
হারুন রশিদ
দেশ তখন সদ্য স্বাধীন হয়েছে। অবৈধ অস্ত্র সহজলভ্য হওয়ায় গ্রামের দিকে ডাকাতি হচ্ছে। সে সময়ে আমার মামাবাড়ির গ্রামে ডাকাতি প্রতিরোধের জন্য ডিফেন্স পার্টি গঠিত হয়। ডিফেন্স পার্টিতে তরুন যুবক থেকে বৃদ্ধদেরও অর্ন্তভূক্ত করা হয়। রাতের বেলায় তারা গ্রামের গুরুত্বপূর্ণ রাস্তা ও এলাকাতে পাহরা দিতে শুরু করে। কলেজ বন্দ তাই সিরাজগঞ্জ থেকে আমি খুলনার ভাড়েরকোট গ্রামে মামাবাড়ি বেড়াতে আসি। আমার এক মামাতো ভাইয়ের সাথে মিলে আমিও একরাত পাহারাদলের অর্ন্তভূক্ত হই।
এর আগে পাকিস্তান আমালে এক বছর আমি মামা বাড়ি থেকে ক্লাস ফোরে পড়েছি। তখন অনেক ঘটনা কেচ্ছা কাহিনী শুনেছি। দেওদানব, ভুতপ্রেত ছাড়াও জরিনার কথা, এল্লাবুড়ির কথা, ছুরমান ডাকাত ও মাতব্বরের কথা। সেসব আমার শিশুমনে খুবই রেখাপাত করেছে।
নানাবাড়ি অনেক নারকেল, সুপারি,
তাল, খেজুর, আম, জামগাছ ছিলো। কিন্তু কোনো পেয়ারা বা কুলের গাছ ছিলনা। আমার কুল পেয়ারা খাবার খুব ইচ্ছে হতো। সেকালে মামাবাড়ির গ্রামে এসব ফল কিনতেও পাওয়া যেতোনা। আমার সহপাঠি আরমান আমাকে কয়েকবার এল্লাবুড়ির বাড়িতে নিয়ে যায়। তাঁকে গ্রামের সবাই এল্লাবুড়ি ডাকতো। কারণ তিনি একাই বসবাস করতেন। সংসারে তার আর কেউ ছিলোনা। আমরা সুপারির বিনিময়ে তাঁর গাছের কুল ও পেয়ারা গাছথেকেই পেড়ে খেতাম। আরমান আমাকে এল্লাবুড়ির জীবন কাহিনী শুনাতো । এল্লাবুড়ির আগে অনেক জমিজমা ছিলো। তাঁর স্বামী ও এক মেয়ে ছিলো। মেয়েটার নাম ছিলো জরিনা। জরিনা সে আমলে ক্লাস ফাইভে বৃত্তি পেয়েছিলো। গাঙের ওপারের গির্জার এক বিলেতি পাদ্রি সাহেব জরিনাকে দেখতে এসে পুরষ্কার দিয়ে গিয়েছিলো। লেখাপড়ার পাশাপাশি স্পোর্টসে জরিনা বেশ পারদর্শী ছিলো। দৌড়, বেত লাফানো এসবে সে প্রাইজ জিতে নিতো।
এল্লাবুড়ির তখন শুধু এই ভিটেবাড়িটউকু অবশিষ্ট ছিলো। তাদের সব চাষেরজমি, ভিটেজমি জামাল মাতব্বর জ্বাল দলিলপত্র করে দখল নিয়েছে। এখন এল্লাবুড়ি লাঠিভর দিয়ে হাটেন। মানুষের বাড়ি বাড়ি চেয়েচিন্তে খেয়ে দিন কাটান।

