[bangla_day], [bangla_time], [bangla_date]

[bangla_day], [bangla_time], [bangla_date]

হোম সাহিত্য

স্মরণ : ঝরা মুকুল

শেয়ার: https://www.timebulletin24.com/news/i7k7zf

-কেকা অধিকারী


তখন আমি ফেসবুকে নিয়মিত নই। দীর্ঘ বিরতির পরে একাউন্ট খুলতেই দেখলাম ইনবক্সে বেশ কয়েকটা নতুন ম্যাসেজ। একটি ম্যাসেজের প্রেরকের নাম দেখে আমার অন্তর-আত্মা কেঁপে উঠল। মুকুল লিখেছে! কী করে সম্ভব? ঝাপসা চোখে, কাঁপা হাতে ওপেন করলাম বার্তাটি। একটি মাত্র বাক্য – ”দিদি, আমি ভালো আছি।” কবে লিখেছিল ও কথাটা? কতো দিন আগে?

ছেলেটা যে কী ভীষণ প্রাণবন্ত সেই কতো বছর আগে, অথচ মনে হয় এই তো সেদিন মটরসাইকেল নিয়ে এসে মুকল আমায় বলল, ‘দিদি, আপনার তো হোন্ডায় চড়ার শখ, চলেন ঘুরিয়ে আনি!’ আমি চড়ে বসলাম ওর পেছনে। অনভ্যাসের কারণে ভয়ে কুঁকড়ে যাওয়া আমাকে অভয় দিয়ে এগিয়ে চলল ও। আমরা ঘুরে এলাম মগবাজার চৌরাস্তা ছাড়িয়ে রমনা চার্চ পেরিয়ে আরো কোথায় কোথায়। কী যে আনন্দ পেয়েছিলাম আমি! আমার আনন্দ ওকেও ছুঁয়েছিল বোধ করি।

কত্ত বড় বড় কবিতা আবৃত্তি করতো মুকুল! ঝন্টুদা’র কাছে শিখতো গভীর মনোযোগে। অভিনয় করতো আমাদের সংগঠন এসসিএম-এর নাটকে। পরে ‘নাগরিক’-এও যোগ দিয়েছিল। কেমন এক আন্ত্মরিক সম্পর্কে জড়িয়ে ছিলাম আমরা। কখনো রাগতো না, অভদ্র আচরণ করতে দেখিনি কখনো। ভাইয়ের সাথে ব্যবসা করে দাাঁড়িয়ে গেল বেশ। বিয়ের দাওয়াত পেলাম একদিন। বিয়েটা খুব জাঁকজমকের সাথেই হয়েছিল, বউটা যে কী মিষ্টি ওর! নিউ প্রিয়াঙ্কা কমিউনিটি সেন্টারে সেদিন অনেক পুরোনো বন্ধু-বান্ধবের সাথে আড্ডা জমেছিল খুব।

তারপর হঠাৎই একদিন শুনলাম ‘মুকুল অসুস্থ’। বড় ভাই ওকে ব্যাংকক নিয়ে গেলেন চিকিৎসা করাতে। জানলাম ওর ক্যান্সার। পরে ভর্তি হয়েছিল স্কয়ার হাসপাতালে। একটা পর্যায়ে আমরা সবাই ওর সুস্থতার বিষয়ে অনেক বেশি প্রত্যাশা রেখেছিলাম। মুকুলও প্রাণপণ লড়ে যাচ্ছিল তবে সুস্থ হতে পারছিল না। তাই বলে ওকে হতাশ হতে বা মনোবল হারাতে দেখি নি কখনো। স্কয়ারের ফিজিওথেরাপিষ্ট জুবায়েরের মুখেও বিষ্ময় দেখেছি, ‘আজ পর্যন্ত্ম কোন রোগীর এমন মনের জোর দেখি নি!’

