৪৫ বছর পলাতক থাকার পর গ্রেফতার মেজর মোজাফফর: গোয়েন্দা নজরদারিতে মিলল চূড়ান্ত সূত্র

ঢাকা | ১৭ জুলাই ২০২৬
প্রায় সাড়ে চার দশক ধরে পরিচয় গোপন রেখে আত্মগোপনে ছিলেন রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান হত্যা মামলায় দণ্ডপ্রাপ্ত সাবেক সেনা কর্মকর্তা মেজর মোজাফফর হোসেন। একাধিক পরিচয় ব্যবহার, দীর্ঘদিন বিদেশে অবস্থান এবং নীরব জীবনযাপনের পরও শেষ পর্যন্ত গোয়েন্দাদের নজর এড়াতে পারেননি তিনি। দীর্ঘ কয়েক মাসের নজরদারি ও তথ্য-যাচাইয়ের পর রাজধানীর বনানী ডিওএইচএসের একটি বাসা থেকে তাকে গ্রেফতার করা হয়েছে।
ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের (ডিবি) একটি বিশেষ দল গত বুধবার (১৫ জুলাই) গভীর রাতে অভিযান চালিয়ে তাকে আটক করে। পরবর্তী আইনি প্রক্রিয়া সম্পন্ন করে তাকে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে।
দীর্ঘ তদন্তের কেন্দ্রবিন্দু ছিল দুটি তথ্য
তদন্ত-সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে, গোয়েন্দাদের হাতে শুরুতে ছিল মাত্র দুটি নির্ভরযোগ্য তথ্য। একটি ছিল—মোজাফফরের মেয়ে রাজধানীর একটি বেসরকারি টেলিকম প্রতিষ্ঠানে কর্মরত। অন্যটি ছিল—তার নাকের নিচে একটি স্পষ্ট কালো তিল রয়েছে।
এই দুটি তথ্যকে ভিত্তি করে কয়েক মাস ধরে মেয়ের কর্মস্থল, চলাচল এবং সম্ভাব্য পারিবারিক সংযোগ বিশ্লেষণ করা হয়। একপর্যায়ে বনানী ডিওএইচএসের একটি বাসাকে নজরদারির আওতায় আনা হয়। এরপর ছদ্মবেশে এলাকায় অবস্থান নিয়ে বাসাটির বাসিন্দা ও যাতায়াতকারীদের বিষয়ে তথ্য সংগ্রহ করেন গোয়েন্দারা।
পরিচয় নিশ্চিত হওয়ার পরই অভিযান
ডিবি সূত্র জানায়, বুধবার রাতে অভিযানের সময় গোয়েন্দারা সাধারণ দর্শনার্থীর পরিচয়ে বাসার দরজায় যান। দরজা খুললে এক বৃদ্ধের সঙ্গে তাদের কথোপকথন শুরু হয়। কথাবার্তার একপর্যায়ে তার নাকের নিচের জন্মগত তিল গোয়েন্দাদের সন্দেহ আরও জোরালো করে।
পরিচয় নিশ্চিত করতে তাকে নিজের পরিচয় সম্পর্কে প্রশ্ন করা হলে তিনি নিজেকে “মোজাফফর” এবং বাসার বাসিন্দার বাবা হিসেবে পরিচয় দেন। এরপরই গোয়েন্দারা তাকে আটক করেন। অভিযানে অংশ নেওয়া কর্মকর্তাদের ভাষ্য, দীর্ঘদিনের নজরদারির পর এই তথ্যই ছিল চূড়ান্ত নিশ্চিত হওয়ার ভিত্তি।
চার দশকের বেশি সময় আত্মগোপনে
গোয়েন্দা তথ্য অনুযায়ী, ১৯৮১ সালের ৩০ মে চট্টগ্রাম সার্কিট হাউসে রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান হত্যাকাণ্ডের পর মোজাফফর হোসেন দেশ ত্যাগ করেন। দীর্ঘ সময় তিনি ভারতে ভিন্ন পরিচয়ে অবস্থান করেন বলে তদন্তকারীদের দাবি। এ সময়ে তিনি নিজের পরিচয় গোপন রাখতে বিভিন্ন নাম ও নথিপত্র ব্যবহার করেন এবং অতীতের অধিকাংশ যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন রাখেন।
পরবর্তীতে তিনি গোপনে বাংলাদেশে ফিরে রাজধানীর বনানী ডিওএইচএস এলাকায় বসবাস শুরু করেন। স্থানীয়দের কাছে তিনি একজন সাধারণ প্রবীণ ব্যক্তি হিসেবেই পরিচিত ছিলেন।
জিয়া হত্যা মামলায় অভিযোগ
১৯৮১ সালের ৩০ মে ভোরে চট্টগ্রাম সার্কিট হাউসে সংঘটিত হামলায় তৎকালীন রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান নিহত হন। মামলার অভিযোগ অনুযায়ী, মেজর মোজাফফর হোসেন ওই অভিযানে অংশ নেন এবং রাষ্ট্রপতিকে লক্ষ্য করে গুলি চালানো সেনা কর্মকর্তাদের অন্যতম ছিলেন। অভিযোগ রয়েছে, ঘটনার পর তিনি চট্টগ্রামের তৎকালীন জিওসি মেজর জেনারেল আবুল মঞ্জুরকে টেলিফোনে রাষ্ট্রপতির মৃত্যুর খবর জানান।
সেনাবাহিনীর কাছে হস্তান্তর
ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের অতিরিক্ত কমিশনার মো. শফিকুল ইসলাম জানান, মোজাফফর হোসেন কোর্ট মার্শালে দণ্ডপ্রাপ্ত পলাতক আসামি ছিলেন। প্রয়োজনীয় আইনি প্রক্রিয়া শেষে তাকে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে।
অন্যদিকে আন্তঃবাহিনী জনসংযোগ পরিদপ্তরের (আইএসপিআর) পরিচালক লেফটেন্যান্ট কর্নেল সামি উদ দৌলা চৌধুরী বলেন, মোজাফফর হোসেন অবসরপ্রাপ্ত ছিলেন না। সেনাবাহিনীর প্রচলিত বিধি অনুযায়ী তার বিরুদ্ধে পরবর্তী আইনগত ও প্রশাসনিক ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।
তদন্তের মূল্যায়ন
তদন্ত-সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের মতে, দীর্ঘ ৪৫ বছর আত্মগোপনে থাকা একজন দণ্ডপ্রাপ্ত আসামিকে গ্রেফতারের পেছনে ধারাবাহিক গোয়েন্দা নজরদারি, তথ্য বিশ্লেষণ এবং পরিচয় যাচাইয়ের সমন্বিত প্রচেষ্টা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। তাদের ভাষ্য, পরিচয় বদলানো সম্ভব হলেও দীর্ঘ সময় পরও কিছু স্থায়ী বৈশিষ্ট্য এবং পারিবারিক সংযোগ শেষ পর্যন্ত তদন্তকে সঠিক গন্তব্যে পৌঁছে দেয়।