
কাকন রেজা:
‘কথিত আয়নাঘর’ লেখা ছিল টেস্ট কেস। যাতে জুলাইকেও পরবর্তীতে ‘কথিত’ এর মধ্যে সীমাবদ্ধ করা যায়।
এটা অনিচ্ছাকৃত ভুল নয়, ইচ্ছাকৃত। ভুল ইচ্ছাকৃত হলে তা হয়ে যায় অন্যায়। যে জিনিসের অস্তিত্ব দৃশ্যমান
নয়, ধারণার মধ্যে রয়ে যায়, সেক্ষেত্রে ‘কথিত’ শব্দটি ব্যবহার করা যায়। কিন্তু আয়নাঘর দৃশ্যমান। সেখানে
থাকা মানুষেরা জীবিত। সব চোখের সমুখে। তারপরেও যখন ‘কথিত’ শব্দটি ব্যবহার করা হয়, তখন তা অন্যায়।
ভুল প্রতিকারযোগ্য আর অন্যায় শাস্তিযোগ্য।
কিন্তু ‘কথিত’ শব্দটি ব্যবহারের অন্যায় সাহস কীভাবে হলো, সে প্রসঙ্গে আসি। এনসিপি’র পদযাত্রা
আক্রান্ত হলো। নেতা-কর্মীরা আহত হলেন। এনসিপি’র সাথে সংঘর্ষ হলো কার, জুলাইয়ের সবচেয়ে বড় স্টেক
হোল্ডার বিএনপি’র। দুটোই জুলাইপক্ষ। প্রধানপক্ষ। তাদের মধ্যে যখন সংঘাত, তখন সঙ্গতই জুলাই
বিরোধীরা উৎসাহিত হবার কথা। সেই উৎসাহের প্রতিফলন হলো আয়নাঘরের আগে ‘কথিত’ শব্দটির
ব্যবহার।
ফাহাম আবদুস সালাম বলেছেন, জুলাইকে বেশি ওউন করার কথা বিএনপি’র। একদম সত্যি কথা। বিগত
ফ্যাসিস্ট শাসনামল শুধু নয়, ফখরুদ্দিনের সেনাশাসিত সরকারের সময়েও সবচেয়ে নির্যাতিত দল বিএনপি।
ওয়ান ইলেভেনের সময়েই বর্তমান প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের উপর নির্মম নির্যাতন চালানো হয়েছিল।
নির্যাতন চালিয়েছিল অগণিত বিএনপি নেতাকর্মীর উপর। তারপর ফ্যাসিস্ট আমল শুরু। এখানেও বিএনপির
উপর স্টিমরোলার চলেছে। সাথে জামায়াতের উপরও। কিন্তু ফখরুদ্দিনের শাসনামলে জামায়াত ওই ভাবে
আক্রান্ত হয়নি। জামায়াতের নির্যাতন শুধু ফ্যাসিস্টের দেড় দশক। কিন্তু বিএনপির উপরি হলো ফখরুদ্দিনের
শাসনামল। সুতরাং জুলাইকে ওউন করার কথা বিএনপির অবশ্যই বেশি। কিন্তু বিএনপি কি তা করছে? ফাহাম
আবদুস সালামের প্রশ্নটা সেখানেই।
আপনি যদি সাধারণ মানুষের কথা বুঝতে পারেন, তাহলে দেখবেন, জুলাইকে সত্যিকার অর্থেই বিএনপি ওউন
করে কিনা এনিয়ে তাদের সন্দেহ সৃষ্টি হয়েছে বা হচ্ছে। বিশেষ করে তরুণদের মধ্যে এই প্রশ্নটা জাগছে।
জেনারেশন জেড এবং আলফা’র জুলাই বিপ্লবকালীন তারেক রহমানকে নিয়ে যে ক্রেজটা ছিল তা কি এখন আছে?