সে সময়ে মামাবাড়ির এলাকার ছুরমান ডাকাতের কথাও শুনতাম। ছুরমান ডাকাত ও জামাল মাতব্বরকে নিয়ে বেশকিছু কাহিনীও লোকমুখে শুনেছি । জামাল মাতব্বর ছিলো গ্রামের সবচেয়ে ধনীলোক। অনেক জোতজমির মালিক। শিশুকালে গ্রামের এইসব ভয়াবহ ঘটনা শুনে আমার বুকে হিম ধরে যেতো।
সেদিন পাহারার রাতে ভাগ্যক্রমে আমাদের দলে ছুরমান ডাকাতও এসে হাজির। তিনি তখন বৃদ্ধ। বেশ বয়স হয়েছে। সেরাতে আকাশে চাঁদ ছিলো। এল্লাবুড়ির বাড়িটা যেখানে ছিলো, সেখান থেকে যাবার সময় ফকফকা জ্যোৎস্নায় এল্লাবুড়ির মুখচ্ছবি মনের ভিতর হামলে পড়ে। আর জরিনাও এসে হাজির। জরিনার কল্পিত ছবি ভেসে আসে। এখন দেখি এল্লাবুড়ির বাড়ির ওখানে মাতব্বরের দোতলা বিল্ডিং। সেই পেয়ারা, কুলের গাছ কিছুই নেই।
পাহারার সেই রাতে সুযোগ খুঁজি কখন ছুরমান ডাকাতকে আমরা একাকি পাব। ছুরমান ডাকাতের খুব বিড়ির নেশা পায়। সে আমাকে বিড়ির কথা বলে। তাকে নিয়ে একবাড়ির দোকানে যাই। তখন গ্রামে বাড়ির ভিতর মুদিদোকান ছিলো। এগুলিকে দোকান বাড়ি বলতো। আমি বিড়ি না কিনে একপ্যাকেট স্টার সিগারেট কিনে তার হাতে দেই। তখন তার সাথে একটু ঘনিষ্ট হয়ে কাহিনীটা শুনি। দোকান বাড়ির সামনে খোলা আকাশের নীচে বাঁশের মাচায় বসে তার কাছ থেকে সিগারেটের বিনিময়ে কাহিনীটা শুনি।
ষ্টার সিগারেটে কষা টান দিয়ে ভুস ভুস ধোয়া ছেড়ে ছুরমান ডাকাত বলতে থাকে।
– তোমরে আসল সত্যিডা কই। আসলডা কেউ জানেনা। জামাল মাতব্বরও না। তোমারে কচ্ছি। এহন আর জানলিইবা কী? আমার জীবনতো শ্যাষ। আর কয়দিন বাঁচপো।
তাহলি আমি কচ্ছি শোনো। আমারে জামাল মাতব্বর দুইশ টাহায় চুক্তি এরলো, পেরথমে একশ দেলো। আমারে কলো কাজ হলি আরো একশ তোরে দেবো। জামাল মাতব্বর এক কথার মানুষ, তার কথায় বিশ্বাস করলাম। তিনি আমার ম্যালা উপকার করিছেন। আমি যেবার গ্যাং কেচে পড়িলাম সেবার উকিল-মোখতার সেই ঠিক করে দিলো। মাতব্বার আগে এক সময় আমাগে লাইনির সদ্দার ছেলো।
– তোমাদের কিসের লাইন?
– এই ডাকাতি ডুকাতি ওইসব আরকি।
পরে সে মেলা সম্পত্তি বানায়ে হাজী হইলো তাই আর ওকাজ করতোনা।
– জামাল মাতব্বরকে আড়ালে আবডালে কেউ কেউ বোম্বাই হাজী বলে ব্যাপারটা কী?
