
মোঃ রফিকুল ইসলাম
আমার দেখা মানুষের জন্য অকৃপণ দরদী, শিল্প-সংস্কৃতি ও সাহিত্যের বিকাশে সৃজনশীল গুণাগুণে বিকশিত, অদম্য সাহসী প্রধান শিক্ষিকা বিউটি রানী পাল।
মুক্তমনা এই শিক্ষিকার সাথে কিভাবে আমার সাথে দেখা হলো, তা আপনাদের জানানোর জন্যই আজকের এই লেখা।
প্রকল্পের নামধাম দিন-তারিখ আজ মনে নেই। তা প্রায় পাঁচ-ছয় বছর আগের কথা। একটা তদন্ত ও গবেষণা কাজে তথ্য উপাত্ত সংগ্রহে পিটাইটিকর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ভিজিটে যাই..।
সরকারি স্কুলের ছেলেমেয়েদের আনন্দে স্কুলমুখী রাখার জন্য, শেখ হাসিনা সরকারের আমলে প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়, দেশের সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ক্লাসরুম, আঙ্গিনা ইত্যাদির সৌন্দর্য বর্ধনের প্রকল্প হাতে নেন। খেলাধুলার সরঞ্জাম , দোলনা, ছোট্ট ফুলের বাগান, ছোট্ট পাঠাগার, ছোট্ট মেরামত বা নির্মান, রংচঙ ইত্যাদির জন্য স্কুলের ক্যাটাগরি (A,B,C) অনুযায়ী প্রতি বৎসর প্রকল্পের মাধ্যমে একটা নগদ অর্থ বরাদ্দ দেন।
পরিকল্পনা মন্ত্রনালয়ের (IMED) মনিটরিং ও মুল্যায়ন বিভাগ, বরাবরের মতোই উক্ত প্রকল্পের অর্থ সঠিকভাবে ব্যবহার করা হয়েছে কি-না, তা তদন্তের মাধ্যমে মুল্যায়ন করেন।
দৈনিক পত্রিকার বিজ্ঞাপনে অনেকগুলো প্রতিষ্ঠান তথ্য উপাত্ত সংগ্রহে আগ্রহ প্রকাশ করে আবেদন জমা দেন। তারমধ্যে বাছাই করে যোগ্য ও অভিজ্ঞতা সম্পন্ন গবেষণা প্রতিষ্ঠানকে উক্ত প্রকল্পের তথ্য উপাত্ত সংগ্রহ ও গবেষণার জন্য নিয়োগ প্রদান করেন। অতঃপর মন্ত্রনালয় যাবতীয় তথ্য উপাত্ত দিয়ে উক্ত প্রতিষ্ঠানকে সার্বিক সহযোগিতার জন্য মাঠ পর্যায়ের প্রশাসনের বিভিন্ন দপ্তরে চিঠির অনুলিপি পাঠিয়ে জানিয়ে দেন। ঐসময় যে গবেষণা প্রতিষ্ঠান কাজ পেয়েছিলেন, আমাদের কয়েকজনের সেখানে কর্মক্ষেত্র হওয়ার সূত্রে আমরাও তথ্য উপাত্ত সংগ্রহের জন্য খন্ড কালীন চাকুরীতে নিয়োগ পাই। সঙ্গে সঙ্গেই কর্মযজ্ঞ শুরু হয় সংশ্লিষ্ট বিষয়ে। ক্যাটাগরি অনুযায়ী সাক্ষাৎকারের জন্য দফায় দফায় কয়েক রকমের প্রশ্নপত্র তৈরি হয়। প্রশ্নপত্র বিশ্লেষণ তথ্য আদায়ের জন্য নিপুণ কলাকৌশল,নিজেদের সংযত আচরণ এবং তথ্য দানকারী ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের গোপনীয়তা সুরক্ষা ও ব্যবস্থাপনা ইত্যাদি বিষয়ে আমরা তিন দিনের প্রশিক্ষণ নিয়ে তৈরী থাকি। কতৃপক্ষের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী আমি সিলেট বিভাগের জন্য দ্বায়িত্ব পাই।
