
ঢাকা, ১৭ আগস্ট ২০২৬ — ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির আমন্ত্রণে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সম্ভাব্য ভারত সফরের আগে ঢাকা থেকে কয়েকটি শর্তের কথা বলা হয়েছে। ভারতীয় গণমাধ্যমগুলোতে এই শর্তগুলোকে দ্বিপক্ষীয় আলোচনার ক্ষেত্রে কঠিন পূর্বশর্ত হিসেবে তুলে ধরা হয়েছে।
সোমবার ভারতের শীর্ষস্থানীয় সংবাদমাধ্যমগুলোতে এ সংক্রান্ত সংবাদ প্রাধান্য পায়। টাইমস অব ইন্ডিয়া তাদের প্রতিবেদনে শিরোনাম করে “বাংলাদেশ সেটস টাফ রাইডারস ফর পিএম তারেক রহমান’স ভিজিট টু ইন্ডিয়া”, আর ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস-এর শিরোনাম ছিল “সেন্ড শেখ হাসিনা ব্যাক: বাংলাদেশ’স ‘রেড লাইন’ ফর পিএম রহমান’স ভিজিট”।
টাইমস অব ইন্ডিয়া-র প্রতিবেদনে দাবি করা হয়, দেশের ভেতরে কট্টরপন্থী গোষ্ঠী এবং জামায়াতে ইসলামীর মিত্র জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) ক্রমবর্ধমান চাপের মুখেই ঢাকা এই কঠোর অবস্থান নিয়েছে। ঢাকার মূল দাবিগুলোর মধ্যে রয়েছে—সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাসহ অন্যান্য পলাতক অপরাধীদের দ্রুত প্রত্যর্পণ এবং এই রাষ্ট্রীয় সফরের জন্য একটি “সহায়ক পরিবেশ” তৈরিতে নয়াদিল্লির কার্যকর ভূমিকা।
প্রতিবেদনে কূটনৈতিক পর্যবেক্ষকদের বরাতে বলা হয়, সরকারের এই দৃঢ় অবস্থান অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক চাপ ও বিরোধী পক্ষগুলোর দাবির প্রতিফলন। বিশেষজ্ঞদের মতে, বাংলাদেশের দেওয়া এসব শর্তের প্রকৃতি ভারতের জন্য কূটনৈতিক ও আইনি প্রক্রিয়ার দিক থেকে তাৎক্ষণিকভাবে পূরণ করা বেশ চ্যালেঞ্জিং।
ভারত সরকারের একাধিক সূত্র টাইমস অব ইন্ডিয়া-কে নিশ্চিত করেছে যে, দ্বিপক্ষীয় সফর এবং আসন্ন ব্রিকস সম্মেলন—দুই ক্ষেত্রেই প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকে দেওয়া নিমন্ত্রণ বহাল রয়েছে। নয়াদিল্লি জানিয়েছে, দ্বিপক্ষীয় সফরের সময়সূচি চূড়ান্ত করার বিষয়টি এখন সম্পূর্ণভাবে ঢাকার সিদ্ধান্তের ওপর নির্ভর করছে।
ভারত সরকার প্রাথমিকভাবে ২১ আগস্টকে দ্বিপক্ষীয় সফরের সম্ভাব্য তারিখ হিসেবে প্রস্তাব করেছিল। এছাড়া আগামী ১২-১৩ সেপ্টেম্বর নয়াদিল্লিতে অনুষ্ঠিত হতে যাওয়া ব্রিকস সম্মেলনে অংশ নিতে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকে আমন্ত্রণ জানিয়েছেন নরেন্দ্র মোদি। তবে বাংলাদেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সর্বশেষ বিবৃতির পর চলতি মাসে প্রস্তাবিত দ্বিপক্ষীয় সফরটি কার্যকর অর্থে স্থগিত হয়ে গেছে বলে ভারতীয় গণমাধ্যমগুলো জানিয়েছে।
ভারতের কূটনৈতিক সূত্রগুলো বাংলাদেশের রাজনৈতিক দল বিএনপি-র নেতাদের পূর্ববর্তী বক্তব্যের কথা স্মরণ করিয়ে দিয়ে বলে, বিএনপি নেতারা আগে জানিয়েছিলেন শেখ হাসিনার বিষয়টি দুই দেশের সামগ্রিক সম্পর্ক এগিয়ে নেওয়ার পথে বাধা হবে না; বিশেষ করে বাণিজ্য, জ্বালানি ও পানিবণ্টনের মতো গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্রগুলোতে। আর শেখ হাসিনাকে ফেরত পাঠানোর অনুরোধের বিষয়ে ভারতীয় কর্মকর্তারা জানান, বিষয়টি তাদের দেশের প্রচলিত আইনি কাঠামো ও প্রক্রিয়া অনুযায়ী পরীক্ষা-নিরীক্ষা করা হচ্ছে।
রবিবার ঢাকায় এক সংবাদ সম্মেলনে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখ পাত্র এ কে এম শহীদুল করিম বাংলাদেশের অবস্থান পরিষ্কার করেন।
তিনি বলেন, “বাংলাদেশ ও ভারতের কর্মকর্তারা প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের ভারত সফরের সম্ভাবনা নিয়ে কয়েক সপ্তাহ ধরে আলোচনা করে আসছেন। আমরা মনে করি, এই সফরের জন্য একটি সহায়ক পরিবেশ তৈরি করা প্রয়োজন।”
দ্বিপক্ষীয় পরিবেশ বিনষ্টের কারণ উল্লেখ করে মুখপাত্র বলেন, মানবতাবিরোধী অপরাধের দায়ে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে দণ্ডিত সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা গত ৫ আগস্ট নয়াদিল্লিতে প্রকাশ্যে সংবাদ সম্মেলন করেছেন, যা এই প্রক্রিয়া ও পরিবেশের ক্ষতি করেছে।
এছাড়া, বাংলাদেশ সরকার ভারতীয় কর্তৃপক্ষকে শেখ হাসিনাকে দ্রুত প্রত্যর্পণের পাশাপাশি দ্বিপক্ষীয় প্রত্যর্পণ চুক্তির অধীনে শহীদ শরিফ ওসমান হাদি হত্যায় অভিযুক্ত ব্যক্তিদের বাংলাদেশে ফেরত পাঠানোর অনুরোধ জানিয়েছে।
পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র বলেন, “আমরা তাদের (ভারতের) উত্তরের অপেক্ষায় আছি।”
ভারতীয় প্রতিবেদনের রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা ইঙ্গিত দিয়েছেন যে, ঢাকার বর্তমান সরকার জ্বালানিসংকটসহ অভ্যন্তরীণ নানা সামাজিক ও অর্থনৈতিক চাপের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। শেখ হাসিনার প্রত্যর্পণ ইস্যুটি অমীমাংসিত থাকায় চলতি বছরের ডিসেম্বর পর্যন্ত দুই দেশের কূটনৈতিক সম্পর্কে একটি সাময়িক স্থবিরতা বা ধীরগতি সৃষ্টি হতে পারে বলে তারা ধারণা করছেন।