– শোনা কথা আমি কারোর গীবাত করতি চাইনে। সেইকালে মাতব্বর হজ্ব করার কথা কয়ে মক্কা-মদিনেয় না যায়ে, বুম্বাইরতে খুরমাখেজুর, তছবি, জায়নামাজ আর একটা ভাড়ে বোম্বাইর খানিক পানি ভরে দ্যাশে আশে কলো পচ্চিমেরতে আসলাম। বুঝলে মক্কাও পশ্চিম আবার বুম্বাইও পশ্চিম। এইডাতো আর মিছেনা। তোমরা শিক্ষিত হইছো ভূগোল পড়িছো তোমরা এইসব ভালো বুঝবা।
– আসল কথা কও। জরিনার ঘটনাটা কও।
– আসল কথা শোনো যেডা জানতি চাচ্ছো, সেডা ম্যালা আগের ব্যাপার। এহন আমার মরনকাল তোমারে অল্প কথায় কই।
এল্লাবুড়ির ভিটে-বাড়ি এখন সব বাগান কাঠাল পরিষ্কার হয়ে গেছে। সেখানে পাকাবিল্ডিং হইছে, আরো বাড়ি ঘর উঠিছে। মসজিদ বানাইছে। সেই টাইমি ছেলো বাগান কাঠালে ভরা, রাস্তাঘাট ভাল একটা ছেলোনা। সেইদিন সন্ধেকাল। তহন সন্ধ্যে হলি মানুষ চেরাগ নিভেয় ঘুমোয় পড়তো। তয় জরিনা রাতজাগে হারিকেন জ্বালায়ে বই পড়তো। একদম ফাঁকা বাড়ি। আশেপাশে বাড়িঘর নেই। ঘুডঘুডে আন্ধার। আমরা তিনজন বসে আছি এল্লা বুড়ির ঘরের কানাছি। দাতন বন, মশায় কামড়াচ্ছে সহ্য কত্তিছি। আমাগে পাছের বাগানে একটা বন বিড়েল মাপ মাপ করে ডাকতি থাকে। খুপির মধ্যি কুড়োপাখি ভয়ে আফালি মারে । এল্লাবুড়ি একখান লাঠি দিয়ে ঘরের খামে বাড়ি মারতি থাকে। আর হায় হায় করতি থাকে। আমরা তিনজন চুপ মারে থাকলাম।
– তোমার সাথে আর কে কে ছিলো?
ঝিলেঘাটার বাহের গাজী। কয়েক বছর হলো ও মরে গেছে। ঐযে এট্টু খোঁড়ায়ে খোঁড়ায় হাটতো। তুমি তারে দেহিছো। পুলিশি বাঁশডলা দিলি ওর ঠ্যাঙ একখান সুখোয় গেছিলো। আর ছেলো মাতব্বরের হাতো ছোয়াল গাউছ।
– হাতো ছোয়াল সে আবার কী?
– তুমি টাউনির মানুষ। গাওগ্রামের কারবার জানোনা।
ছুরমান ডাকাত এবার কানের কাছে মুখ এগিয়ে নিয়ে বলে।
– মাতব্বর আর এট্টা নিকেহ করিলো। সেই বিটির আগের ঘরের ছোয়াল। শোনা যায় মাতব্বর সেই বিটিকে বাড়োয়ে মারে টিনির ঘরের আড়ায় ঝুলোয় রাখে কইলো সুইসাইড এরিছে।
– পুলিশ আসিনি?
– আরে পুলিশ দেখতিছো। মাতব্বর ছেলো আইয়ুব খানের লোক। পুলিশ আসবে কি এরতি!
আরো ঘনিষ্ঠ হবার জন্য তারে দাদা সম্ভোধন করি।
– দাদা তা তুমি ঐ দুইজনকে কী ভাবে দলে নিলে?
– মাতব্বর গাউছরে আমার সামনে ডাকে আনে কলো, ছুরমান যা কয় তাই করবি। গাউছ শুধু মাতব্বরের সামনে এক পাশে মাথা কাইত করলো। আর মাতব্বর আমার কানে কানে কলো, ওরে কুড়ি টাকা দিয়ে দিস। বাহের দুই একবার আমার সাথে গাঙ্গের কাজে ছেলো।
– দাদা গাঙ্গের কাজ মানে কী?
– রাত্রিকালে বিয়ের নৌকোয় ডাকাতি করা। আগেতো দূরগ্রামে বিয়ে করতি গেলি নৌকোয় যাতি হতো। বিয়ে করে ফিরে আসতি দুপোর রাইত, বিয়ান রাইত হয়ে যাতো। তহোন গাঙের মধ্যি আমরা ডাহাতি করতাম। সোনাদানা, মালসামানা সব লুটে নিতাম।
এবার আমি ছুরমান ডাকাতের গায়ে আলতো থাবা দিয়ে বলি।
– তা দাদা তুমি জীবনে এতো সাহসের কাজ করিছো ! এবার বাহেরের কথা কও।
ছুরমান বুড়োর একটু খুশী ভাব হলো।
– আমি বাহেররে কলাম এট্টা কাজ আছে যাবি?
