
কাকন রেজা :
বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী কোন দেশ সফর করবেন, কখন করবেন, এটা একান্তই বাংলাদেশের নিজস্ব ব্যাপার। এখানে জোরজবরদস্তির কোনো জায়গা নেই। কিন্তু ভারতের সাউথব্লক তারেক রহমানকে ভারত নিতে রীতিমত জোরজবরদস্তি শুরু করেছে। সাথে লেলিয়ে দেয়া হয়েছে ভারতীয় কূটনীতিকদের। তারা রীতিমত কখনো হুমকির সুরে, কখনো লোভ দেখানোর ছন্দে কথা বলছেন। বীনা সিক্রি, রিভা গাঙ্গুলীসহ অন্যরাও একই সুরে কোরাস ধরেছেন।
বীনা সিক্রি তো রীতিমত সময় বেঁধে দিয়ে বলেছেন, ‘তারেক রহমানের হাতে সময় খুবই কম’। শুধু এই কথাটুকু যদি ধরি, তাহলে বিষয়টি রীতিমত ‘যুদ্ধ লাগানিয়া’ হয়ে দাঁড়ায়। কেন, আরও ছয় মাস পরে যদি তারেক রহমান ভারত সফরে যান, তাহলে কী হবে, তারেক রহমান কি নাই হয়ে যাবেন, কিংবা প্রধানমন্ত্রী থাকবেন না? বীনা সিক্রি বাংলাদেশে ভারতের হয়ে দায়িত্ব পালন করেছেন। কূটনৈতিক হিসেবে তিনি অভিজ্ঞ, এটা কি কূটনীতির কোনো ভাষা! তিনি আবার উল্টো কূটনৈতিক শিষ্টাচারের কথা বলছেন। বলছেন, প্রত্যর্পণের শর্ত নাকি অপ্রয়োজনীয় এবং কূটনৈতিক শিষ্টাচার বহির্ভূত এবং অনুপযুক্ত। হায় খালিদ, যিনি নিজে একটি স্বাধীন দেশের প্রধানমন্ত্রীকে সময় বেঁধে দেয়ার মতন চরম অকূটনৈতিক ভাষা প্রয়োগ করতে পারেন, তিনিই আবার অন্যকে কূটনৈতিক শিষ্টাচার শেখাতে চান, কী আজিব!
দিল্লি থেকে প্রকাশিত ‘দ্য ট্রিবিউন’ এর বাংলাদেশি ‘টুইন’ ভারতীয় আরেক কূটনৈতিক বিদ্যা ভূষণ সোনি’জিকে উদ্ধৃত করে জানালো, তারেক রহমান ভারত না এলে নাকি সব যোগাযোগ আর সুযোগ বন্ধ হয়ে যাবে। চলুন দেখা যাক সুযোগগুলো মূলত কার। আদানি’র বিদ্যুৎ নিচ্ছে বাংলাদেশ। আদানি’র সাথে চুক্তিটা হলো বিগত পলাতক সরকারের। প্রচলিত মূল্যের অধিক দিয়ে আদানি থেকে বিদ্যুৎ নিচ্ছে বাংলাদেশ। প্রশ্ন করতে পারেন, তাহলে না নিলেই হয়, তারেক সরকার কেন নিচ্ছে? উত্তরটা দিই। বিগত পলাতক সরকার আদানি’র সাথে যে চুক্তি করেছে, তাতে নির্দিষ্ট পরিমাণ বিদ্যুৎ নিতেই হবে বাংলাদেশকে। না নিলে ক্যাপাসিটি চার্জ দিতে হবে। এই চুক্তির মেয়াদকাল ২৫ বছর। চুক্তি বাতিল করলে বাংলাদেশ সরকারকে আদানি’র বিদ্যুৎ কেন্দ্র নির্মাণে যে পরিমাণ অর্থ ব্যয় হয়েছে সেই