
বাংলাদেশে খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে ধানি জমির সর্বোচ্চ ব্যবহার এখন সময়ের দাবি। বর্তমানে একটি উল্লেখযোগ্য তথ্য হলো, বাংলাদেশে প্রায় ১৫.১ লক্ষ হেক্টর ধানি জমি বর্ষাকালে অনাবাদি অবস্থায় পড়ে থাকে। কৃষিনির্ভর এই দেশে এতো বিশাল পরিমাণ জমি অলস পড়ে থাকা যেমন অর্থনৈতিক ক্ষতি, তেমনি তা আমাদের ক্রমবর্ধমান জনসংখ্যার খাদ্য চাহিদা মেটানোর পথে একটি বড় অন্তরায়।
অলস পড়ে থাকা ১৫ লক্ষ হেক্টর জমি: সংকট ও সম্ভাবনার বাংলাদেশ
বাংলাদেশ মূলত একটি বদ্বীপ, যার ৪৫ শতাংশ ভূমিই হলো প্লাবন সমভূমি। ভৌগোলিক অবস্থানের কারণে প্রতি বছর বর্ষাকালে দেশের বিস্তীর্ণ এলাকা প্লাবিত হয়। এই প্লাবন সমভূমিগুলো আমন মৌসুমে (বর্ষাকালে) চাষাবাদের উপযোগী থাকলেও একটি বড় অংশ অনাবাদি থেকে যায়। এর পেছনে কাজ করছে মূলত মনস্তাত্ত্বিক ও কারিগরি কিছু কারণ।

কেন অনাবাদি থাকে এই জমি?
১. মোটা চালের ভীতি: বর্ষাকালে যেসব নিচু জমিতে পানি জমে থাকে, সেখানে সাধারণত গভীর পানির ধান বা বিশেষ জাতের আমন ধান চাষ করতে হয়। কিন্তু প্রচলিত ধারণা এবং বর্তমান বাজার চাহিদা অনুযায়ী, পানিতে হওয়া এসব ধানের চাল হয় বেশ মোটা। আধুনিক ভোক্তারা সরু চালের প্রতি বেশি আগ্রহী হওয়ায় কৃষকরা মনে করেন মোটা চালের ধান চাষ করলে তা লাভজনক হবে না।