– ও কলো কী কাজ?
– আমি কলাম এট্টা ভাল জিনিষ আছে
খেলতি যাবি? ও শালা এট্টু নুচ্চো কিলাশের ছেলো বুইচো।
– মুচকি হাসি দিয়ে বাহের কলো তা ঠিক আছে। আসল কথাডা ওরে সেই টাইমি কলামনা।
সেদিন রাতি আমরা তিনজন গেলাম এল্লবুড়ির বাড়ি। আটচালা ঘর। বাঁশের চাঁচের বেড়া। আমরা লাঠি, গাছিদাও, গামছা, সিংকাটি, টচলাইট সব নিয়ে গেছি। যদি সিং খুঁচে ঘরে ঢোকা লাগে তাই।
আমরা এল্লাবুড়ির ঘরের ব্যাড়ার ফাসা দিয়ে দেখতিছি। চত্তির মাস বাও বাতাস প্রায় বন্ধ। ঘরে একটা হ্যারিকল জ্বলতিছে। ওরা মা মায়ে দুইজন মান্দুরির পরে বসে কথা কচ্ছে। পষ্ট শুনতি পাচ্ছি।
– এল্লাবুড়ি তার মেয়েরে কচ্ছে, রাত্তিরি কী খাবি ও জরিনা ? খালি তোর লিহাপড়া। এহন বইখাতা বন্দ কর। চল রানতি যাই।
– জরিনা কয় মাগো কী রানবি?
– এল্লাবুড়ি কয়, মাঁচার নীচে মাটে আলু আছে। তাই রান্ধি কুড়োর ডিম দিয়ে।
– কোয়ানে দেখতিছিস কুহড়োর ডিম?
– ক্যান ধানের মাইটের পরে তুষির হাড়ির মধ্যি দেখিলাম।
– জরিনা কলো, ও কয়ডা ডিম আমি তায়ে বসাবো। রাঙা মুরগিডা উমোনে হইছে।
– এল্লা বুড়ি এট্টু রাগ করে কচ্চে, তা তুই বসাইস।
– মাগো রাগ করিছিস ঠিলেয়
তেঁতোলির গুড় আছে নারকেল কোরায়ে তাই দিয়ে খাবানে। আর দুপোরের সালোন আছে এট্টু।
– যা ভালো ঠ্যাহে তাই খা। আমার হাগা চাপিছে আমি এট্টু বাজ্জিখানায় যাবো। প্যাটের মধ্যি যা মোচড় মারতিছে।
বইখাতা বন্দ করে জরিনা উঠে দাঁড়ায়।
– মাগো আমি তোর সাথে আসপো?
– তোর আসা নাগবেনা।
আমি যদিও আগে শুনেছি। তবু আবার ছুরমান ডাকাতকে জিজ্ঞস করি।
– জরিনা তখন কোন ক্লাসে পড়তো?
– অত জানিনে তয় শুনতাম মেট্টিক দেবে। ছিমড়ির ব্রেন ভালো ছেলো আর কাটিংও। আসল কতা শানো। কথার মধ্যি বাও হাত দেও!
