
আইন ও বিধিমালা সংস্কারের শেষ পর্যায়ে ইসি, বাজেটে চাওয়া হয়েছে ২,৯০০ কোটি টাকা
স্টাফ রিপোর্টার
স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানের নির্বাচনের প্রস্তুতি চূড়ান্ত পর্যায়ে নিয়ে যাচ্ছে নির্বাচন কমিশন (ইসি)। নির্বাচন পরিচালনা, আচরণবিধি এবং সংশ্লিষ্ট আইন-বিধিমালার প্রয়োজনীয় সংস্কার শেষ করে আগামী আগস্টে নির্বাচনের তপশিল ঘোষণার পরিকল্পনা করেছে সাংবিধানিক এই প্রতিষ্ঠান। সেই অনুযায়ী সব প্রস্তুতি সম্পন্ন হলে অক্টোবরের শুরু থেকেই ধাপে ধাপে ভোটগ্রহণ কার্যক্রম শুরু হতে পারে। তবে ইউনিয়ন পরিষদ, উপজেলা পরিষদ, পৌরসভা, জেলা পরিষদ কিংবা সিটি করপোরেশন—কোন প্রতিষ্ঠানের নির্বাচন দিয়ে কার্যক্রম শুরু হবে, সে বিষয়ে এখনও চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হয়নি। নির্বাচন কমিশন বলছে, সরকারের সঙ্গে আলোচনা করেই এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।
নির্বাচন কমিশন সূত্রে জানা গেছে, স্থানীয় সরকার নির্বাচনসংক্রান্ত আইন ও বিধিমালার সংস্কার কার্যক্রম এখন শেষ পর্যায়ে রয়েছে। সম্প্রতি সংসদে অনুমোদিত সংশোধনীর ফলে স্থানীয় সরকার নির্বাচন আবারও নির্দলীয় কাঠামোয় পরিচালিত হওয়ার পথ তৈরি হয়েছে। এর ফলে নির্বাচন কমিশনের প্রতীক সংরক্ষণবিষয়ক আইনসহ বেশ কয়েকটি বিধান পুনর্গঠনের প্রয়োজন দেখা দিয়েছে। এ লক্ষ্যে সিটি করপোরেশন, পৌরসভা, ইউনিয়ন পরিষদ, উপজেলা পরিষদ এবং জেলা পরিষদের জন্য পৃথক আইন ও বিধিমালার খসড়া প্রস্তুত করা হচ্ছে। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বলছেন, গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশের (আরপিও) সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে এসব খসড়া তৈরি করা হয়েছে।
পরিকল্পনা অনুযায়ী চলতি জুন মাসের মধ্যেই সংশোধিত খসড়াগুলো নির্বাচন কমিশনের ওয়েবসাইটে প্রকাশ করা হবে। নাগরিক, নির্বাচন বিশেষজ্ঞ, রাজনৈতিক দল ও অন্যান্য অংশীজনের মতামত গ্রহণের জন্য ১৫ দিন সময় রাখা হবে। পরে কমিশনের অনুমোদন নিয়ে খসড়াগুলো আইন মন্ত্রণালয়ের ভেটিংয়ের জন্য পাঠানো হবে। সরকারের চূড়ান্ত অনুমোদন পাওয়া গেলে জুলাইয়ের মধ্যেই আইন ও বিধিমালার সংস্কার শেষ করার আশা করছে কমিশন। এরপর নির্বাচনী সামগ্রী সংগ্রহ, মজুদ এবং প্রশাসনিক প্রস্তুতি সম্পন্ন করে আগস্টে অন্তত একটি স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানের নির্বাচনের তপশিল ঘোষণা করা হতে পারে।
যদিও আগে রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে নির্বাচনকেন্দ্রিক সংলাপের চিন্তা ছিল, শেষ পর্যন্ত সে পথ থেকে সরে এসেছে নির্বাচন কমিশন। কমিশনের কর্মকর্তারা বলছেন, সময়ের সীমাবদ্ধতা এবং আইনি বাধ্যবাধকতা না থাকায় আনুষ্ঠানিক সংলাপ আয়োজন করা হচ্ছে না। তবে আইন ও বিধিমালার খসড়া জনসম্মুখে উন্মুক্ত করার মাধ্যমে অংশীজনদের মতামত গ্রহণের সুযোগ রাখা হবে।
বর্তমানে দেশের স্থানীয় সরকার ব্যবস্থার বিপুলসংখ্যক পদ নির্বাচন উপযোগী অবস্থায় রয়েছে। নির্বাচন কমিশনের হিসাব অনুযায়ী, ৪ হাজার ৫৮১টি ইউনিয়ন পরিষদ, ৪৯৫টি উপজেলা পরিষদ, ৩৩০টি পৌরসভা, ৬১টি জেলা পরিষদ এবং ১৩টি সিটি করপোরেশনের বিভিন্ন পদে নির্বাচন আয়োজনের সুযোগ রয়েছে। এত বৃহৎ পরিসরের নির্বাচন একযোগে আয়োজন সম্ভব না হওয়ায় ধাপে ধাপে ভোটগ্রহণের পরিকল্পনা করা হচ্ছে। তবে কোন স্তরের নির্বাচন আগে হবে, সেটি নির্ধারণে স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ের মতামতও গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করছে কমিশন।