একটু খোঁজ নিয়ে দেখুন তো বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে, কী বলে তারা। অনেকে বলবেন, বিএনপি’র ছাত্র সংগঠনের
মিছিলের বহর দেখুন, তাহলেই বুঝবেন তরুণরা কী বলে। তারা বিএনপি’র প্রতিই অনুরক্ত। কদিন আগে
ছাত্রলীগ কিন্তু শেখ হাসিনাকে তাই বোঝাতো। সংখ্যার বহর দেখিয়ে বলতো আমরাই সব। কিন্তু জুলাইয়ের
প্রতিরোধে কী দেখা গেল? সেই বিশাল সংখ্যার ধারণা ছিল মূলত ইউটোপিয়া। আওয়ামী লীগ সরকারের এই
ইউটোপিয়ায় আক্রান্ত হতে সময় লেগেছে। কিন্তু বিএনপি’র মতন একটি মজলুম দল যদি ৫ মাসেই ইউটোপিয়ায়
ঢুকে যায়, তাহলে শুধু দল নয়, ক্ষতিগ্রস্ত হবে বাংলাদেশ। বিএনপি ফেইল করা মানে বাংলাদেশ ফেইল করা।
কিন্তু কেন এমন হচ্ছে। কেন মনে হচ্ছে বিএনপি জুলাইকে সঠিকভাবে ওউন করতে পারছে না। এর কারণ খুঁজতে
গেলে, দেখা যাবে জুলাই বিপ্লবে বিএনপির যে অংশটা পিছিয়ে ছিল। যাদের ছবি কোনো প্রতিরোধে দৃশ্যমান হয়
না, তারা একধরণের হীনম্মন্যতায় ভুগছেন। তারা চাচ্ছেন জুলাইয়ের যারা পরিচিত মুখ তারা যেন তাদের আগে
চলে না যায়। তারা সেদিনই ভয় পেয়েছেন যেদিন তারেক রহমান নাহিদ ইসলামের বাসায় গেছেন। তারা তখনই ভয়
পেয়েছেন যখন তারেক রহমান শহিদ শরিফ ওসমান হাদি’র কবর জেয়ারত করতে গেছেন। তাদের ধারণা হয়েছে,
তারেক রহমান যদি এই অংশটিকে কাছে টেনে নেন। তারা যদি বিএনপির সাথে মার্চ করে। তাহলে প্রতিরোধে
যারা ছিলেন না, তারা রাজনীতির দৃশ্যপট থেকে নাই হয়ে যাবেন। শুধু নিজেদের দৃশ্যমান রাখতে তারা জুলাইকে
নানান প্রক্রিয়ায় আন্ডারমাইন করার চেষ্টায় আছেন। আর এতে উৎসাহিত হয়েছে আধিপত্যবাদী শক্তি।
তারা তাদের ক্রীড়ানকদের জুলাইয়ের বিপক্ষে মাঠে নামিয়েছে। স্বীকার করুন আর না করুণ ভারতের সবচেয়ে
বড় কূটনৈতিক ব্যর্থতার নজির হলো বাংলাদেশের জুলাই বিপ্লব। সুতরাং তারা সঙ্গতই চাইবে জুলাই বিপ্লব ও
বিপ্লবীদের কোনঠাসা করতে। একটা উদাহরণ দিই। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্রদলের খুবই জনপ্রিয় একটি মুখ
হামিমকে সরিয়ে দেয়া হয়েছে দৃশ্যপট থেকে। ধীরে ধীরে আবিদও নাই হয়ে যাচ্ছে। কারণ তারা সমুখে থাকলে
জুলাই সমুখে চলে আসে।
আর ভেতরে যাই না। বলতে চাই না অন্দরে-কন্দরে আরো কী কী ঘটছে। শুধু এটুকু বলি, জুলাইয়ে যারা গর্তে
ছিল, তারা এখন গর্তের বাইরে। সেই খালি গর্তে তারা জুলাইকে ঢোকাতে চাচ্ছে। কিন্তু জুলাইকে গর্তে
ঢোকানোর চিন্তার আগে তাদের চিন্তা করা উচিত ছিল, জুলাই মানেই বিএনপি। বিএনপি’র ৭ নভেম্বরের সিপাহী-
জনতার বিপ্লবের দ্বিতীয় ভার্সন হচ্ছে চব্বিশের জুলাই। জুলাইয়ে ছাত্র-জনতার সাথে সেনাবাহিনী যুক্ত না
হলে জুলাই বিপ্লব সম্ভব হতো না, যেমন হতো না ৭৫ এর সিপাহী-জনতার বিপ্লব। বর্ষা বিপ্লব এবং সিপাহী-
জনতার বিপ্লব দুটোই বিএনপি’র রাজনৈতিক অ্যাসেট। আর প্রতিরোধের মাঠে না থাকা সুবিধাবাদীরা বিএনপি’র
লায়াবিলিটিজ। সুতরাং বিএনপিকে ভাবতে হবে, তারা অ্যাসেটকে সম্বল করবে, নাকি লায়াবিলিটিজের ভার বহন
করবে।
লেখক: সাংবাদিক ও কলামিস্ট।