কেকা অধিকারী
স্ট্রবেরি পিকিং, অ্যাপেল হারভেস্টিং, চেরী ব্লোজম ফেস্টিভ্যাল কত কত উৎসব চলে দেশে-দেশে। ফেসবুকে বন্ধু, আত্নীয় স্বজন পোস্ট দেন দেখি। তারা দল বেঁধে পরিবার, পরিজন, বন্ধু-বান্ধব নিয়ে এ ফলের বাগান, ও ফুলের রাজ্যে ঘুরে বেড়ান মহানন্দে।

ফল পাড়েন, ফল তোলেন, রসনা তৃপ্ত করেন। তারপর টাটকা ফলে ঝুড়িতে ভরে বাড়ি ফেরেন। আবার কখনও দেখি গাছের নিচে চাদর বিছিয়ে শুয়ে, বসে চেরী ফুল ফোটা দেখেন। কুঁড়ি থেকে কী করে ফুল হয় নিজের চোখে দেখা অনন্য অভিজ্ঞতা বৈকি! আবার হয় তো বা কেউ হেঁটে বেড়ান টিউলিপের সম্রাজ্যে। আমি খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে তাদের পোস্ট, ছবি, ভিডিও দেখি আর ভাবি, স্বর্গ বুঝি এমনই হয়। নাহ্ শুধু মনোরম প্রাকৃতিক দৃশ্য তো স্বর্গের সবটা নয়। স্বর্গের প্রধান নিয়ামক হচ্ছে মানুষ। মানুষের জন্যই স্বর্গের সৃষ্টি। সুন্দর মনের সুন্দরকে দেখার অন্তর্দৃষ্টিসম্পন্ন মানবিক মানুষই তো স্বর্গের বাসিন্দা। স্বর্গ তাদের রচনা। ফলে ফসলে মাঠ ভরে যাওয়া অনেক আনন্দের একটা বিষয়। আমাদের দেশের গরীব কৃষকই শুধু সেটা টের পায়। তাই বুঝি ফসল ঘরে তোলার কষ্ট তার দেহ মনকে ছুঁতে পারে না। সবকিছু ছাপিয়ে দুচোখ ভরে তার উপচে পড়ে আনন্দ। অন্যদিকে শহুরে আমরা মন বন্ধ করা আজব প্রাণী। আমাদের ইন্দ্রিয় জং ধরা।আমাদের চোখে কিছু পড়ে না। আমাদের নাক ফসলের ঘ্রাণ পায় না। আমাদের ত্বক সজীব ফলের মসৃণতার স্পর্শ পায় না। বিদেশি নানা হারভেস্টিং ফেস্টিভ্যাল দেখে আমারও একদিন হঠাৎ স্বর্গবাসী হতে মন চেয়েছিল। ছুটে যেতে ইচ্ছে করছিল ফলের বাগানে, ফুলের রাজ্যে। দীনহীনা আমি দেবী হয়ে নিজেই নিজেকে আশীর্বাদ করে বললাম – “বর দিনু। তুমি পারবে তোমার নিজের স্বর্গ গড়ে নিতে।” কিন্তু হায়! দেবী যাবেন স্বর্গ বিহারে, অথচ পুষ্পক রথ কোথায়? কোথায় স্বর্গদূত? স্বর্গদূত নাই তো কি হয়েছে? আমার গার্ডিয়ান অ্যাঞ্জেল ওরফে অগতি গতি মাসুম আছে।

