
হারুন রশিদ
কাচারিঘরের সামনের খৈলেনের দুই দিকে ধানের আটি গাদামারা। রাস্তার পাশে সটান লম্বা কাঠ বাদাম গাছের নীচে সদ্য মাড়ানো ধানের স্তুপ, মুরগীতে ঠোকরাচ্ছে আর চড়fইয়ের ঝাঁক নুতন ধানের স্বাদ নিচ্ছে। খৈলেনের পশ্চিম পাশে ঘানিঘর। চোখে ঠুলি আটা বড় দামড়া সাদা গরুটি জোয়াল কাঁধে অবিরাম ঘুরছে। টাটকা নারকেল তেলের মৌ মৌ গন্ধ। কার্তিকের প্রায় শেষ। দুপুরের সূর্য কিছুটা উত্তর দিক দিয়ে পশ্চিমে হামা দিচ্ছে।
একদল ছেলে মেয়ে খৈলেনে গোল হয়ে হাত ধরে নেচে নেচে ছড়া কাটছে।
এক বুড়ি পান খাতি খাতি বাজারে চলিলো।
বাজারে ছেলো পেয়াদা বেটা তাড়া কষিলো।
সেই তাড়া খায়ে বুড়ি গাছে
চড়িলো।
গাছে ছেলো ময়না পাখি ঠোকর
কষিলো
সেই ঠোকর খায়ে বুড়ি তলায়
পড়িলো।
তলায় ছেলো হীরের কাঁটা শিরেয় ফুটিলো
পরনে ছেলো ঢাকাই শাড়ি ছিড়ে গেইলো।

খেলা বাদ দিয়ে অদুদ চুপিসারে ঘানির পাশে যেয়ে ধামা থেকে কিছু শুখনো নারকেল নিয়ে দৌড়ে আসে। খেলা বাদ দিয়ে সবাই তাঁরে ঘিরে ধরে। সে সুখনো ফালিকরা নারকেল কয়েকজনকে দেয়। যারা পায়নি তাদের ভিতর থেকে রুহল অদুদকে ভয় দেখায় বলে মাঝেদুদু আসলি সব কয়ে দিবানে। তুই ঘাইন ভাঙানোর নারকেল আনে বিলিবাট করিছিস।
হোসেন শেখ গাঁ মাথায় ভাল করে সর্ষের তেল মাখতে মাখতে বাড়ির ভিতর থেকে বেরিয়ে আসেন। হাতে একটা পিতলের বদনা ।
– তিনি চেঁচিয়ে বলতে থাকেন বেলা পড়ে গেলো তোরা এখনও খেলতিছিস। কুড়ো পাখিতি ধান পান সব খায়ে গেলো, তোরা কিচ্ছু দেখিসনে। যা সব বাড়ির মধ্যি যা, ধলেবৌ তোগে পুকুরে নিয়ে গোসল করায় দেবেনে।
হোসেন সেখদের একান্নবর্তী পরিবার। সাতভাই দুইবোনের ভিতর তাঁর সেজো ভাই মারা গেছে জ্বরে বিগার উঠে। এক বোনের বিয়ে হয়েছে জাবুসায়। এখনো দুইভাই একবোনের বিয়ে বাকি। তাঁর একভাই খুলনায় থেকে সরকারি চাকরি করে। সে বিয়ে করেছে। কিন্তু তার ছেলে মেয়ে হয়না। হোসেন সেখের কিন্তু নয় ছেলেমেয়ে।
দুইবছর হচ্ছে তাঁর বৌ মারা গিয়েছে। মা হারা ছোট ছেলেমেয়েদের নিয়ে তাই ভাবনার অন্ত নেই। তাঁর বাবা গত হয়েছেন। বৃদ্ধা মা এখন সয্যাসায়ী।
হোসেন সেখকে দেখে সবাই চুপ মেরে দাঁড়িয়ে গেলো। কেউ আর নারকেলের ফালি মুখে নিয়ে মুখ নাড়ছেনা। নারকেল ফালির বিষয়ে কেউ নালিশও করছেনা।
– সব দাঁড়ায় আছিস ক্যান। তোরা আবার যায়ে খালে ঝাঁপাবিনে। অদুদ, খালেক, রুহল, জরিনা তোরা সব যা। আইয়ুব তুই খুল্লেরতে মামু বাড়ি আইছিস। তোর ইশকুল কী বন্দ?