আমি ঢাকা থেকে প্রথম বারের মত হযরত শাহজালাল রহমতুল্লাহর পূণ্যভুমি সিলেট পৌঁছাই। ডাকবাংলোতে সীট খালি না থাকায়, আগে থেকেই আমাদের সহকর্মী সুনামগঞ্জের হারুন ভাইয়ের কাছে বিকল্প হিসাবে জেনেছিলাম হোটেল বাগদাদের কথা। যেখানে থাকলে আমার জন্য নিরাপদ আরামদায়ক ও সাশ্রয় হবে। তার কথা অনুযায়ী হোটেল বাগদাদে চারতলায় দশ দিনের জন্য একটা ছোট্ট রুম ভাড়া নিলাম। রিসিপশনে আমাদের সিরাজগঞ্জের অনেক কাপড় ব্যবসায়ীর সঙ্গে পরিচয় হলো। অনেক দিন হলো বেশির ভাগ কাপড় ব্যবসায়ী এই হোটেলে রাত্রি যাপন করে থাকেন।
আমার কাজের নির্দেশনা ও কর্মপরিকল্পনা অনুযায়ী ফেঞ্চুগঞ্জের কাজ আগে শেষ করে, সদর উপজেলার কাজ পরে করতে হবে। সকালে লাল বাজারে চা-নাস্তা সেরে সিএনজি চালিত অটোরিকশায় সাড়ে নয়টার মধ্যে ফেঞ্চুগঞ্জ উপজেলা শিক্ষা অফিসে পৌঁছালাম। একজন বয়স্ক ভদ্রলোক শিক্ষা কর্মকর্তা হিসাবে তার রুমে বসে আছেন। ছালাম দিয়ে নিজের পরিচয় জানাতে সঙ্গে থাকা মন্ত্রনালয়ের চিঠি এগিয়ে দিতেই তিনি বসতে বললেন। কুশলাদি জানলেন এবং এ-ও জানালেন তিনি প্রায় একযুগ হলো এই উপজেলায় দ্বায়িত্ব পালন করছেন। আমার আগমনের হেতু তারা ইমেইলে জেনেছেন। কলিং বেল টিপে হাল্কা চা নাস্তার ব্যবস্থা করলেন। শিক্ষা অফিসে এবং স্কুলে কার কার সাথে আমার সাক্ষাৎ হবে,তার একটা তালিকা দিয়ে কাজ শুরু করলাম। শিক্ষা অফিসে আলাদা আলাদা প্রশ্নপত্রে সাক্ষাৎকার শেষ করে উপজেলার মোট স্কুলের তালিকা চাইলাম। সঙ্গে সঙ্গে তালিকা দিয়ে জানতে চাইলেন, আমি কোন কোন স্কুল ভিজিট করতে চাই। আমার ঢাকা অফিসের নির্দেশনা অনুযায়ী, উপজেলা অফিসের কোন সাহায্য ছাড়া নিজের ইচ্ছেমতো ঐ তালিকা থেকে মোট পাঁচটা স্কুলে ঠিক দিলাম। কোন তারিখে কোন স্কুল দেখবো তাও লিখে দিলাম। আমি বসে থাকা অবস্থায়ই শিক্ষা অফিসার মহোদয় মোবাইল ফোনে প্রধান শিক্ষকদের স্কুল ভিজিটের তারিখগুলো জানিয়ে প্রয়োজনীয় পরামর্শ দিলেন। তিনি আমাকে তার মোবাইল নম্বর দিয়ে, প্রয়োজনে যোগাযোগ রাখতে অনুরোধ করলেন। শিক্ষা অফিসার মহোদয় দুপুরের খাবার খাওয়ালেন। আমি শিক্ষা অফিসের সকল কর্মকর্তা ও তথ্য দানকারী সবাইকে তথ্য দিয়ে সহযোগিতা করার জন্য ধন্যবাদ জানিয়ে বিদায় নিয়ে হোটেলে ফিরলাম।

