কেকা অধিকারী

ছোট বেলায় বেবিটা একটু বেশি ভালো ছিল। কার বেবিটা? আমার। আমারই রক্তস্রোতে বয়ে চলা ছেলেটা আস্তেআস্তে বড় হলো। হাঁটতে শিখলো, পড়তে শিখলো, মা বলা ডাক তো অনেক আগেই আয়ত্ত্ব করেছিল।
পড়তে বসালে কোন ঝামেলা ছাড়াই পড়তো। সেসময় ও মায়ের সঙ্গ পছন্দ করতো। কাছে বসে পড়ালে কখনো না পড়ার জন্যে বায়না করতো না। কিন্তু লিখতে সময় নিতো বেশ। আমি অধৈর্য্য হতাম। কোনভাবেই ওকে দিয়ে তাড়াতাড়ি লেখানো যেতো না। হাতের লেখাটাও তেমন সুন্দর ছিলো না ওর। আমার নিজের লেখাও অসুন্দর। তাই ওর লেখাটা সুন্দর করাতে তেমন কিছু করতে পারতাম না বলে কষ্ট পেতাম। বিকল্প কিছু একেবারে যে চেষ্টা করিনি তা নয়। প্রদীপের হাতের লেখা যথেষ্ট সুন্দর। তাই ওকে বলতাম অন্বয়ের লেখাটার দিকে লক্ষ্য দিতে। আমি লাইনটানা খাতায় একেকবারে অনেকগুলো পৃষ্ঠার প্রথম লাইনে প্রদীপকে দিয়ে বাংলা ও ইংরেজিতে তিন বা চার শব্দের একটা করে বাক্য লিখিয়ে নিতাম। পরে অন্বয়কে বলতাম ঐ লাইনের নিচে নিচে বাবার মতো করে লিখতে। কিন্তু এত সব করেও ওকে ওর হাতেখড়িদাতা ও প্রথম শিক্ষক প্রিয় ন্যান্সী মামী এবং মায়ের অসুন্দর লেখার প্রভাবমুক্ত রাখতে পারিনি।
অনেক বছর আগে দেশে শিক্ষার হার বাড়াতে এনজিওগুলো একটা বিশেষ প্রকল্প বাস্তবায়ন করেছিল, ‘কিশোরী শিক্ষা প্রকল্প।’ সে বিষয়ে কাজ করতে গিয়ে শিখেছিলাম কেন কিশোরী মেয়েকে শিক্ষা দেওয়াটা জরুরি। একজন কিশোরী যতটুকু লেখাপড়া শিখবে, যা কিছু জানবে সে যখন মা হবে তার সন্তান কোনভাবেই তারচেয়ে বেশি ছাড়া কম জানবে না। তাই বেশিরভাগ ক্ষেত্রে সন্তানেরা মায়ের চেয়ে বেশি শিক্ষিত হয়। অথচ অনেক অক্ষরজ্ঞানসম্পন্ন বাবার সন্তানকে নিরক্ষর থাকতেও দেখা যায়। অন্বয়ের হাতের লেখা সুন্দর করার যুদ্ধে শিক্ষার হার বৃদ্ধির কৌশলের কার্যকারীতা অনেক বেশি করে উপলব্ধি করেছি।
সেবার অন্বয়ের শিক্ষা জীবনের প্রথম ফাইনাল পরীক্ষার রেজাল্ট দিবে। ও প্লে গ্রুপ থেকে নার্সারীতে উঠবে। ওর বাবা আর আমি ওকে নিয়ে স্কুলে গেলাম। পরীক্ষার রেজাল্ট নিয়ে খুব বেশি ভাবনা ছিল না আমার। ওর বাবার মধ্যে বেশ অস্থিরতা ছিল। আমি শুধু চাইতাম ও যেন সব বিষয়ে মোটামুটি ভালো ফলাফল নিয়ে পাশ করে। ফার্স্ট সেকেন্ড নিয়ে আমার তেমন চিন্তা ছিলো না। স্বার্থক জীবনের ব্যাপ্তিতে প্রথম বা দ্বিতীয় হওয়ার গুরুত্ব কতোটুকুই বা আর!
