ঢাকা — সাভার এলাকায় ধারাবাহিক অভিযান ও একের পর এক বোমা ও বিস্ফোরক উদ্ধারের ঘটনার পর নিষিদ্ধঘোষিত জঙ্গি সংগঠন নব্য জেএমবির (Neo-JMB) একটি চক্রের নতুন কৌশল ও তথ্য উদ্ধার করেছে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। তদন্তে উঠে এসেছে, গ্রেপ্তারকৃত ও পলাতক সদস্যরা যোগাযোগ ও অর্থ স্থানান্তরে অপ্রচলিত ডিজিটাল মাধ্যম এবং হামলার ক্ষেত্রে বিশেষ কৌশল ব্যবহার করে আসছে।

অপ্রচলিত অ্যাপে যোগাযোগ ও অর্থ লেনদেন
কাউন্টার টেররিজম অ্যান্ড ট্রান্সন্যাশনাল ক্রাইম (সিটিটিসি) ইউনিটের তদন্ত-সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, নব্য জেএমবির সদস্যরা নজরদারি এড়াতে এসব ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম ব্যবহার করছিল:
- যোগাযোগ: নিজেদের মধ্যে গোপন বার্তা আদান-প্রদানের জন্য তাঁরা ‘প্রটেকটেড টেক্সট’ (PT) নামের একটি ওয়েবসাইট ব্যবহার করত।
- অর্থ লেনদেন: অর্থ আনা-নেওয়া বা তহবিলের কাজে তাঁরা ‘ইলিমেন্ট’ (Element) নামে একটি অ্যাপ ব্যবহার করত।
এছাড়া সিটিটিসি কর্মকর্তারা জানান, সন্দেহভাজনদের চলাফেরার ধরনেও বিশেষ মিল দেখা গেছে। সদস্যরা সাধারণত পিঠে ব্যাগ নিয়ে চলাফেরা করে, যার ভেতরে বোমা, আগ্নেয়াস্ত্র, ছুরি ও চাপাতি রাখা থাকে। তল্লাশির মুখে পড়লে এসব দিয়ে তাৎক্ষণিক হামলা চালিয়ে পালিয়ে যাওয়াই তাদের মূল কৌশল।
সাভারে গ্রেপ্তার ও অভিযান
১. হেমায়েতপুরে প্রথম গ্রেপ্তার: গত মঙ্গলবার দুপুরে সাভারের হেমায়েতপুর থেকে নব্য জেএমবি সদস্য মোহাম্মদ আরিফ-কে গ্রেপ্তার করা হয়। তাঁর পিঠের ব্যাগ থেকে জিআই পাইপ দিয়ে তৈরি ৫টি বোমা, ছুরিসদৃশ ৩টি বোমা এবং বিপুল পরিমাণ বোমা তৈরির সরঞ্জাম উদ্ধার করা হয়। ২. দক্ষিণ শ্যামপুরে বাড়িতে অভিযান: আরিফকে জিজ্ঞাসাবাদের প্রাপ্ত তথ্যের ভিত্তিতে মঙ্গলবার রাতে সাভারের দক্ষিণ শ্যামপুর এলাকার একটি বাড়িতে অভিযান চালায় পুলিশ। সেখান থেকে ১১টি পাইপবোমাসহ (আইইডি) বিপুল পরিমাণ বিস্ফোরক উদ্ধার করা হয়। উদ্ধারকৃত কিছু রাসায়নিক উপাদানের ধরন শনাক্তে রাসায়নিক পরীক্ষা চলছে। ৩. সাধাপুরে ‘প্রেশার কুকার’ বোমা উদ্ধার: পরদিন বুধবার সাভারের সাধাপুর এলাকার একটি মসজিদের মাঠে প্লাস্টিকের ড্রামে রক্ষিত নীল স্কচটেপে প্যাঁচানো একটি প্রেশার কুকার বোমা নিষ্ক্রিয় করে সিটিটিসির বোমা নিষ্ক্রিয়কারী ইউনিট।
এসব ঘটনায় সাভার থানায় সন্ত্রাসবিরোধী আইনে মামলা করা হয়েছে। সাভার থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) সাইফুল আলম জানান, আরিফকে আদালতে হাজির করে ৬ দিনের রিমান্ডে নেওয়া হয়েছে এবং পরবর্তী অধিকতর তদন্তের জন্য মামলাটি অ্যান্টিটেররিজম ইউনিটে (ATU) হস্তান্তর করা হয়েছে।
পূর্বের বিস্ফোরণগুলোর সাথে যোগসূত্র
তদন্তকারীদের দাবি, সাভারে প্রাপ্ত বোমার ধরণ ও উপকরণের সঙ্গে পূর্বে মতিঝিল মেট্রোরেল স্টেশনের নিচ থেকে উদ্ধার হওয়া বোমা এবং আশুলিয়ার একটি মুদিদোকানে পাওয়া প্রেশার কুকার বোমার সরাসরি মিল রয়েছে।
বিস্ফোরক বিশ্লেষণ: উদ্ধারকৃত বোমাগুলোতে ট্রাই-অ্যাসিটোন ট্রাইপার-অক্সাইড (TATP) নামের অত্যন্ত সংবেদনশীল বিস্ফোরকদ্রব্য, বিয়ারিং বল ও সার্কিট সুইচ ব্যবহার করা হয়েছে। এই বিস্ফোরক সামান্য তাপ, ঘর্ষণ বা আঘাতে বিকট শব্দে বিস্ফোরিত হতে পারে।
তদন্তকারীরা ধারণা করছেন, গত বছরের ফেব্রুয়ারিতে দক্ষিণ কেরানীগঞ্জের একটি মাদ্রাসায় বিস্ফোরণের পর থেকে ঘটে যাওয়া মোট ১১টি ঘটনার নেপথ্যে এই নির্দিষ্ট সেলটিই জড়িত। এই চক্রের মূল ৫ জন সদস্যকে শনাক্ত করা হয়েছে:
- মামুন (ওরফে ‘বোমারু’ মামুন): এই চক্রের দলনেতা; বর্তমানে পলাতক।
- শেখ আল আমিন: গ্রেপ্তারকৃত।
- মোহাম্মদ আরিফ: গ্রেপ্তারকৃত।
- রাকিব: পলাতক (গত ২১ ফেব্রুয়ারি যাত্রাবাড়ীর কুতুবখালীতে তল্লাশিচৌকিতে পুলিশের ওপর হামলা ও ছুরি মারার ঘটনায় জড়িত)।
- বাপ্পী: পলাতক।
পলাতক অন্য আসামিদের গ্রেপ্তারে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর অভিযান অব্যাহত রয়েছে।