– মামু ইশকুল বন্দ না। ছুটি নিয়ে মামীর সাথে আইছি।
আইয়ুব তাঁর বোনের বড়ছেলে। বাড়ি জাবুসায়। খুলনায় নোয়া মামার বাড়ি থেকে জেলা ইশকুলে পড়ে।
– তোগে খালি সারা দিন খেলা আর খেলা। আর খালে ঝাঁপাঝাঁপি ।
সব ছেলে মেয়েরা আতাবেড়া অতিক্রম করে দৌড়ে বাড়ির ভিতর চলে গেলো। গায়ে ধুলিমাখা ফাতেমা বাড়ির ভিতর না যেয়ে তার আব্বার কাছে এসে দাড়ায়।
– ও আব্বা কোয়ানে যাচ্ছ?
– বড় গাঙে।
– আমিও যাব।
– অতদূর তুমি যাতি পারবানা।
ফাতেমা এবার মাটিতে বসে পড়ে দুপা দাঁপিয়ে বলতে থাকে।
– না আমি যাব, আমি যাব। আব্বা আমারে নিয়ে চলো। আমি বড়োগাঙে ডুব দেব।
হোসেন শেখ ফাতেমাকে মাটি থেকে তুলে তার গায়ের ধুলা ঝেড়ে তাকে কাধে তুলে নেন। মা মরা মেয়ের বায়না তাঁকে কাবু করে ফেলে। ফাতেমাকে কাধে নিয়ে হাটতে থাকেন।
খাল পাড় ধরে তাঁরা চলছেন। খাল পারের সারি সারি আম গাছের সাথে বড় বড় কামারের তালা দেয়া নৌকার দল খালের কিনারে চিত মেরে শুয়ে আছে। কাচিপাতা নদীর দিকে তিনি চলছেন। নদীর নাম কাচিপাতা হলেও কালেভদ্রে কেউ এই নাম বলেনা। রণজিতের হুলোর ছাও-বুড়োরা অনেকেই এই নাম জানেনা। যারা নায়েবের কাছারি, ডিষ্ট্রিক্ট সেটেলমেন্ট অফিসে ঘোরফেরা করে তারা জানে। গ্রামের সবাই ডাকে বড়গাঙ। বড়গাঙ বলারও একটা কারন আছে। একটা উপনদী পশুর ও কাচিপাতাকে সংযুক্ত করেছে। উপনদীর কাচিপাতা দিকের সংযোগ স্থলে এপারের গ্রামের নাম রণজিতের হুলা অন্য পাড়ে কড়িয়া গ্রাম। আকারে ছোট হওয়ায় সবাই উপনদীটাকে বলে ছোটগাঙ। নদীটির আসল নাম নালুয়া। আসলে বড়গাঙ ও ছোটগাঙের আসল নাম এখন আর কেউ জানেনা।
কিছুদিন হলো খালের দু’পাশের মাটি কেটে বাধ দেয়া হয়েছে। বড়ান ধান কাটা হলে চাষ দিয়ে তিল, উচ্ছে, কুমড়োর ক্ষেত হবে। মাটি কাটাতে তিনি ও তার পরিবারের অনেকেই ছিলেন। সেখ গোষ্ঠিতে অনেক লোক। রণজিতের হুলা কেন সমগ্র বিরাট গ্রামে তারা একটি বড় গোষ্ঠী। তাদের বাড়িকে সবাই বলে বড়বাড়ি। বড় বাড়ির সন্মানও বেড়েছে। হোসেন সেখের একভাই হাবিবর রহমান এনট্রান্স পাশ করে খুলনা শহরে সরকারি চাকরিতে ঢুকেছে। আর এক ভাই মুজিবর এন্ট্রান্স ফেল দিয়ে গ্রামে ডাক্তারি বিদ্যা শুরু করেছে।