ওর রেজাল্ট ভালো হয়েছে। শ্রেণি শিক্ষক কাছে এসে আমার ছেলের প্রশংসা করলেন। বললেন ‘আপনি তো ওর দিকে বেশি লক্ষ্য দিতে পারেননি. . . . . . .’। ভাবলাম তিনি হয়তো আমার চাকরীজনিত ব্যস্ততার কথা ইঙ্গিত করে কথাটি বললেন। কিন্তু তার পরবর্তী বাক্যটিতে আমি ও প্রদীপ দু’জনেই চমকে উঠলাম, ‘হ্যাঁ, অন্বয় বলেছে যে আপনার বাবা মারা গেছেন। এমন মনের অবস্থায় কি আর সন্তানের পড়াশোনার দিকে লক্ষ্য রাখা যায়?’ আমি আৎকে উঠে বললাম,‘আমার বাবা তো মারা যাননি। তিনি তো বেঁচে আছেন।” প্রদীপ হা করে তাকিয়ে বিষয়টি বোঝার চেষ্টা করছে। শিক্ষিকা আমার উত্তরে ঘাবড়ে গেলেন। ‘তাহলে কি ওর দাদা মারা গেছেন?” ‘না, না তিনিও তো বেঁচে আছেন।” ‘কিন্তু অন্বয় যে আমার কাছে গল্প করলো আমার দাদু মারা গেছে! অনেক মানুষের গল্প করলো!’ ঝা করে আমার মাথায় খেলে গেলো কয়েক মাস আগের কথা। আমি বললাম ‘না, ওর নিজের দাদু বা দাদা কেউই মারা যাননি। তবে আমার এক আত্মীয় মারা গেছেন, ও বোধহয় তাঁর কথা বলেছে।”
বুঝলাম ছেলেকে জীবনমুখী মৃত্যু শিক্ষা দেয়ার ফল এটা!
আরো অনেকের মতো মৃত্যু নিয়ে প্রায়ই ভাবি আমি। মৃত্যু হলো জীবনের পরিসমাপ্তি, নতুন জীবনের শুরু। কিংবা নিজেই নিজের বাড়িতে পুনরায় ফিরে যাওয়ার মতন। মৃত্যুকে বুঝতে হলে জীবনকে বুঝতে হয়। তারপরেও জীবনের অর্থ সেভাবে বোঝা হয়নি এখনও। সুদীর্ঘ জীবন কাটিয়েও জীবন-মৃত্যুর বোধ আমার ততোটা ¯পষ্ট না। কী জানি মৃত্যুকে এখনও জানা হয়নি বলে হয়তো। তবুও মনে হয়েছিল ছোট বেলাতেই ছেলেকে মৃত্যু সম্পর্কে একটু ধারণা দিয়ে রাখা ভালো।
রেজাল্ট দেয়ার কয়েক মাস আগে একদিন অফিসে বসে সংবাদ পেয়েছিলাম সর্বজন শ্রদ্ধেয় রেভা.পুনর্দ্দান হালদার মারা গেছেন। দিনটি ছিল রোববার, ১৩ ফেব্রয়ারি, ২০০৫। বরিশাল ব্যাপ্টিষ্ট মিশণ বয়েজ হাই স্কুলের ডাকসাইটে প্রধান শিক্ষক ছিলেন এই পুনর্দ্দান মামা। কড়া ও মেজাজী শিক্ষক হিসেবে পরিচিতি ছিলো তাঁর। তবে সৎ মানুষ হিসেবে সুনাম ছিল সবচেয়ে বেশি। সেই পুনর্দ্দান মামা তার অবসরকালীন জীবনে আমাদের গীর্জার পুরোহিতের দায়িত্ব নিয়েছিলেন। এটা ছিল তার স্বেচছাসেবার কাজ।
