
কমরেড প্রভাস ঘোষ
..”নৈতিকতা ও মূল্যবোধের উপর ভয়ঙ্কর পুঁজিবাদী আক্রমণ চলেছে- শুধু আমাদের দেশে নয় গোটা পুঁজিবাদী দুনিয়ায় : কারণ পুঁজিবাদ জানে, কামান, বন্দুক, অ্যাটম বোম যা-ই থাকুক,কোনও কিছু দিয়েই বিপ্লবী আন্দোলনকে খতম করা যায় না,যদি মানুষের চরিত্র থাকে,মনুষ্যত্ব থাকে,সাহস ও তেজ থাকে,যদি আবার ক্ষুদিরাম,ভগৎ সিং, আসফাকউল্লা, রামপ্রসাদ বিসমিল, চন্দ্রশেখর আজাদ, চাপেকার ব্রাদার্স, প্রতিলতাদের মত চরিত্র জন্ম নেয়।
তাই, পুঁজিবাদ চায় মানুষকে অমানুষ কর, তার বিবেককে মারো,মনুষ্যত্বকে মারো, তাদের লোভী কর, স্বার্থপর কর। নীতিহীন, আদর্শহীন, কর্তব্যহীন বুর্জোয়া ব্যক্তিকেন্দ্রিকতা গোটা বিশ্বব্যাপী এক ভয়ঙ্কর সংকট ডেকে এনেছে। যেভাবে হোক টাকা রোজগার কর-খুন করে হোক, লুঠ করে হোক। যেভাবে হোক ফূর্তি কর,মদ খাও, গাঁজা খাও, নেশা কর, নারীদেহ নিয়ে নোংরা উক্তি কর, কুৎসিত নাচ কর। গোটা দুনিয়ার দিকে তাকিয়ে দেখুন। যে ইউরোপ শেকসপিয়ারের জন্ম দিয়েছে, মিল -মিলটন -ফুয়েরবাকের জন্ম দিয়েছে, একদিন নিউটন -গ্যালিলিওকে দিয়েছে, টলস্টয় -ভিক্টর হুগোর মত আর কত মনীষীর জন্ম দিয়েছে, যে আমেরিকায় একদিন আব্রাহাম লিঙ্কন সৃষ্টি হয়েছে, আজ সেই ইউরোপ – আমেরিকা কোথায় ? সেখানে এখন ড্রাগ না খেলে ঘুম হয় না, নোংরা যৌনতার চর্চা না করলে স্ফূর্তি হয় না। সেখানে যুবক – যুবতীর বিবাহিত জীবন চায় না। তারা চাইছে দেহের প্রয়োজনে কিছুদিন অথবা কিছুক্ষণ একত্রে থাকা, যেমন করে জন্তুরা জৈবিক তাড়নায় একত্র হয়। কোথায় সেই দাম্পত্য জীবন ? এখন বিবাহটা ঝঞ্ঝাট, বোঝা! সন্তান তো আরও মারাত্মক ঝামেলা। ফলে সন্তান অবাঞ্ছিত। যে শিশুরা জন্ম নিচ্ছে, তারা মাতৃস্নেহ- পিতৃস্নেহ বলে যে কিছু আছে, তা অনুভব করতে পারে না। এই হচ্ছে সমাজের উচ্চমহলের এক দলের চিন্তা ও জীবনযাত্রার ধরন। পথে – ঘাটে,ট্রেনে – বাসে মেয়েদের দেখলেই কত কুৎসিত মন্তব্য, কত নোংরা দেহভঙ্গি করে, ইতরামি করে, কিডন্যাপ করে, দলবদ্ধভাবে রেপ করে। বিয়ের নামে ছলনা করে, দু ‘দিন লালসা মিটিয়ে বাজারে বিক্রি করে দেয়। স্নেহ – মায়া -মমতা – ভালবাসা, মানুষের হৃদয়বৃত্তি চুরমার হয়ে গেছে। হৃদয় কোথায় যে তার বৃত্তি থাকবে ?