কাটাখালি খাল বান্ধা রয়েছে। এখন জোয়ার ভাটা হয়না। খাল পানিতে ভরা। পানিতে এখনও জাড় আসেনি। ম্যাদামারা সূর্যতাপে পানিও গরম হয়নি। খালের পানিতে কিছু ছেলেমেয়ে নাইতে নেমেছে। তারা ঝাঁপাঝাঁপি করছে, কেউ কেঊ ছুট ছুট খেলছে। ছোট মেয়েরা তাদের ছ্যাবট খুলে ছোট ছেলেদের সাথে মিলে খাল কিনারে ছ্যাবট টেনে নারুলি, ফেদি, কুচো চিংড়ি ও ছোট বাইন মাছ ধরছে। হোসেন সেখের এক চাচাতো ভাই খালের অপর পারে কোমরে খালুই বেধে জাল ক্ষেপন দিয়ে একটু নীচু হয়ে জাল টেনে তুলছে। জালের ঘাইলের ভিতর কী একটা মাছ দাপাদাপি করছে।
– ও মজিদ, কী মাছ বাধলো তোর?
– মাঝেভাই, শইল পড়িছে।
– তা তোর শইলতো ডাঙর আছে।
– না এইডা মাঝারি সাইজির, একটা পাতাড়ি পড়িলো তা লাফ মারে জ্বাল ছিড়ে বারোয় গেছে।
হোসেন সেখ বলতে থাকেন।
– বড় গাঙের কুমোরের ডাল উঠোতি হবে। আমাগে নজির, ছোমেদ ওরা গেছে জলমার হাটে, সন্ধ্যের আগে চলে আসবেনে। সন্ধ্যেকালে তুই কাচারি ঘরে আসিস । কুমোর তোলার ব্যাপারে কথা কতি হবে।
– কুমোর কবে উঠোবা?
– মিঞাভাই কইছে বিস্যুদবারের দিন।
– মাঝে ভাই গতবার কুমোরে যে কইয়েভোল মাছ পাইলাম তার ওজন কতো হইল যেন?
– ক্যান মাছ কাটে পালা পড়েনে মাপিলাম। দুইমন সাত সের হইলো। -এতো বড়মাছ ম্যালাদিন আমরা পাইনে।
– হয় এতোবড় মাছ আজকাল গাঙে আসেনা। ইস্টিমারের ভয়ে কইয়েভোল, জাভাভোল বড়্গাঙে আসেনা।
– মজিদ তুই কাচারিঘরে চলে আসিস।
ফাতেমার গায়ে ওজন হয়েছে, রং বেশ উজ্জল ফর্সা গোলগাল মুখ। তার মায়ের চেহারা অনেকটা পেয়েছে। তাঁর কাধ লেগে আসছে।
– ফাতেমা মাগো তুমি একটু নামো।
বাড়ির অনেকেই নাম সংক্ষিপ্ত করে ফতে বলে ডাকে। তবে হোসেন শেখ ফাতেমা বলেই ডাকেন। তখন একজন কারি সাহেব তাদের বৈঠকখানায় থেকে ছেলেমেয়েদের আমপারা কোরান কিতাব শিক্ষা দিতেন। বাড়ি ছিল তাঁর আফগান দেশের খোরাছানে। পশতু ভাষার লোক হলেও তিনি ভাঙ্গা ভাঙ্গা বাংলা রপ্ত করেছিলেন।
কারিসাহেব ফাতেমার জন্মের কয়েকদিন পর বললেন, এই হুসেনভাই আপনিতো রাসুলকা নাতি আছেন।
হোসেন সেখ একটু হেসে বলেন, হুজুর তাতো জানি আমার নাম হোসেন। কিন্তু নবীজির নাতিরা দুই ভাই ছিলেন কিন্তু আমরাতো সাতভাই দুই বোন।
– আরে হোসেন ভাই, উটা কুনো বিপারনা। আসল কুঠা হচ্ছে হুসেনেকা মার নাম কেয়া ?
