[bangla_day], [bangla_time], [bangla_date]

[bangla_day], [bangla_time], [bangla_date]

হোম খবর

ঢাকার চার নদীর মরণ-চিকিৎসার খতিয়ান: প্রতিদিন সাড়ে ৪ হাজার টন বর্জ্য আর ৫৭ লাখ গ্যালন বিষের দায় কার?

শেয়ার: https://www.timebulletin24.com/news/tw30tn

টাইম বুলেটিন ২৪

তারিখ: ১১ জুন, ২০২৬

রাজধানী ঢাকাকে একসময় বলা হতো প্রাচ্যের ভেনিস। চারপাশ থেকে নদী দিয়ে ঘেরা এমন সুনিপুণ প্রাকৃতিক ভূখণ্ড পৃথিবীতে বিরল হলেও এখন সেই আশীর্বাদই অভিশাপ হয়ে দাঁড়িয়েছে। বুড়িগঙ্গা, তুরাগ, বালু ও শীতলক্ষ্যা নদী এখন পরিণত হয়েছে বিষাক্ত নর্দমায়। পরিবেশ অধিদপ্তরের সাম্প্রতিক এক ভয়াবহ সমীক্ষায় উঠে এসেছে যে, প্রতিদিন রাজধানীর চারপাশের নদীগুলোতে প্রায় সাড়ে চার হাজার টন কঠিন বর্জ্য এবং ৫৭ লাখ গ্যালন বিষাক্ত তরল পানি গিয়ে পড়ছে। এই পরিসংখ্যান কেবল পরিবেশগত বিপর্যয় নয়, বরং একটি পুরো সভ্যতার সম্মিলিত আত্মহত্যার চিত্র ফুটিয়ে তোলে।

এটি নির্দেশ করছে যে ঢাকা শহরে প্রতিদিন উৎপন্ন হওয়া ২,০০০ মিলিয়ন লিটার সুয়ারেজ বা পয়ঃবর্জ্য এবং ১,৩০০ মিলিয়ন লিটার শিল্পকারখানার বর্জ্যের বিশাল একটি অংশ শোধন ছাড়াই সরাসরি ঢাকার লাইফলাইন বুড়িগঙ্গা ও তুরাগে গিয়ে পড়ছে।
ডান পাশের গ্রাফ (কঠিন বর্জ্য): প্রতিদিনের মোট উৎপাদিত বর্জ্যের (প্রায় ১১,৫০০ টন) মধ্যে সিটি কর্পোরেশন গড়ে মাত্র ৭,০০০ টন সংগ্রহ করতে পারে। বাকি প্রায় ৪,৫০০ টন অবর্জ্য বা প্লাস্টিক যত্রতত্র ড্রেন ও নদীর পরিবেশ নষ্ট করছে।

পরিবেশ অধিদপ্তরের তথ্য গভীরভাবে বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, প্রতিদিন নদীগুলোতে অপচনশীল প্লাস্টিক, পলিথিন ও গৃহস্থালির ভারী বর্জ্য ফেলার পরিমাণ ক্রমাগত বাড়ছে। এর চেয়েও মারাত্মক সংকট তৈরি করছে প্রতিদিনের ৫৭ লাখ গ্যালন বিষাক্ত পানি। ট্যানারি, টেক্সটাইল ডাইং, ওয়াশিং প্ল্যান্ট এবং বিভিন্ন ভারী শিল্পের রাসায়নিক মিশ্রিত এই পানি কোনো ধরনের শোধন ছাড়াই সরাসরি মিশছে নদীতে। ফলস্বরূপ, পানিতে দ্রবীভূত অক্সিজেনের মাত্রা অনেক আগেই শূন্যের কোঠায় নেমে গেছে, যা কোনো জলজ প্রাণীর বেঁচে থাকার জন্য মোটেও উপযোগী নয়।

বিগত দুই দশকে ঢাকার নদী বাঁচাতে এবং দূষণমুক্ত করতে ওয়াটার ট্রিটমেন্ট প্ল্যান্ট এবং হাজারীবাগ ট্যানারি স্থানান্তরের মতো হাজার হাজার কোটি টাকার মেগা প্রকল্প হাতে নেওয়া হয়েছে। তবে বাস্তব চিত্রে দেখা যায় যে, আইন অনুযায়ী শিল্পকারখানায় বর্জ্য শোধনাগার বা ইটিপি থাকা বাধ্যতামূলক হলেও অধিকাংশ কারখানাই খরচ বাঁচাতে তা বন্ধ রাখে। এর সাথে যুক্ত হয়েছে বিআইডব্লিউটিএ, ওয়াসা, সিটি কর্পোরেশন এবং পরিবেশ অধিদপ্তরের মধ্যকার তীব্র সমন্বয়হীনতা। মাঝে মাঝে লোকদেখানো উচ্ছেদ অভিযান চালানো হলেও প্রভাবশালী নদীখেকোরা আবার ভুয়া কাগজপত্র তৈরি করে নদী ও তীর দখল করে নেয়।

