিউটি, নাদেরা, রুপবানসহ সাতজন যুবতী মেয়ে হাওয়া। বগুড়া থেকে আসা দিলদরিয়া লোকটার আর হদীস পাওয়া যায়না। চারিদিক অনেক তালাশ। কিন্ত আর তাদের খোজ মেলেনা। কত আয়নাদর্পণ, বাটিচালান, পীরফকির টাকা খেলো কিন্তু আম্বিয়ারা আর ফিরে এলোনা।

রাত্রে তোমেজ গরুটাকে একটু জাপনা আর ঘাষ খাওয়ায়। গরুটার শরীর টাইট রাখতে হবে। তা না হলে দামদর ভালো পাবেনা। একেতো করোনাকালে তার উপর বান। তাতীগেও বেসামাল অবস্থাক খাদ্যখাবার কিনবে না শাড়িকাপড় কিনবে। গরুর দাম বেশ পড়তির দিকে। গঞ্জের গরুর হাটে খরিদ্দার কম। সে বেন্নে সুয়ালে সিরাজগঞ্জ চান্দালির মোড়ের গরুর হাটে যাবে। তাই সে হাগামুতা সেরে কয়ডা পান্তা খায়। বউরে কয় কয়ডা টাকা আর ছাতা দিতে। তারপর তারা দুইজনে আসে গরুর কাছে। গরু নাই শুধু দড়ি আছে। ইশকুল বিল্ডিংয়ের পিছনে পলিথিনের ছাউনির নীচে আমগাছে বাধা ছিলো। চারটা গরু ছিলো চর লুবানের তিনজনের। সবাই কইতে লাগে। রাতে বাদলমুড়ি চুরেরা ট্রলারে করে গরুগুলান ওপার ভুয়াপুর লইয়া গেছে। একখান জোর চিক্কর দিয়া তোমেজ পরামানিক চিত হয়ে মাটিতে পড়ে যায়।

লেখক – অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক, কথা সাহিত্যিক, বীর মুক্তিযোদ্ধা

মন্তব্য করুন

আপনার ইমেইল প্রকাশ করা হবে না। * চিহ্নিত ঘরগুলো আবশ্যক।

শেয়ার করুন