, ,

, ,

হোম মতামত

‘’উদার ধর্মচিন্তা এবং আমাদের উদাসীনতা’’

শেয়ার: https://www.timebulletin24.com/news/b33tpo

রফিক ইসলাম


বিষয়টা মনস্তাত্তিক তবে সামাজিক বাতবতা হল ধর্মের ব্যাপারে আমরা একই সাথে উদার এবং উদাসীন। ফলে অনেক সময় আমরা ধর্মের পথ অনুসরণ করতে গিয়ে ভুল পথের অনুসারী হই।
উদারতা যেমন সমাজে সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি ও শান্তির পরিবেশ বজায় রাখতে সাহায্য করে। তেমনি ধর্মের মৈলিক ও গভীর অনুশীলনের উদাসীনতা সমাজে সাম্প্রদায়িক উগ্রবাদ বৃদ্ধি করে। ধর্মকে রাজনৈতিক স্বার্থে ব্যবহার, সামাজিক মাধ্যমে বা সরাসরি ধর্মের বিরুদ্ধে মিথ্যা অপপ্রচার ও অন্য ধর্মের অনুসারীদের বিরুদ্ধে হামলার উসকানি দেওয়া, নিজ ধর্ম বা মতাদর্শকে অন্যের উপর চাপিয়ে দেয়ার মানুসিকতা সমাজকে সহিংস করে তোলে।
ইসলামের নির্দেশনা হল, আমরা যেন সত্যের উপর অবিচল থাকি এবং সত্যকে সত্য আর মিথ্যাকে মিথ্যা বলে অভিহিত করি। পাশাপাশি ইসলাম এই আদেশও করে, যেন প্রতিপক্ষের সঙ্গে উত্তম ও কোমল আচরণ করা; এমনকি ইসলাম ও মুসলিম উম্মাহর সবচেয়ে বড় বিরোধী বরং শত্রু অমুসলিমদের প্রতিও যেন কোমল ও সৌহার্দপূর্ণ আচরণ করা হয় এবং তাদের যাবতীয় হক ও অধিকার আদায় নিশ্চিত করা। খুলাফায়ে রাশেদীন, ন্যায়পরায়ণ খলীফা ও বাদশাগণ এবং প্রত্যেক যুগের দ্বীনদার রাষ্ট্রপ্রধানগণ অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে ইসলামের এই হুকুম পালন করেছেন।
হিন্দু ধর্মেও ‘অহিংসা কে পরম ধর্ম’ ও এর সহনশীলতার ওপর গুরুত্বরোপ করা হয়েছে। উগ্র হিন্দুত্ববাদী মতাদর্শ, যা রাজনৈতিক স্বার্থে মেরুকরণ বা অসহিষ্ণুতা ছড়ায়, কোনভাবেই সেটা মূল সনাতন ধর্মের আদর্শ নয়।
খ্রিস্টীয় বা বৌদ্ধ ধর্মেও উগ্রবাদকে ধর্মের পরিপন্থী বলা হয়েছে।
অথচ সমাজে দেখা যায় এর উল্টো চিত্র।
বাংলাদেশসহ দক্ষিণ এশিয়ার সংস্কৃতি হাজার বছর ধরে মিশ্র ঐতিহ্যের। এখানে পীর-সুফি, বাউল এবং বিভিন্ন ধর্মীয় উৎসবের সামাজিক মেলবন্ধন আমাদেরকে প্রাকৃতিকভাবেই অন্যের বিশ্বাসের প্রতি উদার হতে শিখিয়েছে। উদারতা একটি মানবিক গুন। কিন্তু সেটা সমাজের রীতি, রাষ্ট্রীয় আইন এবং ধর্মীয় অনুশাসনের সীমানা অতিক্রম করে নয়। একজন হত্যাকারীর প্রতি তার সুবিচার নিশ্চিত হওয়া পর্যন্ত উদারতা ঠিক আছে কিন্তু তাকে আইনের উর্ধে বিবেচনায় রেখে নয়। ধর্মের ক্ষেত্রেও আমাদের মনোভাব একই হওয়া উচিত। ধর্মীয় উদারতা দেখানোর পাশাপাশি ধর্মের প্রতি উদাসীনতা কাটিয়ে উঠাও জরুরি। অথচ বিশ্বায়নের এই যুগে জানার অবাধ সুযোগ থাকা সত্বেও আমরা প্রকৃত সংস্কৃতি ও ধর্ম সম্পর্কে উদাসীন। আর এই উদাসীনতার সুযোগে কতিপয় ভন্ড মোড়ল আমাদের ভুল পথে পরিচালিত করছে।
আমাদের মনে রাখতে হবে, জটিল এবং বহুমাত্রিক কারণে সমাজে ধর্মের অপব্যাখ্যা বা উগ্রবাদ বেড়ে যেতে পারে যা সামাজিক, রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও শিক্ষাগত নানাবিধ উপাদানের সাথে সরাসরি যুক্ত। ক্ষমতার রাজনীতি. ব্যক্তিগত স্বার্থ রক্ষা,এবং ধর্মীয় জ্ঞানের সীমাবদ্ধতার কারণে ধর্মীয় উগ্রপন্থা মাথাচাড়া দিয়ে উঠতে পারে।
কাজেই সঠিক তথ্য ও ইতিহাস জানার ক্ষেত্রে আমাদের আরো সচেতন হতে হবে।