স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলম সম্প্রতি সাংবাদিকদের বলেন, স্থানীয় সরকার নির্বাচনের জন্য প্রয়োজনীয় বাজেট বরাদ্দ নিশ্চিত হওয়ার অপেক্ষায় রয়েছে মন্ত্রণালয়। বাজেট অনুমোদনের পর নির্বাচন কমিশনের সঙ্গে বৈঠকে বসে নির্বাচনের সময়সূচি ও অগ্রাধিকার নির্ধারণ করা হবে।
নির্বাচন কমিশনার আব্দুর রহমানেল মাছউদ বলেন, জুলাইয়ের মধ্যে আইন ও বিধিমালার সংস্কার সম্পন্ন করার লক্ষ্য রয়েছে। এরপর আগস্টে তপশিল ঘোষণার প্রস্তুতি নেওয়া হবে। সাধারণত ভোটগ্রহণের এক থেকে দেড় মাস আগে তপশিল ঘোষণা করা হয়। সে হিসেবে আগস্টে তপশিল হলে সেপ্টেম্বরের শেষভাগ কিংবা অক্টোবরের শুরুতে ভোটগ্রহণ শুরু হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
তিনি বলেন, নির্বাচনের সময় নির্ধারণে বর্ষা মৌসুমের পরিস্থিতি, প্রশাসনিক প্রস্তুতি এবং শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোর বার্ষিক পরীক্ষার বিষয়টিও বিবেচনায় রাখা হবে। কমিশনের দৃষ্টিতে অক্টোবর থেকে মার্চ পর্যন্ত সময় নির্বাচন আয়োজনের জন্য সবচেয়ে উপযোগী।
স্থানীয় সরকার নির্বাচন আয়োজনের প্রস্তুতির পাশাপাশি প্রয়োজনীয় অর্থ বরাদ্দ নিশ্চিত করতেও উদ্যোগী হয়েছে নির্বাচন কমিশন। সংস্থাটির বাজেট ও অর্থ শাখা ২০২৬-২৭ অর্থবছরের জন্য প্রায় ২ হাজার ৯০০ কোটি টাকা বরাদ্দ চেয়ে অর্থ মন্ত্রণালয়ে প্রস্তাব পাঠিয়েছে। কমিশনের কর্মকর্তারা বলছেন, চূড়ান্ত বাজেটে কিছুটা কাটছাঁট হতে পারে, তবে নির্বাচনী কার্যক্রম পরিচালনার জন্য প্রয়োজনীয় অর্থ বরাদ্দ পাওয়া যাবে বলে তারা আশাবাদী।
নির্বাচন কমিশনের হিসাব অনুযায়ী, স্থানীয় সরকারের সব স্তরের নির্বাচন সম্পন্ন করতে মোট ব্যয় হতে পারে প্রায় ৫ হাজার ৫০০ কোটি টাকা। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি অর্থ প্রয়োজন ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনের জন্য। উপজেলা পরিষদ নির্বাচনেও বড় অঙ্কের ব্যয়ের প্রয়োজন হবে। অন্যদিকে সিটি করপোরেশন ও পৌরসভা নির্বাচনের জন্য তুলনামূলক কম অর্থ প্রয়োজন হলেও সামগ্রিক ব্যয়ের পরিমাণ উল্লেখযোগ্য।
এর আগে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও গণভোট আয়োজনের জন্য ২০২৫-২৬ অর্থবছরে নির্বাচন কমিশনের অনুকূলে ৩ হাজার ১৫০ কোটি টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়েছিল। এর মধ্যে প্রায় ২ হাজার ২৫৬ কোটি টাকা ব্যয় হয় এবং প্রায় ৮০০ কোটি টাকা অব্যয়িত থাকে। সেই অভিজ্ঞতাকে সামনে রেখে স্থানীয় সরকার নির্বাচনেও কৃচ্ছ্রসাধনের নীতি অনুসরণ করতে চায় কমিশন।
ইসির সিনিয়র সহকারী সচিব (বাজেট) শামসুল হক ফৌজদার বলেন, কমিশন ২ হাজার ৯০০ কোটি টাকার প্রস্তাব পাঠিয়েছে। তবে চূড়ান্ত বরাদ্দের পরিমাণ জাতীয় বাজেট ঘোষণার পর জানা যাবে।
নির্বাচন কমিশনার আব্দুর রহমানেল মাছউদের ভাষ্য, জাতীয় নির্বাচনে অপ্রয়োজনীয় ব্যয় এড়িয়ে উল্লেখযোগ্য পরিমাণ অর্থ সাশ্রয় করা সম্ভব হয়েছে। স্থানীয় সরকার নির্বাচনেও একই ধরনের সতর্কতা অবলম্বন করা হবে। তবে নির্বাচন আয়োজনের মতো গুরুত্বপূর্ণ সাংবিধানিক দায়িত্ব পালনে প্রয়োজনীয় অর্থ বরাদ্দ নিয়ে সাধারণত কোনো জটিলতা তৈরি হয় না এবং সরকার প্রয়োজন অনুযায়ী সহায়তা দিয়ে থাকে।
আইন সংস্কার, বাজেট বরাদ্দ এবং প্রশাসনিক প্রস্তুতির সমন্বিত কার্যক্রম বিবেচনায় নির্বাচন কমিশন এখন স্থানীয় সরকার নির্বাচনের পূর্ণাঙ্গ প্রস্তুতির পর্যায়ে রয়েছে। আগামী দুই মাসের মধ্যে নির্ধারিত কর্মপরিকল্পনা বাস্তবায়ন করা গেলে আগস্টে তপশিল ঘোষণা এবং অক্টোবর থেকে ভোটগ্রহণের মাধ্যমে স্থানীয় সরকার ব্যবস্থায় নতুন নেতৃত্ব নির্বাচনের প্রক্রিয়া শুরু হতে পারে।