[bangla_day], [bangla_time], [bangla_date]

[bangla_day], [bangla_time], [bangla_date]

হোম সাহিত্য

নীনার বিয়ে

শেয়ার: https://www.timebulletin24.com/news/4qbfg2

আমি নাজনীন নীনা,এসেছি ঢাকা থেকে।

স্যার আপনি তো অধ্যাপক হামিদুল হক চৌধুরী!

– জি।সঠিক ঠিকানাতেই এসেছ।

– স্যার,জামিলুক হক চৌধুরী…

– ও, তুমি তাহলে জামিলুল হক চৌধুরীর কাছেই এসেছো?

-জি স্যার।

-জামিল আমার একমাত্র পুত্র।

-ও।

আংকেল আমি খুব বিপদে পড়েই এসেছি।ভীষণ বিপদ।

-দেখো মেয়ে, জগতের সবাই ভীষণ বিপদেই আছে।তুমি আমি সবাই বিপদে।ভীষন বিপদে পড়েই সকলে চরকির মত ঘুরে বেড়াচ্ছে। বিপদেও কোন সমস্যা ছিলনা।,সমস্যা হচ্ছে কেউ বিপদমুক্ত হতে চায় না।বরং বিপদ তৈরি করে।নিজের বিপদ নিজেই তৈরি করে। মানুষ আসলে বিপদে জড়িয়ে থাকতেই ভালোবাসে।বিপদেই আনন্দ খোঁজে,বিপদ বিলাস।মানুষ যে বিপদে থাকে তাও বোঝে না,না বুঝেই করে বিপদের চাষ। আশ্চর্য কি জানো?

মেয়েটি কথা বলছে না।ঘাড় নেড়ে নেড়ে উত্তর দিচ্ছে। কিন্তু অধ্যাপক সাহেব নাছোর বান্দা,বিপদের দর্শন পড়িয়েই ছাড়বে। গভীর তৃপ্তি নিয়ে তিনি বলছেন- শোন মেয়ে,সবাই যে বিপদের চাষ করে তা কিন্তু না।কেউ কেউ বিপদ তাড়ানোর যুদ্ধও করে।বিপদ দেয় দৌড়, এক দৌড়ে পালিয়ে চলে যায় গন্ধম গাছের ওপাশে।তখন আর বিপদ এপাশে আাসতে পারে না।নিয়ম নাই,নিষেধ আছে। অধ্যাপক সাহেব মেয়েটির দিকে তাকিয়ে মৃদু হাসলেন।দেখলেন, মেয়েটির কথা শুনতে খুব একটা আগ্রহ নেই। – নীনা, বুঝতে পারছি তুমি খুব বিপদে পড়েছ।কিন্তু বিপদ তাড়ানো লোক সম্পর্কে তোমাকে বলতে ইচ্ছে করছে।জীবনে এই বিষয়টি জানা খুবই জরুরি। বিপদমুক্ত লোক চেনাও অতি আবশ্যক।

-জি আংকেল বলেন।

মেয়েটিকে দুশ্চিন্তাগ্রস্হ মনে হচ্ছে। ওর চেহারায় অমনোযোগের ছাপ।

– আচ্ছা, বিপদমুক্ত বিষয় নিয়ে পরে বলব।এখন বল,তোমার ভীষণ বিপদটি কি?সংক্ষেপে না।বিস্তারিত বল। – আংকেল, আমার মা আমার বিয়ে ঠিক করেছে।ছেলে জাপানে থাকে,ইন্জিনিয়ার। করোনার ঝামেলা শেষ হলেই বিবাহ অনুষ্ঠান।

– এটা কত নম্বর বিপদ!

– আংকেল আপনি ঠাট্টা করবেন না। এই বিয়েতে আমার মত নেই। আমার আব্বুকে আমি জানিয়েছি। তিনি বলেছেন আমার পছন্দের ছেলের সাথেই আমাকে বিয়ে দিবেন।কিন্ত তার আগে ছেলেটির সাথে কথা বলবেন। অথচ জামিলের ফোন বন্ধ, সারাক্ষণ সে অফলাইনে। এজন্যই এতদুর অবধি আমার আসা।

-বুঝতে পারছি তোমার বিপদ কতটা গুরুতর।আচ্ছা, তুমি কি জামিলকে পছন্দ কর! ঐ গাধাটাকেই বিয়ে করতে চাও?

-জি। মাথা নিচু করে উত্তর দিল নীনা।

-তুমি যে তাকে পছন্দ কর,তাকে বিয়ে করতে চাও, সে কি তা জানে?