এল্লাবুড়ি তার মাইয়েরে কচ্ছে।
– বন বিড়েল ডাকতিছে তুই একখান লাঠি নিয়ে এই গরমে হাতনেয় আসে চৌকির পরে বয়। এই হেরিডা নিয়ে যাই, গরমে সাপকোপ বাগানেরতে বারোতি পারে।
– এল্লা বুড়ি হ্যারিকেন নিয়ে হাগতি গেলি ঘর একদম আন্ধার মারে গেলো। ঘরের পেছনের দিক থেকে আমি সামনের দিকি চলে আসি। অল্প বাতাসে বুড়ির হ্যারিকলের আলো দুলতিছে, আর উঠোনের বরই, আম গাছের পিছন দিকি ছায়া সরে সরে যায়ে লম্বা হতি থাকে। এল্লা বুড়ি বার বার দুই হাতের লাঠি দিয়ে গাছ-পালায় বাড়ি মারে। আর হো হুই করে ভূত-প্যাত তাড়ায়ে পুকুর পাড়ের দিক যাতি থাকে। লাঠির বাড়ির শব্দ পায়ে কয়একটা বাদুর কাঠ বাদাম গাছ থেকে পত্পতায় উড়তি থাকে। হেরির আলো বাগানের আবডালে চলে গেলো। আমি দ্যাখলাম এইতো সুযোগ। আমি ঘরের পাছের দিকি আসে গাউছির প্যাটে খোঁচা মারে কলাম এই ওঠ।
আমরা তিনজন হুড়দ্দুম বারান্দায় চলে আসি। গাউছ জরিনার মুখ চাপে ধরে। বাহের গামছা দিয়ে ওরে পিঠমুড়া দিয়ে বান্ধে ফ্যালে। ও মাথা ঝাড়া মারে পাওদে আমার বুকি লাথি মারলো। আমি কাত হয়ে পড়ে গেলাম। ছিমড়ির দাপনায় বল ছেলো। আমি উঠে যায়ে গামছাদে ওর ঠ্যাং বান্ধলাম আর একখান গামছা দিয়ে গাউছ ওর মুখ বানলো। দাপাদাপিতি জরিনার পরনের শাড়ি উপরির দিক আগলা হয়ে গেলো। খালি গা। দুইজন ওরে কান্ধে নিয়ে হাটতি লাগলো।
আমি আগে আগে ওরা দুইজন জরিনারে কান্ধে নিয়ে পাছে । বাড়ির পাছের বাগান পার হয়ে পেঁচামারির কান্দরে পড়লাম। কান্দরের মধ্যিখানে আসলি ওরা জরিনারে নীচেয় ফ্যালায় দাড়ায় গেলো।
– বাহের কলো, এই ছিমড়ির গায় ম্যালা ভার, মাঝেভাই কোনদিক যাবা ?
– আমি বাহেররে কলাম চান্দেরবাদের খালকান্দার গাব গাছটার ঐখানে চল।
– অতো দুরি। যা এরার এইখানে এরি।
– হারামজাদা ভূতি গাইড় মারিছে। এইখানে চারিদিক বাড়িঘর। ধরা খাতি চাইস ।
এল্লাবুড়ি জরিনা জরিনা এরে ডাকতিছে। আমি মদ্দি কান্দরতে তার গলা শুনতি পালাম। কান্দরের দক্ষিণ দিকে সুরোত ফহিরির বাড়ির দিক কয়ডা কুকুর ঘেউ ঘেউ করতিছে।
জরিনা নীচেয় পড়ে ডানি বায়ে মোচড় মারে পাও দাপাতি থাকে। আমি ছিমড়ির মুখি দিলাম এক চড়। আমি আমার হাতের ছ্যানদাও ওর গলায় ঠ্যাকায় কলাম, এই মাগি একদম চোপ নড়াচড়া করলি গলা দুইভাগ করে দেব।
ও ভয়ে একদম চুপ মারে গেল। আন্ধার রাত। তাঁরার আলোয় সব দেখা যাচ্ছে।তাঁরার আলোয় জরিনাতো আমারে দেখিছে। সেই টাইমি আমারে এই মুল্লিকির সবাই ভয় পাতো। ছুরমান ডাকাত আইছে শুনলি ম্যালা মানুষ কাপড় খারাপ করে দেতো। আমি বাহেররে কলাম পাও চালায়ে হাট। আমিও ওগে সাথে ছিমড়িরে কান্ধে নিলাম।
খালকান্দার গাবতলায় আসে ওরে নীচে মাটিতি ধপাশ করে ফ্যালায়ে হাঁপাতি লাগলাম। কয়েকটা শিয়েল আমাগে সাড়া পেয়ে সামনের দিক দৈড় মারলো। আমার মুত চাপিছে। পিছন ফিরে দাড়ায়ে মুতে দিলাম। খালের নীচে নামে গেড়ো ভরে পানি খালাম যা পিপাসা লাগিলো। ফিরে আসে আমি জরিনার পার বান্ধন খুলে দিলাম। খালি হাত মুখ বান্ধা। মুখির বান্ধন খুলে দিয়ে কলাম। একদম চ্যাঁচাবিনে। চুপচাপ থাকপি। তারপর
ওর হাতের বান্ধন খুলে দিলাম।
– ও আমার পাও জড়ায় ধরে কান্দে ওঠলো। কলো কাকা আমার বাপ খুন হয়ে গেছে। দুই ভাইবুন কলেরায় মরে গেছে। মা ছাড়া দুনেপুরিতে কেউ নেই, আমি এতিম। আমি তুমার মায়ের বয়সি, আমার ইজ্জেত মারেনা।
– আমি ওর চুল ধরে কানের পরে মারলাম এক চড়। এই ছিমড়ি টু শব্দ এরবিনে তোর কান্দা থামা ।
আমাগে কাজ হয়ে গেলি আমি আসল কথা কলাম। বাহের ওতো আমাগে চিনে ফ্যালাইছে, রেফ কেচে পড়তি হবেনে।
বাহের ভয় পায়ে কলো, মাঝেভাই এ কী কচ্ছো ?
