
ঢাকা: রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন সিটি কর্পোরেশন ও পৌরসভায় পরিচালিত ২১২টি নগর মাতৃসদন ও স্বাস্থ্যকেন্দ্রের কার্যক্রম বন্ধ হওয়ার উপক্রম হয়েছে। এর ফলে একদিকে যেমন লাখ লাখ নগর দরিদ্র মৌলিক চিকিৎসা সেবা থেকে বঞ্চিত হওয়ার ঝুঁকিতে পড়েছেন, অন্যদিকে এসব কেন্দ্রে কর্মরত ৩ হাজার ৪৭২ জন দক্ষ কর্মী পড়েছেন চরম চাকরি অনিশ্চয়তায়।
বৃহস্পতিবার (৩০ জুলাই) ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটিতে (ডিআরইউ) আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে বিভিন্ন বেসরকারি ও সামাজিক সংগঠনের প্রতিনিধিরা এ আশঙ্কার কথা জানান। ‘কোয়ালিশন ফর দ্য আরবান পূওর’ (কাপ), ‘বিওএসসি’ ও ‘সেফ হেল্প গ্রুপ নেটওয়ার্ক’-এর যৌথ উদ্যোগে এই সংবাদ সম্মেলনের আয়োজন করা হয়।
সংবাদ সম্মেলনে জানানো হয়, দেশের ১২টি সিটি কর্পোরেশন এবং ২১টি পৌরসভায় স্থানীয় সরকার বিভাগের অধীনে পাবলিক-প্রাইভেট পার্টনারশিপ (পিপিপি) মডেলে ১৫টি এনজিওর মাধ্যমে ৪৫টি নগর মাতৃসদন (CHRCC) ও ১৬৭টি নগর স্বাস্থ্যকেন্দ্র (PHCC) পরিচালিত হয়ে আসছে। এসব কেন্দ্রে ১৭ মিলিয়নেরও বেশি নগরবাসীকে প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা, প্রসূতি সেবা, শিশু টিকাদান, পরিবার পরিকল্পনা এবং মা ও শিশুর পুষ্টির মতো গুরুত্বপূর্ণ সেবা দেওয়া হতো। দরিদ্র জনগোষ্ঠীর জন্য ‘রেড কার্ড’-এর মাধ্যমে ৩০ শতাংশ বিনামূল্যে চিকিৎসা পাওয়ার সুবিধাও ছিল।
উপস্থিত বক্তারা বলেন, এশীয় উন্নয়ন ব্যাংকের (এডিবি) আর্থিক সহায়তায় চলা এ প্রকল্পের মেয়াদ গত ৩০ জুন শেষ হয়েছে। গত ২২ এপ্রিল কেবিনেট ডিভিশনের এক বৈঠকে নগর প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা কার্যক্রম স্থানীয় সরকার বিভাগ থেকে স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়ে হস্তান্তরের সিদ্ধান্ত হয়। তবে পূর্ণাঙ্গ পরিকল্পনা, অর্থ বরাদ্দ ও চুক্তি ছাড়াই হুট করে এই স্থানান্তরের প্রক্রিয়া শুরু হওয়ায় এক ধরনের প্রশাসনিক শূন্যতা তৈরি হয়েছে।
গত ১ জুলাই থেকে মানবিক কারণে এনজিওগুলো নিজ দায়িত্বে কেন্দ্রগুলোর সেবা চালু রাখলেও চলতি মাসের পর তাদের পক্ষে বাড়ি ভাড়া, ওষুধপত্র ক্রয় ও কর্মীদের বেতন বহন করা অসম্ভব হয়ে পড়েছে। ফলে যেকোনো মুহূর্তে এই সেবা কার্যক্রম পুরোপুরি বন্ধ হয়ে যেতে পারে।
বক্তারা সতর্ক করে বলেন, সেবা বন্ধ হলে শহর এলাকায় টিকাদান ব্যাহত হয়ে হামসহ বিভিন্ন সংক্রামক রোগের প্রাদুর্ভাব ঘটতে পারে। পাশাপাশি হোম ডেলিভারি বৃদ্ধি পেয়ে মা ও শিশু মৃত্যুর ঝুঁকি বাড়াবে। বেকার হয়ে পড়বেন ৩,৪৭২ জন কর্মী, যাদের বড় একটি অংশই নারী।
পরিস্থিতি মোকাবিলায় সংবাদ সম্মেলনে সাত দফা দাবি ও প্রস্তাব তুলে ধরা হয়:
১. কোনো অবস্থাতেই নগর স্বাস্থ্যসেবা বন্ধ করা যাবে না। স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় বা স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মাধ্যমে দ্রুত এনজিওগুলোর সঙ্গে মধ্যবর্তী চুক্তি করে সেবা চালু রাখতে হবে। ২. নগর দরিদ্রদের জন্য বিনামূল্যে ‘লাল কার্ড’ ও স্বল্পমূল্যে ওষুধ প্রদান পুনর্বহাল করতে হবে। ৩. সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা ও প্রয়োজনীয় বাজেট বরাদ্দ নিশ্চিত করে পর্যায়ক্রমে প্রশাসনিক স্থানান্তর সম্পন্ন করা। ৪. প্রকল্পে কর্মরত প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত ও অভিজ্ঞ জনবলকে বহাল রাখা। ৫. শতভাগ নগরবাসীর জন্য দোরগোড়ায় প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করা। ৬. যেসব ওয়ার্ড বা পৌরসভায় এখনো কেন্দ্র নেই, সেখানে নতুন মডেলে সেবা শুরু করা। ৭. সব নগরবাসী ও দরিদ্র জনগোষ্ঠীর জন্য ‘হেলথ স্মার্ট ফ্যামিলি কার্ড’ চালু করা।
সংবাদ সম্মেলনে বক্তারা অবিলম্বে সরকারের সর্বোচ্চ মহলের হস্তক্ষেপ দাবি করেন, যাতে একটি বৃহৎ নগর স্বাস্থ্য বিপর্যয় থেকে দেশকে রক্ষা করা যায়।