– ফাতেমা।
– তাহলে আপকো লেড়কিকো নাম হোবে ফাতেমা।
খোরাসানের কারিসাহেব নাম রাখেন ফাতেমা। সেই থেকে তিনি ফাতেমা বলেই ডাকেন। নবীজির কন্যার নামে নাম। তাই তিনি এই নামের সংক্ষিপ্তকরণ পছন্দ করেননা।
যেবার ফাতেমা ভূমিষ্ট হলো, সেবার তিনটি মহিষ কয়েক দিনের মধ্যে বিয়ালো। একটার বাচ্চাও মারা যায়নি। আগে মহিষ বিয়ালে অনেক সময় বাচ্চা মারা যেত। আর মহিষগুলোর সেকি দুধ; উলান ভরা । বাড়ির সব ছেলে মেয়েরা দৌড়ে এসে রান্না ঘরে ঢুকে কাঁসার বাটি ভরে দুধ খায়। অনেকে দানাগুড়, তেতুলমাখা গুড় দিয়ে দুধভাত খায়।এখন সবাই দুধ খেতে শুরু করেছে। যত খায় দুধ আর শেষ হয়না। কী ঘণ হলদেটে, মিষ্টি স্বাদ আর মোহনীয় ঘ্রাণ ।
ফাতেমা ছোট ছোট পা ফেলে তার বাবার আগে আগে হাটতে থাকে। খালের দু’পারেই তাদের পৈত্রিক জমিজমা। ডাঙ্গার দিকের ছুটান ধান কার্তিকশাইল, ময়নামতি, মুঘলাই বালাম, বাঁশফুল বালাম প্রায় কাটা শেষ। একটু নীচের দিকে বড়ানধান চাপশাইল, গন্ধকস্তুরি, রাণীছালোট, রাঙ্গামেটেলের ছড়াগুলি বাতাসে দুলছে। তাদের পায়ের শব্দে এক ঝাঁক টিয়া উড়াল দিলো।
ফাতেমা হাততালি দিয়ে লাফিয়ে ছড়া কাটতে থাকে।
টিয়ে তোর বাড়ি কোয়ানে
রাঙ্গাছুটুরা থাকে যেখানে।
– আব্বা ও আব্বা টিয়েগে বাড়ি কোয়ানে?
– বড় গাঙের ওপার।
– ওখানি কী রাঙ্গা ছুটুরা থাকে?
– দূর রাঙ্গাছুটু থাকবে ক্যান!
– ওপারতো তেতৈলতলার আবাদ।
– আব্বা টিয়ে পাখিরা কী অতদূর উড়ে যাতি পারবে?
– পারবে।
– আব্বা ও আব্বা, ডাক শোননা ক্যানো?
-হোসেন শেখ দূরে তাকিয়ে কী যেন দেখছেন। শুনতিছিতো মা।
– আমি কী বড় গাঙ সাতঁরাইয়ে পার হতি পারবো?
– না তুমি সাতাঁর জানোনা।
– ক্যানো পারবোনা?
– তুমি ছোট মানুষ।
– বড় হলি কী পারবো আব্বা?
হোসেন সেখ ফাতেমার দিক ঘাঢ় ফিরিয়ে তাকান। হোসেন সেখ ফাতেমার কচি হাত ধরে হাটছেন আর তার নানা প্রশ্নের উত্তর দিচ্ছেন।
ফাতেমা এবার নালিশ করে।
– আব্বা আমারে ইকলাস, জরিনা, ধলেভাই আমার নাম ধরে ক্ষ্যাপায়। তুমি ওগে মারবা।
– ওরা তোমারে কি কয়?