গত দেড়- দুই বছরে বাংলাদেশে ধর্মীয় উগ্রবাদী গোষ্ঠীগুলোর তৎপরতা এবং উগ্রপন্থী মতবাদের উত্থানের শঙ্কা নিয়ে বিভিন্ন জাতীয় ও আন্তর্জাতিক মহলে আলোচনা ও উদ্বেগ বেড়েছে। আল-কায়েদাপন্থী, দায়েশপন্থী, তালেবানপন্থী এবং নিউ জেএমবি এর মত সহিংস উগ্রপন্থী গোষ্ঠী সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রকাশ্য হয়েছে। এসব গোষ্ঠী যারা গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রব্যবস্থাকে স্বীকার করে না, দেশের প্রচলিত নিরাপত্তা বাহিনীকে এরা ‘ইসলামের শত্রু’ হিসেবে দেখে এবং তাদের মতের সাথে দ্বিমত করলেই আপনি হয়ে যাবেন শত্রু।
অতিসম্প্রতি বাংলাদেশে গণহারে কালেমা খচিত (সাদা ও কালো) পতাকা প্রদর্শন ও মোটরসাইকেল মিছিলের ঘটনাটি দেশজুড়ে ব্যাপক আলোচনা এবং নিরাপত্তা উদ্বেগের জন্ম দিয়েছে। যা আন্তর্জাতিক অঙ্গনে ভুল বার্তা ও আমাদের ভাবমূর্তি সংকটে ফেলবে। বৈদেশিক শ্রমবাজারে এর প্রভাব পরতে পারে, বিদেশী বিনিয়োগ (FDI) বাধাগ্রস্ত হতে পারে। এতে বড় ধরনের অর্থনৈতিক ক্ষতির মুখে পড়ার আশঙ্কা থাকে।
বিশ্লেষকদের মতে, অভ্যুথান পরবর্তী সময়ে রাজনৈতিক অস্থিরতা এবং আইন-শৃঙ্খলার অবনতি উগ্রবাদীদের জন্য নতুন সুযোগ তৈরি করে দিয়েছে। দেশে নির্বাচন হয়েছে, নির্বাচিত সরকার নিশ্চয়ই বিষয়টির গুরুত্বের সাথে নিয়ে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিবে। তবে শুধু প্রশাসন আর কূটনৈতিক তৎপরতায় এর বিস্তার রোধ কতটুকু সম্ভব?
মানসম্পন্ন ধর্মীয় শিক্ষা, নিরাপদ অবকাঠামো ও সামাজিক সচেতনতা বাড়ানো না গেলে সমাজে ধর্মের অপব্যাখ্যা বা উগ্রবাদী তৎপরতা রোধ করা সম্ভব হবে না।
উগ্রবাদ ও ধর্মীয় অন্ধত্বের বিরুদ্ধে সামাজিক প্রতিরোধ গড়ে তোলা, প্রকৃত ধর্মীয় শিক্ষার প্রসার ও সঠিক ব্যাখ্যার মাধ্যমে সমাজ থেকে অন্ধবিশ্বাস দূর করা এবং পাশাপাশি আইন প্রয়োগের কঠোরতা নিশ্চিত করা না গেলে সমাজকে স্থিতিশীল রাখাও কঠিন হবে।


এছাড়াও প্রচলিত ওয়াজ মাহফিল বা ইসলামিক জালসার কাঠামোগত পরিবর্তন, যত্রতত্র গড়ে ওঠা মসজিদ-মাদ্রাসাগুলোতে রাজনৈতিক কর্মকান্ড বন্ধ করা এবং প্রয়োজনীয় নীতিমালা ও ডাটাবেইজের মাধ্যমে সরকারের সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের অধীনে নিয়ে আসা জরুরি।
ধর্মের নামে সহিংসতা ও ঘৃণাকে ‘মৌলবাদ’ বা ‘চরমপন্থা’র মাধ্যমে ন্যায়সংগত করার অপচেষ্টা সামাজিক সম্প্রীতি বিনষ্ট, মানবাধিকার ও নিরাপত্তা, আইনশৃঙ্খলার অবনতি, শিক্ষা ও মনস্তাত্ত্বিক অবক্ষয়সহ অর্থনৈতিক ক্ষতির মত ঝুঁকি তৈরী করে।
এর থেকে উত্তরণের জন্য সামাজিক, শিক্ষাগত, ধর্মীয় ও প্রশাসনিক স্তরে সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন। অন্ধবিশ্বাস নয় তরুণদের আত্মবিশ্বাসী করে তুলতে হবে যুক্তি, বিশ্লেষণাত্মক চিন্তাভাবনা এবং প্রশ্ন করার মানসিকতা থেকে। তরুণদের জন্য খেলাধুলা ও সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড বিস্তৃত করা, পারিবারিক ও সামাজিক সচেতনতা বৃদ্ধি, নৈতিক শিক্ষার মূল ভিত্তি—যেমন শান্তি, মানবতা ও পরমতসহিষ্ণুতা পাঠ্যসূচিতে অন্তর্ভুক্ত করা জরুরি। অপপ্রচার রোধে জুম্মার খুতবা ও ধর্মীয় আলোচনায় শীর্ষস্থানীয় ওলামা ও ইসলামি চিন্তাবিদদের সমন্বিতভাবে ফতোয়া ও সচেতনতামূলক প্রচারণা বাড়ানো, ইন্টারনেটে নজরদারি ও সাইবার নিরাপত্তা শক্তিশালী করা, উগ্রবাদ ও সাইবার ক্রাইম দমনে গোয়েন্দা সংস্থা ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে আরও আধুনিক ও দক্ষ করে তোলা বিশেষ জরুরি।
আশা করি সরকার বিষয়টি সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করবে। নাগরিক হিসেবে আমাদের এটাই প্রত্যাশা।

  • মতামত লেখকের নিজস্ব

মন্তব্য করুন

আপনার ইমেইল প্রকাশ করা হবে না। * চিহ্নিত ঘরগুলো আবশ্যক।

শেয়ার করুন