আমি বাহেররে থাবা দিয়ে কলাম বাঁচতি চাইসতো ছিমড়িরে মারে ফ্যালা। সামনের মালোগে বাগানে পুতে ফ্যালাতি হবে।
– বাহের দুই হাত মাজায় বান্ধে চোখ বড় করে কলো তুমি কচ্ছোডা কী তোমার হুস আছে!
– যা কচ্ছি তাই এ্যার। কিছু হলি মাতোব্বার আমাগের ঠ্যাক দেবেনে।
– এল্লা বুড়ির ভিটে কাঠার ওয়ারেশতো জরিনা। তাই তোমারে লাগাইছে মার্ডার করতি।
– তা তুই পারবিনে?
– পারবো তয় আরো টাকা লাগবে।
– কাজ হলি মাতব্বর দেবেনে।
আমি কোমরেরতে একটা খতে বাইর করে কড়কড়ে রাঙ্গা দশ টাকার চারখেন নতুন নোট ওর হাতে দিলাম। ও টাকা হাতে নিয়ে চোখির কাছে ম্যালায়ে দ্যাখ্লো।
– বাহের কলো টাহা আর দিবানা?
– মাতব্বর দিক তখন আরো দিবানে। গাউছির দ্যাখলাম আবার নুচ চেতিছে সে জোমেলারে চাপাচাপি এরতিছে।
আমি গাউসরে দিলাম এক লাথি।
– বাহের আমারে কলো, মাঝে ভাই জায়গাডা আমারে দেহাও। আগে দেখতি হবে লাশ পুতে সামাল দেয়া যাবে কিনা।
আমি গাউছরে পাহারায় রাখে কিছুপথ হাটে মালোগে ভিটের মধ্যি বাহেররে নিয়ে গেলাম। পতিত ভিটে। নরেন মালোরে ইন্ডিয়ায় তাড়ায়ে মাতব্বর এইডে দখল নিছে। বনজঙ্গল ভরা তার মধ্যি আমি একটা উবদি গর্ত খুঁচে রাখিছিলাম। সেইডা বাহেররে দেখালাম। সাবল, কোদাল ঝোপের মধ্য আছে। সেডাও দ্যাখালাম।
– বাহের কলো ঘাড়া আরো খানিক খুঁচতি হবে।
– আগে কাজ শ্যাষ হোক তারপর লাশ বাগানে আনে খুঁচপানে। আমি বাহেররে কলাম রক্তারক্তি না গলাচিপে দম আটকায় কাজ সারতি হবে।
আমরা দুইজন তাড়াতাড়ি গাবগাছতলায় আসে দেখি জরিনা নেই। গাউছ পাটায় পড়ে আছে। গাউছরে হাত দিয়ে ঠেলা মারলাম। গাউছ ছেলো চিকনচাকন গায়ে কাবু। ঠ্যালা খায়ে গাউছ উবদি হয়ে গেলো। গলায় দেখি গামছা প্যাঁচানো। বাহের নাকে হাত দিয়ে দেখে।
– মাঝেভাই নিশ্বেস বন্দ।
– আমি চিল্লেয় উঠে কলাম, বাহের পোঙ্গায় বাঁশ। এবার কি এরতি হবে?
