
ঢাকা ডেস্ক: পৃথিবীর মোট আয়তনের ৭০ শতাংশেরও বেশি অংশ জুড়ে থাকা মহাসমুদ্র কেবল একটি বিশাল জলরাশিই নয়, বরং এটি আমাদের গ্রহের প্রধান জীবনদায়ী চালিকাশক্তি। পৃথিবীর মোট পানির ৯৭ শতাংশ ধারণ করে থাকা এই মহাসমুদ্র থেকেই আসে মানুষের বেঁচে থাকার জন্য প্রয়োজনীয় অক্সিজেনের অর্ধেকেরও বেশি। এটি বৈশ্বিক আবহাওয়া নিয়ন্ত্রণ করার পাশাপাশি বায়ুমণ্ডলের ক্ষতিকর কার্বন ডাই অক্সাইড শুষে নিতে সবচেয়ে বড় ভূমিকা পালন করে। তবে মানুষের অনিয়ন্ত্রিত শিল্পায়ন, প্লাস্টিক পণ্যের অতিব্যবহার এবং আধুনিক জীবনযাত্রার কারণে আজ এই নীল সমুদ্র এক অভূতপূর্ব পরিবেশগত সংকটের মুখোমুখি দাঁড়িয়েছে, যা সরাসরি হুমকিতে ফেলছে মানবজাতির অস্তিত্বকে।
অর্থনৈতিক ও পরিবেশগত দিক থেকে মহাসমুদ্রকে বিশ্ববাসীর জন্য এক অপরিহার্য সম্পদের ভাণ্ডার হিসেবে বিবেচনা করা হয়। বিশ্বের ৩০০ কোটিরও বেশি মানুষের প্রোটিনের প্রধান উৎস হিসেবে কাজ করছে সামুদ্রিক মৎস্যসম্পদ। এর পাশাপাশি উপকূলীয় পর্যটন, নৌ-বাণিজ্য এবং সামুদ্রিক যাতায়াত ব্যবস্থাকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠা ‘নীল অর্থনীতি’ বা ব্লু ইকোনমি বিশ্বজুড়ে কোটি কোটি মানুষের কর্মসংস্থান সচল রাখছে। আধুনিক চিকিৎসা বিজ্ঞানেও সমুদ্রের ভূমিকা অনন্য; ক্যানসারসহ নানা জটিল রোগের জীবনরক্ষাকারী ওষুধ এবং পরিবেশবান্ধব বায়োফুয়েল তৈরির কাঁচামাল মিলছে সামুদ্রিক অণুজীব থেকে। তাছাড়া উপকূলীয় ম্যানগ্রোভ বন এবং প্রবাল প্রাচীরগুলো শক্তিশালী ঘূর্ণিঝড় ও জলোচ্ছ্বাসের বিরুদ্ধে প্রাকৃতিক দেওয়াল হিসেবে কাজ করে লাখ লাখ মানুষের জীবন রক্ষা করছে।
অথচ বিপুল সম্ভাবনাময় এই সামুদ্রিক পরিবেশ আজ মানুষের কারণেই ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে। পরিবেশ বিজ্ঞানীদের মতে, সমুদ্র দূষণের প্রায় ৮০ শতাংশেরই প্রধান উৎসস্থল হলো স্থলভাগ, যা নদী ও উপকূলীয় অঞ্চলের মাধ্যমে সরাসরি সমুদ্রে গিয়ে মিশছে। এই দূষণের সবচেয়ে বড় কারণ হিসেবে দেখা দিয়েছে প্লাস্টিক ও পলিথিন বর্জ্য। প্রতি বছর বিশ্বজুড়ে প্রায় ১ কোটি ২০ লাখ মেট্রিক টন প্লাস্টিক বর্জ্য সমুদ্রে গিয়ে পড়ছে। সামুদ্রিক ঢেউ এবং সূর্যের আলোর প্রভাবে এই প্লাস্টিকগুলো পরবর্তীতে ভেঙে ‘মাইক্রোপ্লাস্টিক’ বা অতি ক্ষুদ্র কণায় পরিণত হচ্ছে। মাছ ও অন্যান্য সামুদ্রিক প্রাণী এগুলোকে খাদ্য ভেবে ভুল করে গিলে ফেলছে, যার ফলে বিষাক্ত এই প্লাস্টিক কণা মাছের মাধ্যমে সরাসরি মানুষের খাদ্যশৃঙ্খলে প্রবেশ করছে।