-না জানে না। আমি ওনাকে কখনও বলিনি।বলিনি তাতে কি,আজ বলব।আজ বললে হবে না?

-বুঝতে পারছি তোমার বিপদটি আসলে ভীষণ রকমের জটিল। এটা কোন ধরনের কমপ্লেক্স সেটা খঁুজে দেখতে হবে।তোমার বিষয়টা একটা কেস স্টাডি হিসেবে নেয়া যেতে পারে।তারপর পুংখানুপুংখ বিশ্লেষন করে একটা ফলাফল আনা যেতে পারে।পাঠ্যসুচিতে আনলেও খুব সিরিয়াস বিষয় হবে এটা আমার দৃঢ় বিশ্বাস।অবশ্য প্রেম ঘটিত বিষয়ের থিওরি মেলানোটা একটু কঠিন।

– বাবা, আমাকে একটু হেল্প করুন।মানে উনি যদি বিয়ে করতে রাজি না হন,আপনি কি একটু বুঝিয়ে বলবেন?

অধ্যাপক সাহেব আশ্চর্য হলেন,মেয়েটি ঘন ঘন সম্বোধন পরিবর্তন করছে। বিয়ে না হতেই বলছে বাবা।এটা যে কত লজ্জার তা কি জানে মেয়েটা! মেয়েটার শ্বাশুড়ি তো বিয়ের পর চারমাস কথাই বলেনি,লজ্জায় পুতুপুতু। বড়ই পরিতাপের বিষয় কোথায় গেলো সে পুতুপুতু! আচ্ছা মেয়েটা কি অতি চালাক নাকি গাধা?

– বাবা, ওনাকে কি ডেকে দিবেন?  কথা বলি।

– ডাকতে হবে না। সে এমনিতেই নীচে আসবে।ঘন্টায় ঘন্টায় চা খায়।সে থাকে দোতালায়, আমি নীচতলায়। নিশ্চয়ই এত পুরনো বিল্ডিংয়ে কাউকে থাকতে দেখোনি।এই দোতলা বাড়ীটি করেছিলেন আমার নানু শ্রী আলহাজ ছমির উদ্দিন আকন্দ। ছিয়াত্তর বিঘার এই জমিটি উনি কিনেছিলেন নিরান্জন কুমার সূত্রধরের কাছে।এনিয়ে বিরাট ইতিহাস আছে,শুনবে।

– অন্যদিন শুনব বাবা। আজকে আমাকে উদ্ধার করেন।

– নিশ্চয়ই উদ্ধার করব।তুমি পড়েছ ভীষন বিপদে আর আমি উদ্ধার করব না! নিশ্চয়ই করব।তবে জামিলের মাকে কিছু বলবে না।সে কিন্তু মানুষ ভালো।সমস্যা হলো,আমি যদি বলি পশ্চিম সে বলবে পূর্ব। সিদ্ধান্ত তোমার।উদ্ধারের কাজটি আমাকেও দিতে পারো,তাকেও দিতে পারো।

– বাবা, আপাতত আপনিই করুন।

– ঠিক আছে, তুমি তো খুব ভালো মেয়ে।তোমাকে আমার খুব পছন্দ হয়েছে। জামিলের সাথে বিয়ে হলে আমার অবসর জীবনটা ভালোভাবেই কাটবে। আচ্ছা শোন মা,একটা গোপন বিষয় তোমাকে জিজ্ঞেস করি।

-জি বাবা,গোপন বিষয় জিজ্ঞেস করেন।

– গোপন বিষয় হলো জামিল কী নিয়ে গবেষনা করছে? বিষয়বস্তু কি? আমি জিজ্ঞেস করলে বলে আমি ফিলোসফির অবসরপ্রাপ্ত  প্রফেসর, আমি বুঝব না। এটা নাকি সুক্ষ সায়েন্স। ফিলোসফি কি সায়েন্স না?

– জি বাবা। উনি আসলেই গাধা?