বিকাল আনুমানিক পাঁচটা নাগাদ আমার মোবাইল ফোনে কল আসলো। আমি রিসিভ করে ছালাম দিয়ে পরিচয় জানতে চাইলাম। অপর প্রান্ত থেকে শান্তভাবে নমস্কার দিয়ে বললেন, স্যার আমি বিউটি রানী পাল, প্রধান শিক্ষিকা পিটাইটিকর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়। আমি শিক্ষা অফিসার স্যারের কাছ থেকে আপনার মোবাইল নম্বর পেয়ে কল করেছি। আমিও স্বভাব সূলভ ভঙ্গিমায় ধন্যবাদ দিয়ে বললাম, আপনি ফোন করে ভালোই করেছেন। আমি আগামীকালই আপনার স্কুলে সকাল নয়টা নাগাদ পৌঁছাবো। তিনি সিলেট টু ফেঞ্চুগঞ্জ সড়কের একটা বাসস্ট্যান্ডের নাম বলে জানালেন, আমি আপনার জন্য বাসস্ট্যান্ডের বামপাশে সিএনজি নিয়ে অপেক্ষা করবো। সিলেটে যখন সিএনজিতে উঠবেন, তখন আমার এই নম্বরে কল করে চালককের হাতে দিবেন। তারপর কোথায় নামতে হবে আমি ঠিক চালককে বলে দিবো। বললাম এসবের কোন প্রয়োজন নেই, আমি ঠিক নিজের মতো করেই পৌঁছে যাবো। তিনি জানালেন, আমি আলাদা করে আপনার জন্য কোন সিএনজি ভাড়া করছি না। আমি একজন সন্তান সম্ভাব্য মা, নিজের স্বাস্থগত নিরাপত্তার কারণে প্রতিদিন রিজার্ভ সিএনজিতে যাতায়াত করি। আমি চাইনা আমাদের স্কুলে যেতে যানবাহনের বিড়ম্বনায় নাজেহাল হয়ে আপনার মনখারাপ হোক। স্কুল সময়ে আমরা সবাই হাসিখুশি থাকার চেষ্টা করে থাকি । দয়া করে কোন আপত্তি করবেন না। আমি উচ্ছ্বসিত মনে রাজি হয়ে, কর্মপরিকল্পনা অনুযায়ী পরদিন সকালে লাল বাজারে চা-নাস্তা সেরে রওনা দিলাম। সিলেট থেকে ফেঞ্চুগঞ্জে সিএনজির এক সিটের ভাড়া পঞ্চাশ টাকার যাত্রী হয়ে বসে রইলাম। কিছুক্ষণের মধ্যে আরো চারজন যাত্রী উঠে পূর্ণ হলো। কথা অনুযায়ী আমি বিউটি রানী পালের মোবাইল ফোনে কল করে চালককে ধরিয়ে দিলাম। ঠিক সাড়ে আটটার মধ্যে উল্লিখিত বাসস্ট্যান্ডে পৌঁছে চালক আমাকে নামতে বললেন। আমি নেমে ভাড়া পরিশোধ করে তাকাতেই বিউটি রানী পাল খয়েরি রঙের সানগ্লাস খুলতে খুলতে সহাস্যে এগিয়ে এসে নমস্কার দিয়ে আমার হাতে থাকা ছোট ব্যাগ নিজের হাতে নিয়ে তার চালকের হাতে দিলেন। কুশলাদি জানলেন, আসতে কোন সমস্যা ছিল কি-না সেটাও জেনে নিলেন। এবার তাহলে যেতে যেতে আপনার সবকথা শুনবো, বলেই নিজেদের সিএনজিতে নিয়ে বসালেন। সিএনজি চলতে চলতে সংক্ষিপ্ত আকারে কিছু গণ্যমান্য ব্যক্তিবর্গের উপস্থিতি নিয়ে কথা হয়। অতঃপর আমরা ঠিক সময়ে স্কুল আঙ্গিনায় পৌঁছে যাই। অল্প জায়গার মধ্যে পরিস্কার পরিচ্ছন্ন একটা প্রাইমারী স্কুল। কারো মধ্যে কোন প্রকার তারাহুরো বা এলোমেলো কাজ করছে না। হেড ম্যাডাম এলাকার কিছু অবিভাবক, জনপ্রতিনিধি ও শিক্ষকদের সাথে পরিচয় করিয়ে দিলেন। লোকদেখানো হাঁকডাক নাই, সুশৃঙ্খল ও প্রাণবন্ত স্কুল প্রাঙ্গন। কিছুক্ষণের মধ্যেই উৎসবমুখর পরিবেশে জাতীয় সংগীত ও শরীর চর্চা শুরু হলো। হেড ম্যাডামের আহবানে আমিও শিক্ষক সারিতে পাশাপাশি