বিবেককের আধার তো হৃদয়! ব্যক্তির বিবেক থাকে নাকি,সমাজবিবেক না থাকলে ? সমাজবিবেক থাকে নাকি, সামাজিক প্রগতিশীল আন্দোলন না থাকলে ? সামাজিক আন্দোলনই তো মানুষের মধ্যে নীতিবোধ জাগায়, কর্তব্যবোধ জাগায় — যে বোধ থেকেই আসে বিবেক দংশন, অন্যায় করলে আত্মধিক্কার, এ আমি কী করলাম! এ আমি কী ভাবলাম! কোথায় আজ এ সব চিন্তাভাবনা ? যে ছেলেকে খাওয়ানো -পরানো -লেখাপড়া শেখানোর জন্য ভিক্ষা করেছিল বাবা -মা, না খেয়ে মানুষ করার চেষ্টা করেছিল,সেই ছেলে বৃদ্ধ বয়সে বাবা -মাকে ঘাড় ধাক্কা দিয়ে বের করে দিচ্ছে। ছেলে বিরাট বাড়ি করেছে কিন্তু সেখানে বৃদ্ধ বাবা -মার স্থান নেই। তাঁরা যাচ্ছেন বৃদ্ধাশ্রমে। আশ্রম না বৃদ্ধদের কারাগার! বৃদ্ধাশ্রমও এই পুঁজিবাদী সভ্যতার সৃষ্টি। পুঁজিবাদ আজ সর্বত্র স্নেহ-প্রেম -প্রীতি -মমতা -মনুষ্যত্ব সব কিছু ধ্বংস করছে। মানুষকে পশুতে পরিণত করছে। এই সভ্যতা পচে গেছে, ধসে গেছে। সভ্যতা কাঁদছে, মুক্তি পেতে চাইছে। কে তাকে মুক্তি দিতে পারে ?
কমরেড শিবদাস ঘোষ বলেছেন,কোনও সমাজ, সভ্যতা যখন সংকটে জর্জরিত হয়, সে যখন মুক্তি চায়, তখন সে যৌবনের দ্বারস্থ হয়। যারা যথার্থ যুবক তারা এগিয়ে আসে। তারা বিপ্লবী আদর্শে অনুপ্রাণিত হয়। বিপ্লবী সংগঠন গড়ে তোলে, সমাজে বৈপ্লবিক পরিবর্তনের চেতনা জাগায়। ছাত্রদের প্রতি উদাত্ত আহ্বানে তিনি বলেছেন,প্রত্যেকই একদিন প্রাকৃতিক নিয়মে মারা যাবে। তাই যতদিন বাঁচবে এবং যখন মারাও যাবে, কুকুর – বিড়ালের মতো বেঁচো না, মারা যেও না। মানুষের মতো বাঁচবে ও মরবে। আর যদি মানুষের মতোই বাঁচতে চাও, মর্যাদার সাথে মরতে চাও তাহলে তার একমাত্র পথ বিপ্লবের ঝাণ্ডা বহন করা। আজও ভগৎ সিং – ক্ষুদিরাম – মাস্টারদা সূর্য সেন,প্রীতিলতা ও আরও অসংখ্য শহিদের স্মৃতি আমাদের বুকে আছে। তাঁরা কি মৃত ? না, আমাদের চেতনায় তাঁরা আজও জীবিত,আজও জ্বলন্ত প্রেরণা। রক্তের সম্পর্কে যারা আমাদের পূর্বপুরুষ,আমরা তাদের অনেকেরই নাম জানি না। কিন্তু দেশের জন্য সমাজের জন্য কাজ করে যাঁরা বড় মানুষ বলে পরিচিত হয়েছেন,তাদের নাম জানি, তাদের স্মরণ করি। এ পথেই রয়েছে যথার্থ মর্যাদাময় জীবন।”….
-কমরেড প্রভাস ঘোষ
সাধারণ সম্পাদক, SUCI(C)