– এবার বল, তার গবেষণাটা কি? তার আগে শোন তোমার ছোট্ট একটা দুশ্চিন্তা দুর করে দেই। তোমার গাড়ীটি বাড়ীর ভিতরে ঢোকানো হয়েছে।আর ড্রাইভার পুকুরপাড়ে বাতাবীলেবু তলায় বাতাবি খাচ্ছে। জসিম খুব ভালো ছেলে।জসিম হচ্ছে এ বাড়ির কেয়ারটেকার।তার বাড়ী ধোপাকান্দি।জেনে রাখা ভালো,সে গ্রামে কোন ধোপা নাই। নীনা ভাবছে, একটা বিপদমুক্ত হতে কত বিপদ যে সামনে আসে কে জানে। অধ্যাপক সাহেব বললেন- চুপ করে আছো কেন নীনা? বল,তার গবেষণাটা কি নিয়ে।

– বাবা,তার গবেষণাটা হচ্ছে সময় নিয়ে। অর্থাৎ কাল নিয়ে।থিওরি হচ্ছে ‘কাল আপেক্ষিক, মহাকাল অখন্ড এবং আকারে অলীক।’ টাইটেল – দি থিওরি অব আউটার স্পেস এন্ড রিবার্থ। রূপান্তর বিজ্ঞান প্রাকৃতিক বিজ্ঞান। সমীকরণটি শুনবেন?

– শুনব বলো। – কাগজ কলম হলে ভালো হতো।

– কাগজ কলম কোন বিষয়? অধ্যাপকের বাড়িতে কাগজ কলম থাকবে না, তা কি করে হয়?

– না থাক, আজকে মুখেই বলি।জামিল নিশ্চয়ই লিখে আমাদের ব্যাখ্যা করবে। সমীকরণটা হলো  n= n÷t=0 এন ইকুয়াল টু এন বাই টি ইকুয়াল টু জিরো।এখানে এন হলো মহাকাল,টি হলো খন্ডকাল এবং জিরো হলো মহাশূন্যময়। সারকথা হলো প্রতিটি অভিব্যক্তিকেই শূন্য থেকে শুরু করে শূন্যতেই মিশতে হবে। অভিব্যক্তির পরিসমাপ্তকাল হলো মানবদেহ।

– জটিল মনে হচ্ছে। জটিল বিষয় নিয়ে এখন ভাবতে ইচ্ছে করছে না।

– না বাবা বিষয়টি জটিল না। রূপান্তর নিয়ে মানুষের বিশ্বাস ও অবিশ্বাস দুটোই ছিল। জামিল বিশ্বাসটির সায়েন্টিফিক ব্যাখ্যাটি রেডি করছে।

– এই তো জামিল এসে পড়েছে। জামিল দেখ বাবা নীনা এসেছে। মেয়েটিকে আমার খুব পছন্দ হয়েছে। নীনা ঝটপট উঠে দাঁড়িয়ে পড়লো। জামিল বললো, না বাবা আমি তো ওনাকে চিনতে পারছি না। নীনা বিস্মিত হয়ে বললো, আমাকে চিনতে পারছেন না? আমি আপনার ডিপার্টমেন্টের, এপ্লাইড ফিজিক্সের,আপনার দুবছরের জুনিয়র। এবার আমি ফাইনাল ইয়ারে।

– ওহহো, আমি চিনতে পারছি না। অধ্যাপক সাহেব মিটিমিটি হাসছেন। নীনা প্রানপনে পরিচয় তুলে ধরছে- আপনার পছন্দের শাড়ী পড়ে হাটতে চেষ্টা করছিলাম। পারছিলাম না,আপনি রিকশাতে টেনে তুলছিলেন।সেদিন আমার ডানহাতের তিনটা চুড়ি ভেঙে গেলো।

– ও হ্যাঁ।রিকশা কিছুদূর যেতেই তোমার আঁচল পেচিয়ে গেলো রিকশাতে। সেদিনতো বাসায় ফিরতে রাত তিনটা বেজেছিল।আমি বাসায় ঢুকতে পারি নাই।বাইরেই কাটিয়েছিলাম।তোমার সমস্যা হয়নি তো?

– এতদিনে এ প্রশ্ন!

দুজনে হাসতে লাগলো।অধ্যাপক সাহেব নিজেও হাসছেন, নিঃশব্দে। কোন কোন হাসিতে শব্দ করতে নেই। – নীনা তুমি এসে ভালো করেছ।দেখো আমার সমীকরণ মেলাতে পারো কিনা? নীনা জামিলের হাত ধরে হাটছে। শাড়ী পড়ে মেয়েটির নিশ্চয়ই কষ্ট হয়।অধ্যাপক সাহেব ভাবছেন,এদের ছেলেপুলে হলে সামলাবে কে?

ওমর ফারুক

মন্তব্য করুন

আপনার ইমেইল প্রকাশ করা হবে না। * চিহ্নিত ঘরগুলো আবশ্যক।

শেয়ার করুন