– কয় কি জানো।
ফতে পথ কুড়াতে যাবি
ঢ্যামনা আছাড় খাবি
পেছন ফিরে চাবি।
হোসেন সেখ নালিশ শুনে মেয়েকে কাছে টেনে অভয় দিয়ে বলেন, আমি কারিসাহেবরে কয়ে দেবো।
তিনি ওগে শায়েস্তা করবে।
প্রায় খালের শেষ মাথায় চলে এসেছেন।
তিনি দেখেন খালের বাধের উপর দিয়ে কয়েকজন নৌকা টেনে বড়গাঙে ফেলার চেষ্টা করছে। ফাতেমাকে রেখে তিনি একটু দৌড়ে বাধের কাছে যান।
– এই আব্বাস তোরা কী কত্তিছিস?
আব্বাস ও তার সাথের দুইজন নীচু হয়ে নৌকা ধরা অবস্থায় পিছনের দিক তাকায়। আব্বাস উঠে দাড়িয়ে বলে।
– মাঝেদুদু লৌকো উপোড় দিচ্ছি জলমার হাটে যাবো।
– ভর দুপোরে হাটে যাচ্ছিস, তা বাল্লার উপরে নৌকো টানতিছিস ক্যান? তোগে কোনকালে কান্ডজ্ঞান হবে? বাল্লায় নতুন মাটি, এখনও ভালো করে বসিনি।
আব্বাস এবার অপরাধির মত মুখ কাচুমাচু করে বলে। – -মাঝেদুদু আমরা বুঝতি পারিনি।
– ক্যান এই শুক্কুর বারে জুমোর ঘরে ইখলাস উঠে সবাইর সামনে কইলো। খুৎবার আগেতো কলো।
– আমরা জানিনে।
– আদদুমড়ো হতি চললি, শুক্কুরবারেও পশ্চিম দিক ঠুস দিসনে। ধর নৌকো টানে পিছনে আন। এই থাল দিয়ে বাল্লার মাটির পরে পানি মার ত্যালসা হয়ে যাবেনে।
তাঁরা নদীর তীরে চলে আসে। ভাটার তীব্র স্রোত বয়ে চলছে। নদীর পানি নীচে নেমে গেছে। স্রোতে নদীতে কচুরিপানা ভেসে চলছে। কিছু দুরন্ত কিশোরেরা ডিঙ্গি নাও নিয়ে কচুরিপানা তুলে তার মূল থেকে গলদা চিংড়ি ধরছে। হোসেন সেখের রক্তে মাছ ধরার নেশা উত্তাপ ছড়াতে থাকে। তিনি কিছু বালি নিয়ে পিতলের বদনাটি মাজতে শুরু করেন।
– একটি জাহাজ তীব্র হুইসেল বাঁজিয়ে বাক ঘুরছে। জাহাজের সিটির শব্দে ভয় পেয়ে ফাতেমা তার আব্বার গলা জোরে আকড়ে ধরে বলে, আব্বা জাহাজ এত জোরে ডাকতিছে কেন?
– সামনের নৌকোগুলোনরে সরে যাতি বলতিছে।
– জাহাজ যাবে কোয়ানে?
– কইলকাতা।
– আব্বা কইলকাতা কোয়ানে?