পরিমাণ ক্ষতিপূরণ দিতে হবে। এই চুক্তি থেকে বেরিয়ে যাবার অন্যকোনো রাস্তা খোলা নেই। এই যে ডিজেল আসছে ভারত থেকে, এটাও নিতে বাধ্য করেছে বাংলাদেশকে দিল্লির সাউথব্লক এবং তা একই রকম চুক্তির মাধ্যমে। সুতরাং, এই সুযোগ কার, ভারত না বাংলাদেশের? ভারতীয় কূটনীতিকরা কথা বলার সময় যদি নিজেদের চেহারাটা আয়নায় দেখতেন তাহলে ভালো হতো।
এখন আসি আসল কথায়। চব্বিশের জুলাই বিপ্লব পরবর্তী বাংলাদেশকে নিয়ে ভারতের প্রকৃত অস্বস্তিটা কোথায়। ড. ইউনূসের অন্তর্বর্তীকালীন সরকার মূলত এই অস্বস্তিটা সৃষ্টি করে দিয়ে গেছে। তুরস্ক, সৌদি-আরব ও পাকিস্তান ২০২৬ এর আগস্টে মক্কাতে বসে একটি প্রতিরক্ষা চুক্তি করেছে। বলতে পারেন ন্যাটো’র মতন একটি ইসলামী জোটের সৃষ্টি হয়েছে এই চুক্তির মাধ্যমে। এই চুক্তি অনুযায়ী আওতাভূক্ত কোনো দেশ আক্রান্ত হলে, চুক্তিবদ্ধ প্রতিটা দেশ আক্রান্ত দেশের পাশে দাঁড়াবে। শুধু তাই নয়, হামলা হলে সেই হামলা প্রতিটি দেশের উপর হামলা বলে গণ্য করা হবে। ড. ইউনূস এই জোটের সাথে বাংলাদেশকে অন্তর্ভূক্ত করার একটি প্রক্রিয়া করে গেছেন, সম্ভবত এমনটাই মনে করে সাউথব্লক। এবং তাদের অস্বস্তিটা সেখান থেকেই। হয়তো সেকারণেই প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকে ভারত নেয়ার জন্য তারা এতটা উদগ্রীব। এমন কথাও বলা হচ্ছে সাউথব্লকের তরফ থেকে যে, অভাবনীয় সম্মান অপেক্ষা করছে তারেক রহমানের জন্য এবং অভাবনীয় সুবিধাও। আর একই কারণে সাউথব্লক এবং তাদের বাংলাদেশের অনুগামীরা ড. ইউনূসের উপর এতটা ‘বিলা’ হয়ে আছে। এদের কেউ কেউ তো ড. ইউনূসকে গালি দেয়ার সামান্যতম সুযোগও নষ্ট করে না।
তিন দেশের এই জোটকে স্বাগত জানিয়েছে খোদ যুক্তরাষ্ট্র। ফলে অস্বস্তিটা আরও বেড়েছে ভারতের। অন্যদিকে কথা চাউর রয়েছে তুরস্কের সহযোগিতায় বাংলাদেশ ড্রোন উৎপাদনে যাচ্ছে। সেই প্রতিরক্ষা চুক্তির আরেকটি ক্লজ হচ্ছে প্রতিরক্ষা শিল্পে সহযোগিতা। এই সহযোগিতার মধ্যে রয়েছে, ড্রোন ও মনুষ্যবিহীন যুদ্ধাস্ত্র তৈরি, প্রযুক্তি বিনিময়। আরও রয়েছে কৌশলগত সমন্বয়। তারমধ্যে রয়েছে প্রতিরক্ষা ও পররাষ্ট্রমন্ত্রী এবং সাথে সেনাপ্রধানদের সহযোগে কৌশলগত ডিজাইন খোঁজা। সম্প্রতি বাংলাদেশের সেনাপ্রধানও তুরস্ক