আমাদের সম্মিলিত ক্ষুদ্র সামর্থ আর আন্ত্মরিক প্রার্থনা নিয়ে চেষ্টা চালিয়েছিলাম ওকে সুস্থ করে তুলতে। সিআরপি’তে যখন ভর্তি ছিল একদিন দেখতে গেলাম। রোগী দেখার বদলে সকলে মিলে এক লম্বা আড্ডা দিয়ে ফিরে এলাম ঘরে। তবে বিদায় নেবার আগে হঠাৎ বন্ধু এলিসন বলেছিল ওর জন্যে প্রার্থনা করতে। মুকুলের জন্যে আমার হৃদয়-মুচড়ানো আবেগ আর ওর কেন এমন অসুখ হলো তা নিয়ে মাথার মধ্যে ঘুরপাক খাওয়া হাজারো প্রশ্ন মিলেমিশে বিধাতার কাছে কি শব্দাবলী হয়ে পৌঁছেছিল তা আর আজ মনে নেই। কিন্তু ওকে যে একটু হাসি আনন্দের সময় আমরা দেব বলে ওর কাছে গিয়েছিলাম, আমার প্রার্থনা বোধহয় তার কিছুটা ব্যাত্যয়ই ঘটিয়েছিল। পরে পিজি’তে থাকার সময়েও ওর মধ্যে কোন ‘রোগী রোগী’ ভাব দেখি নি। মুকুলের শিক্ষীকা স্ত্রী তখন স্কুল আর হাসপাতাল, হাসপাতাল আর স্কুল করে দিন পার করছে। একা লাগে বলে আমাকে আবারও হাসপাতালে ওকে দেখতে যাবার জন্যে বলল মুকুল। আমি বললাম, ‘যখন একা লাগবে তখন তো তুমি কবিতা লিখতে পার, জীবনকে যেমন দেখছো, অনুভব করছো লিখে ফেলতে পার সে কথা।’ সেই প্রথম ও শেষবার মুকুলকে শারীরিক সমস্যার কথা বলতে শুনেছিলাম, ‘বিশপ মন্ডলও এই একই কথা বলেছেন। কিন্তু দিদি, মাথাটা কেমন অস্থির লাগে, বেশি কিছু চিন্তা করতে পারি না।’ সত্যি বলতে কি ওকে দেখে কিন্তু তেমনটা মনে হয় নি আমার। মুখে বলেছিলাম, ‘কষ্ট হলে লিখবে না।’ মুকুল, তোমাকে সে দিন বলা হয় নি যে কথা- আমি আরেকটি কারণেও তোমাকে লিখতে বলতাম। আমার যে, বড্ড জানতে ইচ্ছা হতো তোমার মনের কথা, জানতে ইচ্ছা হতো মৃত্যুর মুখোমুখি দাঁড়িয়ে মানুষের ভাবনাগুলো কেমন হয়! মুকুল লিখলো না কিছু। অথবা লিখেছিল কি? আমি জানি না, ওর কোন লেখা আমার কাছে পৌঁছায়নি কোন দিন। শুধু ঐ একবার ছাড়া – ‘দিদি, আমি ভালো আছি।’

এক রাতে শেষ খবরটা শুনে শেষবারের মতো ওকে দেখতে গেলাম ওর বাসায়। দেখলাম বিছানায় শুয়ে আছে মুকুল। ঠিক যেন ঘুমিয়ে আছে একজন জলজ্যান্ত্ তরুণ। মাথা ভর্তি চুল তখনও ফ্যানের বাতাসে নড়ছে, স্বাস্থ্যও ততোটা খারাপ নয়। একটু যেন ক্লান্ত। তাই ক্লান্ত মুকুলকে নিরবিছিন্ন ঘুমের নিশ্চয়তা দিতে নেওয়া হল কুষ্টিয়ার বল্লভপুরে। মধ্য রাত্রে ওকে বিদায় দিয়ে ঘরে ফিরেছিলাম আমরা কয়েকজন।

এর মধ্যে পেরিয়ে গেছে কতোগুলি বছর। কিছুদিন আগে কর্মসূত্রে বিরিশিরির গ্রামে যেতে হয়েছিল। ওয়াইডাবিস্নউসিএ’র গেষ্ট হাউসে ঢুকতেই ক্যাম্পাসের ছোট্ট আম গাছটিতে চোখ পড়ল। ডালগুলি মুকুলে মুকুলে ভরে আছে। হাওয়ায় দুলে দুলে ওরা যেন আমাকে বারবার বলছিল,’দিদি, আমি ভালো আছি।’ ‘দিদি, আমি ভালো আছি।” কোথা থেকে এক হুহু বাতাস আমার সমস্ত সত্ত্বাকে বিমর্ষ করে দিল। আমাদের মুকুল ঝরে গিয়েছিল সুন্দরতম একটি দিনে – ১৬ই ডিসেম্বরে। অধিকতর কোন সুন্দর দিনে ও আর ফিরে আসবে না জানি। তারপরেও মুকুল ফিরে ফিরে আসে, আসে আমার মনে যখন তখন। আসলে ও আসে ফিরে না যাওয়ার বাস্তবতা নিয়ে, যায় না কোথায়ও, রয়ে যায় আমার হৃদয়ের গহীনে যেখানে অনবরত বাজে সেই সুর ‘এই উদাসী হাওয়ার পথে পথে মুকুলগুলি ঝরে; আমি কুড়িয়ে নিয়েছি…..’

মন্তব্য করুন

আপনার ইমেইল প্রকাশ করা হবে না। * চিহ্নিত ঘরগুলো আবশ্যক।

শেয়ার করুন