– ম্যালাদূর। সমুদ্দুরির মধ্যি দিয়ে যাতি হয়। কইলকাতা টাউন হলো বংলার রাজধানি।
শিশু ফাতেমা কইলকাতা সম্পর্কে কোন ধারনা করতে পারেনা। সে তার আব্বার গলা জড়িয়ে ধরে জাহাজের দিকে তাকিয়ে থাকে।
বদনাটা তিনি নদীতে চুবিয়ে হাত দিয়ে ধুয়ে ফেলেন। পিতলের বদনাটা এবার বেশ চক চক করছে। এবার তিনি হাটুজলে নেমে নদীর তিনদিকে দৃষ্টি ঘুরিয়ে আনেন। তারপর তিনি অজু করে নদীর কিনারে এসে বলেন, মা ফাতেমা তুমি বসে থাকো, আমি একটা ডুব দিয়ে আসি। হোসেন সেখ মালকোচা মেরে একটু সামনে সাঁতরিয়ে যেয়ে ডুব দেন। ডাঙ্গায় বসে ফাতেমা বদনা আকড়ে ধরে বসে নদীর দিক এক নিরিখে তাকিয়ে থাকে। সেইতো কতক্ষণ হলো তার আব্বা ডুব দিয়েছে এখনও উঠছেনা।
সে মনে মনে ভাবছে বড় গাঙেতো কুমির আছে, কুমির কী তার আব্বারে খেয়ে ফেললো। সে একটু উঠে দাড়ায়, আশেপাশে কাউকে দেখতে পায় কিনা। কিন্তু আশেপাশে কেউ নেই। তার আব্বার কী হলো এই ভেবে সে একটু কেঁদে ফেলে। এমন সময় পানি দাপিয়ে তার আব্বা পানিতে ভেসে ওঠে। হোসেন শেখ একহাত উচু করে মেয়েকে ডাকেন, তাঁর বাম হাতে কয়েকটা গলদা চিংড়ি। এবার খুশিতে ফাতেমা লাফিয়ে হাততালি দিতে থাকে। ডাঙ্গায় উঠে তিনি গলদাগুলি মাটিতে ফেলে দেন। ফাতেমা দৌড়ে যেয়ে গলদা চিংড়ি ধরতে গেলে, তার আব্বা তাকে মানা করেন। তিনি মেয়েকে জাপটে ধরে একপাশে দাড় করিয়ে বলেন, গল্লা চিংড়ের ঠ্যাং দিয়ে তোমারে চেমটি দেবে। দাড়াও আমি ও ঠ্যাং ভাঙ্গে দি ।
– আব্বা ওগে ঠাং ভাঙ্গেনা, ওরা ব্যাথা পাবে। আব্বা ঐ নৌকা দিয়ে কী মাছ মারতইছে?
– এরা কাত্তিক মাসে ছান্দিজাল দিয়ে ইলিশ ধরতিছে।
– তুমি ডুবোয় এট্টা ইলিশ ধরো।
হোসেন শেখ মেয়ের দিকে তাকিয়ে একটু মুচকি হেসে গলদা চিংড়ি গুলির ঠ্যাং উপড়াতে থাকেন।
– ইলিশ মাছ ডুব দিয়ে ধরা যায়না। তুমি বসতি লাগো ফাতেমা, আমি আর একটা ডুব দিয়ে বড়মাছ ধরে আনি।
হোসেন সেখ এবার ডুব দিলেন।
এবার তিনি মাঝারি সাইজের একটা ভেটকি ধরে কুলে উঠে আসেন। নদীর কুলে ফাতেমাকে না দেখে তিনি ফাতেমাকে ডাকতে ডাকতে ডাঙ্গায় উঠে আসেন। ডাঙ্গায় তিন দিকে নজর বুলিয়ে ফাতেমাকে না দেখে উনি ঘটনা দ্রুত আাঁচ করে ফেলেন।
ফাতেমা, মা ফাতেমা বলে এক গগন বিদারী চিৎকার দিয়ে তিনি পানিতে ডুব দেন। মিনিট দুয়েক পরে খালি হাতে তিনি মেছো কুমিরের মত পানি উথাল পাতাল করে কোমর পানিতে উঠে দাড়ান। একবার নদীর দিকে তাকিয়ে কুলে এসে চিৎকার দিয়ে স্রোতের অনুকুলে কিছুটা দৌড়িয়ে একটু সামনে যেয়ে নদীর পানিতে ঝাঁপ দেন।
কয়েক মিনিট পরে নিসাঃড় কন্যাকে পাজাকোলে করে এনে মাটিতে চিৎ করে সুইয়ে দেন। গাঙ্গের কিনারে তখন বেশ কয়েকজন এসে জড়ো হয়েছে। হোসেন শেখ চরকাদায় শুয়ে চিৎকার করে কেঁদে ওঠেন। একজন ফাতেমাকে চিৎ করে শুইয়ে দিয়ে বার কয়েক পেটে চাপ দিতে থাকে। একজন তার বুকে কান পেতে হৃদস্পন্দন বোঝার চেষ্টা করে। গলগলিয়ে ফাতেমার মুখ দিয়ে পানি গড়িয়ে পড়ে। ফাতেমা চোখ মেলে আবার চোখ বোজে। কিছুক্ষণ পরে সে চোখ মেলে উঠে বসে দুদিকে ঘাঢ় ফিরিয়ে বলে আব্বা এত মানুষ কেন? তুমি কানতিছো কেনো কী হইছে?