গিয়ে দাঁড়ালাম। শিক্ষার্থীদের খালি গলায় জাতীয় সংগীত শুনে মুগ্ধ হয়ে ভাবলাম, আহা আমার সন্তানদের যদি এই স্কুলে পড়াতে পারতাম! স্কুলের মতো স্কুল চলছে, আমার কাজও বসে নেই। প্রত্যেকটা আইটেম অবজারভেশন করে প্রমান হিসাবে ছবি তুললাম। হেড ম্যাডামের সাক্ষাৎকারে জিজ্ঞাসা করলাম, প্রকল্প সংশ্লিষ্ট উন্নয়নে সিদ্ধান্তের বিষয়ে কমিটির সাথে আপনার মতানৈক্য বা মতপার্থক্য হয় কি-না।
তিনি সাবলীলভাবে বলতে লাগলেন, শিক্ষক অবিভাবক ও কমিটি, আমরা সবাই মিলে একটিমে কাজ করি। মিটিং বা আলোচনায় মতপার্থক্য তো থাকবেই এটাই স্বাভাবিক। মতপার্থক্য যদি নাই থাকে তাহলে কমিটি কেন?মতপার্থক্য আছে বলেই সিদ্ধান্তের জায়গায় আমরা স্বচ্ছ থাকি। আমাদের জবাবদিহি করতে হয়, এটাই গনতান্ত্রিক রীতিনীতি। সর্বপরি সময়ের প্রতি গুরুত্ব দিয়ে, আমাদের কথা ও কাজের সমন্বয় থাকে। মিটিংয়ে প্রস্তাব বা মতপ্রকাশের স্বাধীনতা সবার থাকে। আলোচনা শেষে সংখ্যা গরিষ্ঠের মতামতে নিজের পছন্দ বিসর্জন দিতে মনখারাপ হলেও মেনে নিয়ে ঐক্যবদ্ধ থাকি।
কাজ করতে করতে স্কুল বিরতির সময় চলে আসে। হেড ম্যাডাম দুপুরের খাবারের জন্য সবাইকে অনুরোধে ডেকে নিলেন। দুইটা টিফিন ক্যারিয়ার ভর্তি খাবার নিজহাতে টেবিলে সাজিয়ে, প্লেট নিয়ে বসার অনুরোধ করলেন। তিনি আগে থেকেই জানতেন, স্কুল এলাকায় তখন কোন খাবার হোটেল ছিল না। তাই তিনি বাড়ি থেকে নিজহাতে তাঁর পছন্দের দেশী মাছমাংস রান্না করে সাথে নিয়ে এনেছেন। অন্য শিক্ষকেরাও আগের মতোই বাড়ি থেকে দুপুরের খাবার নিয়ে এসেছিলেন। আমরা সবাই মিলে খাবার খেতে বসলাম। তিনি সবাইকে খাবার পরিবেশন করে, তারপর নিজের প্লেট নিয়ে আমাদের সাথে বসলেন। এভাবেই নিজের বাড়ির মতো সবাই মিলে তৃপ্তির সাথে খাবার শেষ করি। আমার কাজও শেষের দিকে চলে আসে, সাথে বিদায়ের সময়ও।
আমি অবাক বিষ্ময়ে দেখলাম, বুদ্ধিমত্তায় বিচক্ষণ, ধৈর্য্য ও সহনশীল, অকৃত্রিম আচরণ ও মানবিক মুল্যবোধে বিশ্বাসী উদারচিন্তার একজন তুখোড় পরোপকারী সংস্কৃতি মনা শিক্ষিকা। বিদায় নেবার পালা ঘনিয়ে আসে। তিনি তার রিজার্ভ সিএনজি চালককে ফোন করে ডাকলেন। আমাকে মেইন রাস্তার সিলেটের সিএনজিতে তুলে দিয়ে তারপরে চলে আসার নির্দেশ প্রদান করলেন। আমাকে বললেন, অন্য কোন কাজেও যদি কখনো সিলেটে আসেন, তাহলে আমাদের এই স্কুলটা দেখে যাবেন। হোটেলে নিরাপদে পৌঁছামাত্র আমাকে একটু ফোনকলে জানাবেন।
সারাদিনের অবজারভেশনে দেখলাম, তিনি শুধু একটা স্কুল নয়, গোটা শিক্ষা ব্যবস্থাই ঢেলে সাজানোর সামর্থ্য রাখেন!