সফর করে এসেছেন। সুতরাং সাউথব্লকের অস্বস্তি না বাড়ার কোনো কারণ নেই। সুতরাং যে কোনো কিছুর বিনিময়েই বাংলাদেশকে এই জোটে যুক্ত হতে বাঁধা দেবে ভারত। এখানে শেখ হাসিনা কিংবা শহিদ হাদি’র খুনিরা খুব বড় ফ্যাক্টর নয়। বড় ফ্যাক্টর শুধু আমাদের দেশের গাধামার্কা কিছু সিনিয়র বিশেষণধারী সাংবাদিক আর বুদ্ধিজীবীদের কাছে।
এখন বলি, তিন দেশের এই জোটের সম্ভাবনার কথা। সৌদি-আরবের রয়েছে অর্থ আর জ্বালানির ভাণ্ডার। তুরস্কের রয়েছে সর্বাধুনিক যুদ্ধাস্ত্র তৈরির সক্ষমতা এবং ন্যাটোর দ্বিতীয় বৃহত্তম সেনাবাহিনী। পাকিস্তানের রয়েছে পরমাণু শক্তি এবং সামরিক জনবল। সবমিলিয়ে এই জোট যে কারো জন্যই ভয়ের কারণ। তার উপর যুক্তরাষ্ট্রের সায় রয়েছে এই জোটের প্রতি। আর যুক্তরাষ্ট্রের সাথে ভারতের সম্পর্ক এ যাবতকালের সবচেয়ে খারাপ। রাশিয়া থেকে এখনও সবচেয়ে বেশি তেল কিনছে ভারত। রাশিয়ার ডলারের মূল উৎস হচ্ছে তারা। সুতরাং যুক্তরাষ্ট্রের সাথে সম্পর্ক ভালো হবার সম্ভাবনাও কম। এ অবস্থায় ভারতকে অনেকটাই কোনঠাসা বলা যায়। গ্লোবাল পলিটিক্সের বর্তমান পরিস্থিতিতে ভারত অনেকটাই ল্যাংড়া ঘোড়া। ফলে বাধ্য হয়েই ভারত পুরোপুরি চাণক্যনীতি নির্ভর হয়ে পড়েছে। ষড়যন্ত্র যে নীতির প্রধানতম অংশ।
এ বিষয়গুলো ধরতে পেরেই হয়তো তারেক রহমানের সরকার স্মার্ট কূটনীতিটা প্রয়োগ করেছে। এই স্মার্ট কূটনীতিতে খুনিদের প্রত্যর্পণের শর্ত একটি মারাত্মক কৌশল। অনেকে ভাবছেন, খুনিরা একটা বড় ফ্যাক্টর হয়ে দাঁড়িয়েছে দুই দেশের সম্পর্কের মধ্যে। না জনাব, আপনাদের এই ধারণা ভুল। খুনিরা শুধু গ্লোবাল পলিটিক্সের সামান্য ঘুটিমাত্র। পেয়াদা বলতে পারেন। এদের দিয়েই রাজা মাত এর চালটা দিয়েছে তারেক সরকার। এনিয়ে আর কথা বাড়াচ্ছি না, বাড়ানোটা সঙ্গত নয় বলে। শুধু এটুকু বলি, ‘আক্কেল মান্দকা লিয়ে ইশারা কাফি’।
তবে, দিল্লির সাউথব্লক যদি বাড়াবাড়ির মাত্রাটা বাড়ায়, তাহলে হয়তো বাংলাদেশকে আনুষ্ঠানিক ভাবেই তিন দেশের প্রতিরক্ষা জোটে যোগ দিতে হতে পারে। দেয়া উচিতও। তখন বন্ধুর বদলে প্রভু হবার সাধ আজন্মের জন্য অপূর্ণ থেকে যাবে ভারতের। বাংলাদেশকে দেখতে হবে সমমর্যাদা এবং সমশক্তির চোখে।
লেখক – কবি, সাংবাদিক, কলামিস্ট