মিরপুর ব্যাপ্টিষ্ট চার্চে তাঁর অন্ত্যেষ্টিক্রিয়ার আয়োজন করা হয়েছিল। যতোদূর মনে পড়ে তাতে যোগ দেয়ার জন্যে আমি অফিস থেকে চলে এসেছিলাম। ফেরার পথে হঠাৎ মনে হলো মৃত্যু কী তা অন্বয়কে শেখানোর জন্যে শিক্ষক পুনর্দ্দান মামার তিরোধানের সুযোগটা না হয় গ্রহন করি। তাই সরাসরি গীর্জায় না গিয়ে বাসায় এসে ওকে রেডি করে সাথে নিয়ে আমি গীর্জার পথে রওনা হলাম।
রিক্সায় যেতে যেতে অন্বয়কে বোঝাতে চেষ্টা করলাম মৃত্যু কী। বললাম, ‘একদিন সব মানুষকে মরে যেতে হয়। মরে গেলে মানুষ আর নড়াচড়া করতে পারে না, কথা বলতে পারে না, খেতে পারে না, ব্যথা পায় না। মৃত মানুষ ঘুমিয়ে থাকে। সে ঘুম আর ভাঙে না। তখন মানুষকে কবরে রাখতে হয়।’ আমি ব্যাখ্যা করলাম কবর কী। কফিন কী। তাকে আরো বললাম-
টুম্পু, আমরা এখন গীর্জায় যাচ্ছি। তবে অন্য সময়ের মতো প্রার্থনা করতে নয়। একজন দাদু মারা গেছেন। তাঁকে বিদায় দিতে এখন বিশেষ প্রার্থনা হবে।
ওকে আমি যখনই গম্ভীর ভাবে কোন কথা বলতাম তখন ও চুপ করে গভীর মনোযোগ দিয়ে আমার কথা শুনতো। ওর স্থির হয়ে যাওয়াই আমাকে বলে দিতো যে, ও বিষয়টা বুঝতে চেষ্টা করছে। সেদিনও ও আমাকে কোন প্রশ্ন করেনি। আমার সঙ্গে গীর্জায় গিয়ে বসেছে। প্রার্থনা শেষে সবার সাথে লাইন করে পুলপিটের সামনে কফিনে রাখা পুনর্দ্দান মামার দেহ দেখেছে।
ফেরার পথে তাকে আমি বুঝিয়ে বলেছি কীভাবে কফিনে করে তাঁর দেহ কবরে রাখা হবে। অন্বয় একবারও মৃত্যু বা মামার বিষয়ে কোন প্রশ্ন করেনি। তবে আস্তে করে একটা অনুরোধ করেছে আমাকে-
`মা, আমি মারা গেলে তুমি আমাকে একা কবরে রেখো না। তুমিও আমার সঙ্গে করবে যেও।
তার অনুরোধে আমি স্তব্ধ হয়ে গেলাম। ওর মৃত্যু ভাবনা আমাকে নাড়িয়ে দিয়েছিল। আমি কী করে ওর সঙ্গে কবরে যাব সে কথা ভেবে কুলকিনারা পাচ্ছিলাম না। আমাকে চুপ থাকতে দেখে অন্বয়ের মনে হয়তো মায়ের ভূমিকা নিয়ে দ্বিধা দেখা দিয়েছিল। ও আমাকে আবারও একই অনুরোধ করলো, ‘মা, আমি মারা গেলে আমাকে তুমি একা কবরে রেখে আসবে? রেখো না। আমার ভয় করবে। তুমিও আমার সাথে যেও?’
সন্তানের আকুতি, সন্তানের ভয় আমাকে চুপ থাকতে দেয়নি। আমি ওকে শক্ত করে ধরেছি। তারপর স্পষ্ট করে বলেছি, ‘ঠিক আছে বাবা এমন হলে আমিও তোমার সাথে কবরে যাবো।’
সন্তানের কাছে নিজের প্রতিজ্ঞার কারণে মৃত্যু বিষয়টা আমার কাছে এখন আরো জটিল। প্রাকৃতিক কারণেই সন্তানকে ভালোবাসি, ভালোবাসি নিজের জীবনকেও। এ জন্যেই কী সন্তানের সুদীর্ঘ জীবনের প্রার্থনা আমার মধ্যে এতোটা প্রকট?