– বাহের কলো, গাউছ আবার এরতি গেইলো মনে হয়। সেন্নি জরিনা গাউসরে গামছা গলায় প্যাঁচ মারে পলায় গেছে।
খালেরতে হাতের গেড়োয় পানি আনে গাউছির মুখি ছিটেলাম। কাজ হলোনা।
গাউছ চুদির ছোয়াল মরিছে। এহন জরিনারে তলাশ কর।
আকাশে ছেলো তাঁরা ভর্তি। তাঁরার আলোয় সারা বিল সলোক ফুটে আছে। তারপর আমার কাছে তিন ব্যাটারির টর্চলাইট । টর্চ চারদিকে ফোকাস মারে দেখতি লাগলাম। কিছুই দেখতি পাইনি। খালে নামে খাল কান্দার হোগলাবন, কতইবনে টর্চ মারে দ্যাখলাম। কোনো হদীস পালামনা জরিনার।
– বাহের কলো, কেচ খারাপ। গাউস হলো মাতব্বরের হাতো ছোয়াল। ওর মার্ডার কেচ মাতব্বর আমাগে পরে চাপায় দেবেনে।
আমি দিশেহারা হয়ে বিলির মধ্যি মাটিতি বসে পড়লাম। চিন্তা করতি লাগলাম । বসা থেকে উঠে আমি বাহেররে কলাম, জরিনারে পুতে ফেলার যে গর্ত খুঁচিছি সেই গর্তে গাউসরে পুঁতে ফেলাতি হবে।
– বাহের কলো, তাই এরতি হবে মাঝে ভাই। বাঁচতি গেলি এই ছাড়া উপায় নেই।
আমি সেইরাতে দোকানঘরের চালায় বসে ছুরমান ডাকাতের বয়ান শুনে স্তম্ভিত হয়ে গেলাম।
– আমি বললাম তারপর তোমরা গাউসরে পুঁতে ফেলালে?
– হয় সেই গর্তের মধ্যি পুঁতে ফ্যালাই। তারপর খালের পানিতি গোসল দিয়ে বাড়ি চলে আসি।
– মাতব্বররে কি বললে?
– কইলাম জরিনারে ফিনিশ করে পুঁতে ফ্যালাইছি। বাকি টাহা দ্যাও।
– গাউছির কথা মাতব্বর জিজ্ঞেস করলোনা?
– মাতব্বররে সাথে দ্যাখা হবার প্রথম চোটে কলাম, এল্লাবুড়ির বাড়ির ধারে যখন আমরা গেলাম তহন দেখি পিছনথে গাউছ পলাইছে ।
– মাতব্বর চেঁচায় উঠে কলো হারামির বাচ্চারে এই বাড়িতে আর জাগা দেবোনা।
– তারপরে জরিনার আর কোনো খবর পাইছো তোমরা?
না। জরিনার কোনো খবর আর আমরা পাইনি। এই মুল্লুকির কেউ জানেওনা।আমি আর বাহের চিন্তের মধ্যি থাকতাম। এই বুঝি জরিনা ফিরে আলো। জরিনা ফিরে আসলি আমাগে কম্ম কাবার।
– থাক তোমার আর বলতি হবেনা।
– শোনো দুই পাও প্রায় আমার কবরে। আমিতো শ্যাষ। তুমি শুনতি চাইছো তাই সত্যিডা জীবনে প্রেথমে তোমারে কলাম। এ কথা আর কাউরে কবানা। আর এক বাক্স সিগারেট কিনে দ্যাও বাড়ির দিক যাবো।
এরপর আমি জরিনার রহস্য নিয়ে অনেক চিন্তা করেছি। আরো পরে, তা প্রায় বছর আট হবে। আমি তখন সদ্য বিবাহিত। ঢাকায় জব করি। এক ছুটিতে বৌ নিয়ে মামাদের গ্রামে বেড়াতে আসি। তখন ছুরমান ডাকাত, জামাল মাতব্বর কেউ আর বেঁচে নেই। সেই সময় জরিনাকে নিয়ে নতুন কিছু কথা শুনতে পাই।
– – – – – – – – – –