
নাজমুল হোসেন, রাজবাড়ী।
আর্থিক অনিয়ম, স্বেচ্ছাচারিতা এবং নারী সহকর্মীদের যৌন হয়রানির গুরুতর অভিযোগসহ নানা অনিয়মের পাহাড় রাজবাড়ীর গোয়ালন্দ উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স প্রশাসনের বিরুদ্ধে। এ সকল অনিয়মকে কেন্দ্র করে গোয়ালন্দ উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে কর্তব্যরত হিসাবরক্ষক আবুল কালাম আজাদের নেতৃত্বে গড়ে উঠেছে একটি সিন্ডিকেট। অভিযোগ রয়েছে, উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তাও এই সিন্ডিকেটের অনুমতি ছাড়া কোনো কাজ করেন না। খোঁজ নিয়ে জানা যায়, গোয়ালন্দ উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের বহির্বিভাগে প্রতিদিন ৭ থেকে সাড়ে ৭শ রোগী চিকিৎসা সেবা গ্রহণ করেন। এর জন্য তাদের ৩ টাকা মূল্যের টিকিট সংগ্রহ করতে হয়। কিন্তু অলিখিতভাবে এই টিকিটের মূল্য হয়ে গেছে ৫ টাকা। ভাঙতি না থাকার অজুহাতে কোনো রোগী ১০ টাকা দিলেও তাকে আর কোনো টাকা ফেরত দেওয়া হয় না। আবার কোনো রোগী যদি টাকা ফেরতের জন্য জোড়াজুড়ি করে, তবে তাকে ৫ টাকা ফেরত দেওয়া হয়। যদিও রোগীর কাছ থেকে সামান্য টাকা বেশি নেওয়া হয়, কিন্তু দিন শেষে অতিরিক্ত আদায় করা টাকার পরিমাণ দাঁড়ায় দেড় থেকে ২হাজার টাকা। সরেজমিন গোয়ালন্দ উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে গিয়ে দেখা যায়, বহির্বিভাগে রোগীদের টিকিট দিচ্ছেন কাউন্টার ইনচার্জ মো. আলতাফ হোসেন এবং তাকে সহযোগিতা করছেন শিলা রানী। সাংবাদিকের উপস্থিতি টের পেয়ে কাউন্টার ইনচার্জ মো. আলতাফ হোসেন সটকে পড়েন। এ সময় আউটসোর্সিংয়ের কর্মচারী শিলা রানী জানান, গত দুই মাস ধরে তিনি বহির্বিভাগের কাউন্টারে দায়িত্ব পালন করছেন। ভাঙতি না থাকার কারণে যে অতিরিক্ত টাকা হয়, তা তিনি হাসপাতালের অফিস সহকারী শিব শংকরের কাছে জমা দেন। সেই সাথে টিকিটের ৩ টাকা হিসেবেও তিনি তাঁর কাছেই জমা দেন। তবে হাসপাতালের অফিস সহকারী শিব শংকর অতিরিক্ত টাকা গ্রহণের বিষয়টি অস্বীকার করে বলেন, ‘আমি শুধু ৩ টাকার হিসেবেই টাকা জমা নিই।’ গত সোমবার (১৩ জুলাই) গোয়ালন্দ উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে কথা হয় স্বাস্থ্য বিভাগের খাদ্য পরিদর্শক মাধবী সরকারের সাথে। তিনি চরম ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, ‘আমি আজ এখান থেকে বদলি হয়ে চলে যাচ্ছি। হাসপাতালের হিসাবরক্ষক আবুল কালাম আজাদের নেতৃত্বে গঠিত সিন্ডিকেট আমার এখানে কর্মকালে জীবনটা অতিষ্ট করে তুলেছে। খাদ্য পরিদর্শক হিসেবে আমার দায়িত্ব এই উপজেলার খাদ্যের মান নিয়ন্ত্রণ করা। কিন্তু স্বয়ং হাসপাতালেই রোগী পরিবহনের ট্রলিতে করে রোগীদের খাবার সরবরাহ করা হয়, যা চরমভাবে স্বাস্থ্যঝুঁকিপূর্ণ।’ হাসপাতালের হিসাবরক্ষক আবুল কালাম আমার কাছে খাঁটি ঘি, মোবাইল ফোন ইত্যাদি দাবি করতেন। আমি তাঁর দাবি পূরণ করতে না পারায় তিনি আমাকে প্রতিনিয়ত হয়রানি করতেন। কিছুদিন আগে আমি অসুস্থ হলে মেডিকেল ছুটির প্রয়োজন হয়। কিন্তু এই ছুটি পাশ করানোর জন্য আবুল কালাম আমার কাছে ১০ হাজার টাকা দাবি করেন। শুধু তাই নয়, অন্যায়ভাবে আমার ৭ মাসের বেতন আটকে রেখেছিলেন হিসাবরক্ষক আবুল কালাম। পরে বর্তমান স্বাস্থ্য কর্মকর্তার আগের কর্মকর্তা যোগদান করে আমার বেতন ছাড় করেন। এছাড়া আমি জিপি ফান্ড থেকে লোনের আবেদন করলে আবুল কালাম আমার কাছে ৩৫ হাজার টাকা ঘুষ দাবি করেন।’ তিনি আরও বলেন, ‘নতুন যে উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা এখানে যোগদান করেন, শুরুর দিনে ভালোই থাকেন, কিন্তু কী যে হয়, কিছুদিনের মধ্যেই তিনি ওই সিন্ডিকেটের কাছে জিম্মি হয়ে পড়েন।’ জানা যায়, হিসাবরক্ষক আবুল কালাম আজাদ পূর্বের কর্মস্থলে থাকাকালীন সময়ে তাঁর বিরুদ্ধে দুর্নীতি দমন কমিশনে একই ধরনের বিভিন্ন অভিযোগ ছিল। এই অভিযোগের প্রেক্ষাপটে গত ২ ডিসেম্বর ২০২৪ তারিখে স্বাঃ অধিঃ/শৃঙ্খলা-৫৪/২০২২/৩৭৮৩/১(৫) নং স্মারকে অভিযোগ প্রমাণ হয়েছে বলে নিশ্চিত করেন। এই অভিযোগের প্রেক্ষাপটে ওই চিঠিতে তাঁকে তিরস্কার দণ্ড (লঘু দণ্ড) ও চাকরি বহিতে লাল কালি দ্বারা লিপিবদ্ধ করার সুপারিশ করে অভিযোগ নিষ্পত্তি করা হয়। নাম প্রকাশ না করার শর্তে হাসপাতালের এক নারী কর্মচারী জানান, হিসাবরক্ষক আবুল কালাম আজাদ তাঁকে একদিন নোংরা প্রস্তাব দেন। এ সময় তিনি বিরূপ প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করে চিল্লাচিল্লি করেন। বিষয়টি হাসপাতালের অন্যান্য স্টাফরাও সেদিন দেখেছিলেন। এ বিষয়ে নাম প্রকাশ না করে একজন স্টাফ জানান, ওই নারী কর্মচারীকে আবুল কালাম আজাদ কী বলেছেন তা আমরা শুনিনি। তবে ওই নারী কর্মচারীর বিরূপ প্রতিক্রিয়া ও চেঁচামেচি দেখেছিলাম। গোয়ালন্দ উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের হিসাবরক্ষক মো. আবুল কালাম আজাদ সকল অভিযোগ অস্বীকার করে বলেন, ‘মাধবী সরকার খাদ্য পরিদর্শক হিসেবে কর্মরত ছিলেন, তাই খাঁটি ঘি কিনে দিতে বলেছিলাম। এর জন্য তাঁকে আমি টাকা দিয়ে দিতাম। আর তিনি ঢাকায় যাতায়াত করেন বিধায় তাঁকে একটি ফোন সেট কিনে আনতে বলেছিলাম, যার টাকা আমি অবশ্যই পরিশোধ করতাম।’ তিনি আরও বলেন, ‘পূর্বের কর্মস্থলে আমার বিরুদ্ধে দুদকে যে অভিযোগ ছিল, তা নিষ্পত্তি হয়ে গেছে।’ এ বিষয়ে কথা বলার জন্য গোয়ালন্দ উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. মারুফ হাসানের অফিসে গত মঙ্গলবার (১৪ জুলাই) গেলে তাঁর অফিস থেকে জানানো হয়, ‘স্যার মিটিংয়ে আছেন’। এরপর (১৫ জুলাই) বুধবার তাঁর অফিসে গেলেও তাঁকে অফিসে পাওয়া যায়নি। অফিস থেকে বলা হয়, ‘স্যার ছুটিতে আছেন’। এরপর তাঁর মোবাইল ফোনে একাধিকবার ফোন করলেও তিনি রিসিভ করেননি। মুঠোফোনে ম্যাসেজ দিলেও তিনি তার উত্তর দেননি। এ প্রসঙ্গে রাজবাড়ীর সিভিল সার্জন ডা. এস. এম. মাসুদ জানান, এসব অভিযোগ প্রসঙ্গে তিনি অবগত নন। তবে এ ব্যাপারে খোঁজখবর নিয়ে ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে। প্রতিবেদন ও ছবি: নাজমুল হোসেন, রাজবাড়ী। তারিখ: ২০/০৭/২০২৬ যোগাযোগ: ০১৩১-৬৬০ ৮০৮৭, [email protected]