ফাতেমার নদীতে ডুবে যাওয়ার খবর বিদ্যুৎবেগে ছড়িয়ে পড়ায় নদীপাড়ে সেখবাড়ি, গাজীবাড়ি, তরফদারবাড়ির ছেলেমেয়ে, নারীপুরুষ অনেকেই চলে আসে। দুইদিন আগে ফাতেমার নোয়াচাচী ফুলজান বিবি খুলনা থেকে একটা টাবুরে নৌকা নিয়ে শশুর বাড়ি এসেছেন তিনি হাবিবর রহমানের স্ত্রী। ফুলজান বিবি বড়গাঙের কুলে এসে ফাতেমাকে কোলে করে তাঁর ভাসুর হোসেন সেখকে বলেন।
– মাঝে ভাই আমি ফাতেমাকে খুলনায় নিয়ে যাচ্ছি। তারে ডাক্তার দেখানো লাগবে। আমার ছোয়াল মেয়ে নেই। আমি ফাতেমারে মেয়ের মতো মানুষ করবো।
দুপুরে খাওয়ার পরে ফুলজান বিবি, আইয়ুব ও তাঁর খুলনার বাসার সহযোগী গহর আলিকে নিয়ে টাবুরে নৌকায় ওঠেন।
বড়গাঙের ঘাটে তখন ছোট্ট ফাতেমাকে বিদায় জানাতে তার নিজের ভাইবোন, চাচাতো ভাইবোন ও চাচা চাচী ফুফুরা চলে আসে। হোসেন সেখ ফাতেমাকে কোল থেকে নামিয়ে টাবুরে নৌকায় তুলে দিয়ে বলেন মা ফাতেমা তুমি তোমার চাচীর কাছে থাকবা। হোসেন সেখ গামছা দিয়ে চোখ মুছতে থাকে।
– ফাতেমা কেঁদে উঠে বলে আব্বা তুমি আমারে কবে দেখতি আসবা।
– তাড়াতাড়ি আসপানে। মা তুমি কান্দেনা।
ফাতেমাকে শক্তকরে বুকের ভিতর আঁকড়ে ধরে শাড়ির আঁচল মাথায় টেনে নেন ফুলজান বিবি।
– ডাঙা থেকে ফাতেমার গোষ্ঠীর সব ভাইবোনেরা চেঁচিয়ে বলে, ফতে তুই কান্দিসনে। আমরা খুলনায় আসপানে তোরে দেখতি।
নৌকা ছেড়ে দিল। নৌকার ছইয়ের বাইরে মুখ বের করে ফাতেমা বড়গাঙের পাড়ে দাঁড়িয়ে থাকা তার আব্বার দিকে এক নিরিখে তাকিয়ে থাকে। নৌকা নদীর স্রোতে সামনে এগোতে থাকে আর তার আব্বার মুখচ্ছবি আস্তে আস্তে মিলিয়ে যেতে থাকে।
——————————–