
ছবি সংগৃহীত
ছবি সংগৃহীত
গাজীপুর, ২৩ জুন: আর্থিক সংকট ও দীর্ঘদিনের ব্যবসায়িক জটিলতার কারণে গাজীপুরের বোর্ডবাজার এলাকার পোশাক শিল্প প্রতিষ্ঠান ইউনিক ডিজাইনার্স লিমিটেড এবং ইউনিক ওয়াশিং লিমিটেড স্থায়ীভাবে বন্ধ ঘোষণা করা হয়েছে। এর ফলে একযোগে প্রায় ১ হাজার ৮০০ শ্রমিক চাকরি হারিয়ে অনিশ্চয়তার মুখে পড়েছেন।
মঙ্গলবার (২৩ জুন) সকালে কারখানার শ্রমিক বিল্লাল সোহাগ জানান, তিনি পরিবার নিয়ে গাজীপুরে বসবাস করে দীর্ঘদিন ধরে ওই প্রতিষ্ঠানের আয়ের ওপর নির্ভরশীল ছিলেন। হঠাৎ কারখানা বন্ধ হয়ে যাওয়ায় পরিবার নিয়ে চরম আর্থিক সংকটে পড়েছেন।
তিনি বলেন, “আমার ছেলে ষষ্ঠ শ্রেণিতে ভর্তি হয়েছে। তার পড়াশোনার খরচ চালানো এখন কঠিন হয়ে পড়বে। স্ত্রীও অসুস্থ। সামনে কী করব বুঝতে পারছি না। শুনেছি আগামী ২৭ জুলাই সব পাওনা পরিশোধ করা হবে, তবে সেই অর্থ আদৌ পাব কি না তা নিয়ে উদ্বিগ্ন।”
গাজীপুর শিল্প পুলিশের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার মোহাম্মদ খলিলুর রহমান জানান, আর্থিক সংকটসহ বিভিন্ন সমস্যার কারণে প্রতিষ্ঠান কর্তৃপক্ষ কারখানা দুটি স্থায়ীভাবে বন্ধের সিদ্ধান্ত নিয়েছে। গত ১৬ জুন থেকেই উৎপাদন কার্যক্রম বন্ধ রয়েছে।
শ্রমিকদের বকেয়া বেতন, সার্ভিস বেনিফিট এবং অন্যান্য আইনানুগ পাওনা পরিশোধের লক্ষ্যে গত ২১ জুন গাজীপুর ইন্ডাস্ট্রিয়াল পুলিশ-২-এর পুলিশ সুপারের কার্যালয়ে মালিকপক্ষ, শ্রমিক প্রতিনিধি এবং সংশ্লিষ্ট সরকারি দপ্তরের কর্মকর্তাদের অংশগ্রহণে একটি ত্রিপক্ষীয় বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। বৈঠকে সভাপতিত্ব করেন ইন্ডাস্ট্রিয়াল পুলিশ-২-এর পুলিশ সুপার মোহাম্মদ আমজাদ হোসাইন।
বৈঠকে শিল্প পুলিশ, কলকারখানা ও প্রতিষ্ঠান পরিদর্শন অধিদপ্তর (ডাইফ), শ্রম অধিদপ্তরের কর্মকর্তা, প্রতিষ্ঠানের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ফরিদ আহমেদ, বিভিন্ন শ্রমিক ফেডারেশনের নেতা এবং শ্রমিক প্রতিনিধিরা উপস্থিত ছিলেন।
বৈঠকের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী শ্রমিকদের এপ্রিল মাসের অবশিষ্ট ১৫ দিনের এবং মে মাসের ১৮ দিনের বকেয়া বেতন পরিশোধ করা হবে। একই সঙ্গে কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বকেয়া বেতনও পরিশোধের আওতায় থাকবে।
এছাড়া চাকরি অবসানের কারণে শ্রমিকদের ৩০ দিনের মূল বেতনের সমপরিমাণ অর্থ নোটিশ পে হিসেবে দেওয়া হবে। চাকরির প্রতি বছরের জন্য ২০ দিনের মূল বেতন হারে সার্ভিস বেনিফিট প্রদান করা হবে। পাশাপাশি প্রমাণ সাপেক্ষে মাতৃত্বকালীন সুবিধা, অর্জিত ছুটির অর্থ, পদত্যাগকারী শ্রমিকদের রিজাইন বেনিফিট এবং বিভিন্ন তহবিলে জমাকৃত অর্থও পরিশোধ করা হবে।
চুক্তি অনুযায়ী আগামী ২৭ জুলাই শ্রমিকদের সব পাওনা একযোগে পরিশোধ করার কথা রয়েছে। তবে শ্রমিক নেতাদের দাবি, এই সমঝোতা চুক্তি শ্রমিকবান্ধব নয় এবং এতে শ্রম আইন অনুযায়ী শ্রমিকদের সব প্রাপ্য সুবিধা নিশ্চিত করা হয়নি।
বাংলাদেশ গার্মেন্টস অ্যান্ড শিল্প শ্রমিক ফেডারেশনের গাজীপুর মহানগর সভাপতি শফিউল আলম বলেন, “ঈদের আগে বেতন-ভাতা ও বোনাস নিয়ে যে সংকট তৈরি হয়েছিল, তা আলোচনার মাধ্যমে সমাধান করা হয়। কিন্তু পরবর্তীতে মালিকপক্ষ কারখানা চালু না করে স্থায়ীভাবে বন্ধের সিদ্ধান্ত নেয়। ফলে শত শত শ্রমিক হঠাৎ করেই বেকার হয়ে পড়েছেন।”
তিনি আরও অভিযোগ করেন, ২১ জুনের চুক্তিতে শ্রম আইন অনুযায়ী শ্রমিকদের ন্যায্য ক্ষতিপূরণ ও অন্যান্য প্রাপ্য সুবিধা পুরোপুরি নিশ্চিত হয়নি। ফলে অনেক শ্রমিক তাদের অধিকার থেকে বঞ্চিত হওয়ার আশঙ্কা করছেন।
কারখানা বন্ধের ঘটনায় কর্মহীন শ্রমিকদের মধ্যে ক্ষোভ, উদ্বেগ ও অনিশ্চয়তা বিরাজ করছে। তাদের দাবি, প্রতিশ্রুত পাওনা দ্রুত পরিশোধের পাশাপাশি বিকল্প কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করুক।