এই ৫৭ লাখ গ্যালন বিষাক্ত পানি শুধু জলজ পরিবেশ ধ্বংস করছে না, বরং তা ঢাকার ভূগর্ভস্থ পানির স্তরেও মারাত্মকভাবে বিষ ছড়াচ্ছে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার নির্ধারিত সীমার চেয়ে কয়েক গুণ বেশি সিসা, ক্যাডমিয়াম এবং ই-কোলাই ব্যাক্টেরিয়ার উপস্থিতি পাওয়া গেছে এই নদীগুলোর পানিতে। এই বিষাক্ত পানি কৃষি জমিতে গিয়ে শেষ পর্যন্ত মানবদেহের খাদ্যশৃঙ্খলে প্রবেশ করছে। যার ফলে রাজধানী ও আশপাশের মানুষের মধ্যে ক্যানসার, কিডনি বিকল এবং চর্মরোগের মতো মারাত্মক ব্যাধি জ্যামিতিক হারে বৃদ্ধি পাচ্ছে।

বাম পাশের চার্ট (কঠিন বর্জ্য): ঢাকার দৈনিক কঠিন বর্জ্যের সিংহভাগই জৈব বা পচনশীল বর্জ্য (৬৮.৩%)। তবে উদ্বেগের বিষয় হলো ১৩.৪% প্লাস্টিক বর্জ্য, যা অপচনশীল হওয়ায় ড্রেন ও নদীর তলদেশে স্থায়ীভাবে জমা হয়ে স্থায়ী পরিবেশ বিপর্যয় ডেকে আনছে।
ডান পাশের চার্ট (তরল বর্জ্য): দৈনিক উৎপাদিত মোট তরল বর্জ্যের ৬০.৬% গৃহস্থালির পয়ঃবর্জ্য এবং ৩৯.৪% শিল্পকারখানার বিষাক্ত রাসায়নিক বর্জ্য। এই দুইয়ের মিশ্রণই ঢাকার চারপাশের নদীগুলোকে পুরোপুরি দূষিত করে ফেলছে।

নদী বাঁচানো এখন আর শুধু পরিবেশবাদীদের শখের স্লোগান নয়, এটি ঢাকার আড়াই কোটি মানুষের টিকে থাকার লড়াই। এই বিপর্যয় ঠেকাতে রাষ্ট্রকে অবিলম্বে জিরো টলারেন্স নীতি গ্রহণ করতে হবে। যেসব শিল্পকারখানা ইটিপি ছাড়া বর্জ্য ফেলছে, সেগুলোকে চিরতরে সিলগালা করে পরিবেশ ধ্বংসের জন্য ফৌজদারি অপরাধে বিশাল অঙ্কের জরিমানা করা জরুরি। একই সাথে ঢাকা ওয়াসা এবং সিটি কর্পোরেশনের ড্রেনেজ লাইন সরাসরি নদীতে সংযুক্ত করা বন্ধ করে শতভাগ পানি পুনর্ব্যবহারযোগ্য করার ব্যবস্থা করতে হবে। নদী রক্ষার দায়িত্ব বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের অধীনে বিভক্ত না রেখে একটি স্বাধীন, ক্ষমতাসম্পন্ন ও অরাজনৈতিক একক নদী নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষ গঠন করা প্রয়োজন, যাদের হাতে অবৈধ দখলদারদের তাৎক্ষণিক সাজার ক্ষমতা থাকবে।

একটি শহর তার আকাশচুম্বী অট্টালিকা দিয়ে আধুনিক হতে পারে না, যদি তার ফুসফুস ও ধমনী রূপী নদীগুলো বিষাক্ত হয়ে পড়ে। প্রতিদিনের এই বিপুল পরিমাণ বর্জ্য আসলে বুড়িগঙ্গা বা তুরাগের বুকে নয়, আঘাত করছে বাংলাদেশের অর্থনীতির মূল কেন্দ্র ঢাকার অস্তিত্বে। আইন ও প্রকল্পের ফাইলবন্দি টেবিল থেকে বেরিয়ে এসে এখনই কঠোর রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক ব্যবস্থা নেওয়া না হলে অচিরেই ঢাকা বিশ্বের অন্যতম এক মৃত মেগাসিটিতে পরিণত হবে। সময় দ্রুত ফুরিয়ে যাচ্ছে এবং প্রকৃতির এই নির্মম প্রতিশোধ ঢাকার পুরো নাগরিক জীবনকে পঙ্গু করে দিতে পারে।


মন্তব্য করুন

আপনার ইমেইল প্রকাশ করা হবে না। * চিহ্নিত ঘরগুলো আবশ্যক।

শেয়ার করুন