প্লাস্টিক ছাড়াও কৃষিকাজে ব্যবহৃত অতিরিক্ত নাইট্রোজেন ও ফসফরাসযুক্ত রাসায়নিক সার বৃষ্টির পানিতে ধুয়ে নদী হয়ে সমুদ্রে গিয়ে পড়ছে। এই অতিরিক্ত পুষ্টি উপাদানের কারণে সমুদ্রে শ্যাওলার অনিয়ন্ত্রিত অতিবৃদ্ধি বা ‘অ্যালগাল ব্লুম’ ঘটে। পরে এই শ্যাওলাগুলো যখন পচে যায়, তখন তারা পানির সমস্ত অক্সিজেন শুষে নেয়। ফলে সমুদ্রের বুকে তৈরি হয় মাইলের পর মাইল বিস্তৃত ‘ডেড জোন’ বা অক্সিজেনহীন মৃত অঞ্চল, যেখানে কোনো মাছ বা জলজ প্রাণী বাঁচতে পারে না। এর সাথে যুক্ত হয়েছে শিল্পকারখানার পারদ, সীসা ও অপরিশোধিত রাসায়নিক বর্জ্য এবং সমুদ্রে চলাচলকারী জাহাজ থেকে নিঃসৃত তেল, যা পানির বিষাক্ততা দিন দিন বাড়িয়ে তুলছে। একই সাথে, বায়ুমণ্ডলে মানুষের তৈরি অতিরিক্ত কার্বন ডাই অক্সাইড শুষে নেওয়ার কারণে সমুদ্রের পানির অম্লতা বা অ্যাসিডের পরিমাণ আশঙ্কাজনকভাবে বাড়ছে। এই ‘ওশান অ্যাসিডিফিকেশন’-এর ফলে সমুদ্রের তলদেশের প্রবাল প্রাচীরগুলো ধ্বংস হয়ে যাচ্ছে এবং কাঁকড়া ও শামুক-ঝিনুকের মতো খোলসযুক্ত প্রাণীরা তাদের প্রতিরক্ষামূলক আবরণ তৈরি করতে পারছে না।
সমুদ্রের এই ভয়াবহ রূপ পরিবর্তন ও পরিবেশগত বিপর্যয় কেবল পানির নিচেই সীমাবদ্ধ থাকছে না, বরং এর মারাত্মক প্রভাব সরাসরি আছড়ে পড়ছে মানুষের জীবন ও অর্থনীতিতে। সমুদ্রের তাপমাত্রা বৃদ্ধি ও দূষণের কারণে বহু বিরল প্রজাতির সামুদ্রিক জীব বিলুপ্তির পথে। মাছের উৎপাদন আশঙ্কাজনকভাবে কমে যাওয়ায় উপকূলীয় অঞ্চলের মৎস্যজীবী ও সামগ্রিক বিশ্ব বাজার বড় ধরনের অর্থনৈতিক ক্ষতির মুখে পড়েছে। বিজ্ঞানীরা সতর্ক করেছেন যে, সমুদ্রের এই সামগ্রিক ক্ষয়ক্ষতি পুরো পৃথিবীর জলবায়ুকে ওলটপালট করে দিচ্ছে, যার খেসারত দিতে হচ্ছে মানবজাতিকেই।
এই বৈশ্বিক সংকট থেকে পরিত্রাণের জন্য এখন বিশ্বজুড়ে সমন্বিত ও কঠোর পদক্ষেপ নেওয়ার কোনো বিকল্প নেই। জাতিসংঘের টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা বা এসডিজি-১৪ অর্জনে বিশ্বনেতারা সামুদ্রিক সম্পদের টেকসই ব্যবহার এবং মহাসমুদ্র সুরক্ষায় নানা আন্তর্জাতিক চুক্তি ও নীতিমালা তৈরি করছেন। তবে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, প্লাস্টিক দূষণ ঠেকাতে হলে একক ব্যবহার্য প্লাস্টিক সম্পূর্ণ বর্জন করে বিশ্বজুড়ে বর্জ্যহীন উৎপাদন ব্যবস্থা বা ‘সার্কুলার ইকোনমি’ চালু করতে হবে। একই সাথে নদী ও সমুদ্র উপকূলে বর্জ্য ফেলা বন্ধে স্থানীয় পর্যায়ে কঠোর আইন প্রয়োগ এবং জনসচেতনতা বৃদ্ধি করা জরুরি। মহাসমুদ্রের মৃত্যু মূলত পৃথিবীর জীবকুলের অবসানকেই ডেকে আনবে; তাই মানবসভ্যতাকে টিকিয়ে রাখতে হলে এই মুহূর্তে সমুদ্র বাঁচানোর লড়াইয়ে সবাইকে শামিল হতে হবে।