২. জাতের অভাব: গভীর পানিতে বা জলাবদ্ধ অবস্থায় টিকে থাকতে পারে এমন উচ্চফলনশীল ও সরু চালের ধানের জাতের অভাব দীর্ঘকাল ধরে কৃষকদের নিরুৎসাহিত করেছে।
৩. প্রাকৃতিক ঝুঁকি: হঠাৎ বন্যা বা পানির উচ্চতা অস্বাভাবিক বেড়ে যাওয়ার আশঙ্কায় অনেক কৃষক বর্ষাকালে ঝুঁকি নিতে চান না।
বিপুল এই জমির অর্থনৈতিক সম্ভাবনা
১৫.১ লক্ষ হেক্টর জমি মানে প্রায় দেড় কোটি বিঘা জমি। এই জমিগুলো যদি আমন মৌসুমে সঠিক চাষাবাদের আওতায় আনা যায়, তবে বাংলাদেশ কেবল খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণই থাকবে না, বরং চাল রপ্তানিতে বিশ্বে শীর্ষস্থানে উঠে আসতে পারবে।
উত্তরণের পথ কী হতে পারে?
এই অচলাবস্থা কাটাতে কৃষি বিজ্ঞানী এবং নীতিনির্ধারকদের কয়েকটি বিষয়ে জোর দেওয়া প্রয়োজন:
- উন্নত জাত উদ্ভাবন: বাংলাদেশ ধান গবেষণা ইনস্টিটিউট (BRRI) বর্তমানে এমন কিছু জাত নিয়ে কাজ করছে যা জলাবদ্ধতা সহ্য করতে পারে এবং যার চাল তুলনামূলক চিকন। এসব জাত প্রান্তিক কৃষকদের মাঝে ছড়িয়ে দিতে হবে।
- সচেতনতা বৃদ্ধি: মোটা চালের পুষ্টিগুণ সম্পর্কে প্রচারণা চালানো এবং স্থানীয় বাজারে এর ন্যায্য মূল্য নিশ্চিত করা গেলে কৃষকরা চাষে উদ্বুদ্ধ হবেন।
- সমন্বিত কৃষি ব্যবস্থা: নিচু জমিতে শুধু ধান নয়, বরং মাছ ও ধানের সমন্বিত চাষ (Rice-Fish Culture) হতে পারে একটি চমৎকার সমাধান। এতে জমির উৎপাদনশীলতা ও কৃষকের আয়—দুই-ই বাড়বে।
দেশের ৪৫ শতাংশ প্লাবন সমভূমি আমাদের জন্য অভিশাপ নয়, বরং আশীর্বাদ হতে পারে। ১৫.১ লক্ষ হেক্টর অনাবাদি জমিকে সবুজ বিপ্লবের আওতায় আনতে পারলে বাংলাদেশের কৃষি অর্থনীতি এক নতুন উচ্চতায় পৌঁছাবে। প্রযুক্তির ব্যবহার এবং কৃষকের সদিচ্ছাই পারে এই ‘অলস’ জমিকে দেশের ‘সোনার খনি’তে রূপান্তরিত করতে।
১৫.১ লক্ষ হেক্টর অনাবাদি জমিকে চাষাবাদের আওতায় আনতে বাংলাদেশ ধান গবেষণা ইনস্টিটিউট (BRRI) বেশ কিছু উদ্ভাবনী প্রযুক্তি ও ধানের জাত সামনে নিয়ে এসেছে। বিশেষভাবে নিচু জমি এবং বন্যার পানি সহ্য করতে পারে এমন কিছু আধুনিক জাতের বিস্তারিত নিচে দেওয়া হলো:
১. বন্যা ও জলাবদ্ধতা সহনশীল জাত (Submergence Tolerant)
আমন মৌসুমে হঠাৎ বন্যায় ধান তলিয়ে যাওয়া ঠেকাতে ‘সাব-১’ (Sub-1) জিন সম্পন্ন জাতগুলো অত্যন্ত কার্যকর।
- ব্রি ধান৫১ ও ব্রি ধান৫২: এই জাতগুলো পানির নিচে টানা ২ সপ্তাহ বেঁচে থাকতে পারে। পানি নেমে যাওয়ার পর এগুলো আবার সতেজ হয়ে ওঠে।
- ব্রি ধান৭৯: এটি আরও উন্নত জাত, যা পানির নিচে প্রায় ২১ দিন পর্যন্ত টিকে থাকতে সক্ষম। এটি হেক্টর প্রতি ৫-৭ টন ফলন দিতে পারে।
২. গভীর ও আধা-গভীর পানির ধান (Deep Water Rice)
যেসব নিচু জমিতে পানির উচ্চতা বেশি থাকে, সেখানে চাষের জন্য বিশেষভাবে উপযোগী জাত:
- ব্রি ধান৯১: এটি একটি উচ্চফলনশীল গভীর পানির ধান (Deep Water Rice)। প্রচলিত স্থানীয় জাতের চেয়ে এটি হেক্টর প্রতি ১.০-১.৫ টন বেশি ফলন দেয়। এর কাণ্ড মজবুত হওয়ায় এটি হেলে পড়ে না এবং এটি থেকে ‘মুড়ি ফসল’ (Ratoon Crop) পাওয়া সম্ভব।
- ব্রি ধান১০৯ ও ব্রি ধান১১১: ২০২৫ সালে অনুমোদিত এই নতুন জাতগুলো বিশেষভাবে বন্যাপ্রবণ এবং উপকূলীয় জোয়ার-ভাটা অঞ্চলের আমন মৌসুমের জন্য উপযোগী।
৩. চিকন চালের উচ্চফলনশীল জাত (Premium Quality)
মোটা চালের ভীতি কাটাতে BRRI কিছু সুগন্ধি ও চিকন জাতের ধান উদ্ভাবন করেছে যা বর্ষাকালেও ভালো ফলন দেয়:
- ব্রি ধান৮০: এটি থাইল্যান্ডের জনপ্রিয় ‘জেসমিন রাইস’-এর মতো দীর্ঘ ও চিকন দানার সুগন্ধি ধান। এর বাজার মূল্য অনেক বেশি এবং এটি বিদেশে রপ্তানিযোগ্য।
- ব্রি ধান১০২: এটি মূলত বোরো মৌসুমের জাত হলেও এটি জিংক সমৃদ্ধ এবং অত্যন্ত চিকন চালের জন্য পরিচিত। নিচু এলাকায় যেখানে আগে ধান হতো না, সেখানে সঠিক সময়ে এর চাষ কৃষকদের অনেক লাভবান করছে।
৪. আধুনিক কৃষি প্রযুক্তি
শুধু জাত নয়, জমি চাষের পদ্ধতিতে পরিবর্তন এনেও অনাবাদি জমি কাজে লাগানো হচ্ছে:

- সর্জন পদ্ধতি (Sorjan System): নিচু বা জলাবদ্ধ জমিতে উঁচু বেড তৈরি করে সেখানে সবজি এবং নিচু নালায় ধান ও মাছ একসাথে চাষ করা হয়।
- ভাসমান বীজতলা (Floating Seedbeds): বন্যার সময় চারার সংকট মেটাতে কচুরিপানা বা বাঁশের মাচার ওপর ভাসমান বীজতলা তৈরি করে চারা উৎপাদন করা হচ্ছে।