ওকেই মনোবাঞ্ছা জানালাম। ও বলল, “আন্টি, এখানে তরমুজ ক্ষেত আছে।” হায় রে অর্বাচীন বালক! ওকে কে বোঝাবে দেবী কখনও “আন্টি” হয় না। দেবী হন মা-জননী। তাঁকে তরমুজ ক্ষেতে নয়, নিতে হয় দ্রাক্ষাক্ষেত্রে, আনারের উদ্যাোনে। যাক্ কী আর করা! করিৎকর্মা মাসুম পুষ্পকরথ না পেয়ে ফোন করে ইজিবাইক হাজির করালো একটা। সময় কম। এখানের স্বর্গোদ্যান তথা তরমুজের ক্ষেত দেখতে আরেকটু সময় নিয়ে রওনা হওয়া দরকার ছিল। তাই দেরী না করে আমাদের স্বর্গ যাত্রা শুরু হলো। সুখের বিষয় ছোট্ট জয়পুরহাট শহরের সীমানা পেরোতে মাত্র কয়েক মিনিটই যথেষ্ট। অচিরেই আমরা পৌঁছে গেলাম স্বর্গের কাছাকাছি। রাস্তার দুপাশে কৃষক তরমুজ স্তুপ করে ক্রেতার অপেক্ষায় বসে আছেন। শুনলাম সীজন শেষ। তাদের ক্ষেতে আর তেমন তরমুজ নেই। খুঁজে খুঁজে তরমুজওয়ালা ক্ষেত আবিষ্কার করলাম। গেলাম সেখানে। গিয়ে বুঝলাম দেবীও অভাগা হয়। বিশাল মাঠ জুড়ে বিদেশি জাতের তরমুজ ক্ষেতে ঝাকা আছে। তাতে দু’একটা করে তরমুজ ঝুললে লতার পাতাগুলো সব শুকিয়ে গেছে। মালিকের তদারকিতে শেষ ফসল তোলা হচ্ছে। একটার পর একটা লম্বা লম্বা বেড করে তরমুজের গাছ লাগানো হয়েছে। বেড সব প্লাস্টিকে ঢাকা। তার মাঝে করা ছিদ্র দিয়ে গাছ বেরিয়ে ঝাকা ছেয়ে ফেলেছিল। বেশ কয়েকটি বেডের উপর আছে একটা বিশাল ঝাকা। দুই ঝাকার মাঝ বরাবর সরু পথ রাখা গাছের পরিচর্যা ও চলাচলের জন্য। আজ দেখলাম ছোট ছোট হ্যাংরা, ব্যাংরা, ট্যাংরা আকারের তরমুজ সেই পথে ছড়িয়ে ছিটিয়ে রাখা। জানলাম ভালো তরমুজ সব পাইকারি ক্রেতা নিয়ে গেছে। এ সীজনে শেষ বারের মতো । ভাগ্যিস আজ এসেছিলাম! তা না হলে তো আমার এ স্বর্গোদ্যান দেখা হতো না। ওয়াটার মেলন হার্ভেস্টিং দেখতে এলাম অথচ মাঠে বসে তরমুজ খাব না, ছবি তুলব না, তা তো হতে পারে না। পথে ছড়িয়ে থাকা তরমুজ থেকে একটা তুলে একজন তরুণ কৃষককে কেটে দিতে বললাম। জানলাম কৃষক ছেলেটা কলেজ পুড়ুয়া। সে এ জমির একজন কর্মী মাত্র। সে-ই দূরে দাঁড়িয়ে থাকা মালিককে দেখিয়ে দিল। মালিক কোন ক্রমেই এ তরমুজের দাম নিতে সম্মত হলেন না। উল্টো কর্মী দিয়ে তুলনামূলক একটা ভালো তরমুজ আনিয়ে দিলেন। কেটে দিতে বললেন। স্বর্গের বাসিন্দা বলে কথা। তার তো মনটা উদারই হবে। আর দেবী একটু প্রসাদ পাবেন সেটাও আইনের মধ্যে পড়ে। তরমুজের স্বর্গে চষে বেড়াতে আমাদের টিকিটের জন্য টাকা গুনতে হলো না। ফল কিনে খেতে হলো না। গরমে গরম তরমুজ খেয়ে মন ভরল কিন্তু জিহ্বা সে কথা শুনতে না-রাজ। ক্ষেত থেকে বেরিয়ে এলাম। ইজিবাইকে সামনে এগিয়ে গিয়ে দেখলাম জমির পাশের রাস্তায় স্তুপ করা তরমুজ নিয়ে দাঁড়িয়ে এক কৃষক। তার তরমুজের মধ্যে হলুদ তরমুজগুলো দেবীকে লোভী করে তুলল। মন ভেঙে গেল যখন সে বলল তার তরমুজগুলো সব বিক্রি হয়ে গেছে। মুখ কালো করে ইজিবাইকে বসে আছি দেখে কৃষকের করুণা হলো। নীতির তোয়াক্কা না করে একটা তরমুজ বেঁচে দিল সে।

ইজিবাইক থেকে নেমে তার স্বাদ নিলাম। প্রাণ জুড়িয়ে গেল। এ হলুদ তরমুজের ভেতরটাও হলুদ। ঢাকায় একবার খেয়েছি মনে পড়ছে। কে যেন গিফট করেছিল। একেই বলে বাঙালি। একবার মুখের ওধারে চলে গেলে সবকিছু বিস্মৃতির অতলে তলিয়ে যায় তার। এটা বেশ মিষ্টি ছিল। ইশ্ ফ্রিজে রেখে খেতে পারলে বেশ হতো। আমার বিষ্ময়ের শেষ নেই। এতো বাহারী তরমুজও আছে আমাদের দেশে! সবুজের মধ্যে লাল তো সব সময় দেখি। এবার গিয়ে দেখলাম আরও কত রংবেরঙের তরমুজ। হলুদের মধ্যে হলুদ, হলুদের মধ্যে লাল, সবুজের মধ্যে হলুদ, কোনটার উপরটা গাঢ় সবুজ, কোনটার হালকা সবুজ, কোনটার বা সাদা সবুজ ডোরা কাটা। ছোট্ট তরমুজ, মাঝারি তরমুজ, গোল তরমুজ, লম্বা তরমুজ। অবাক কান্ড! ফেরার পথে তরমুজ কিনলাম। এ যুগের দেবীদের খাদ্য সংগ্রহ ও সংরক্ষণের রোগ আছে। ইজিবাইক থেকে দেখলাম দুটি ছেলে তরমুজ কিনে ওখানেই দাঁড়িয়ে খাওয়ার তোড়জোড় করছে। ও মা! কী সুন্দর! হলুদ তরমুজ আর ভেতরটা টকটকে লাল! আহা এমন একটা তরমুজ নিলে হতো। শুনলাম দেখতে সুন্দর হলেও ভেতরে হলুদ তরমুজই খেতে বেশি মিষ্টি। একা মানুষ এতো তরমুজ কে খাবে? মনকে বোঝালাম না কেনার জন্য। মন বুঝল।
ফেরার পথে দেখলাম এক কৃষ্ণচূড়া। একহারা দেহে মাথা ভর্তি টকটকে লাল ফুল নিয়ে উর্দ্ধমূখী। দারুণ! আমাদের চেরী নেই তো কি কৃষ্ণচূড়া তো আছে। আমি চাইলেই কৃষ্ণচূড়া ফোটার উৎসব হয়ে যেতে পারে এখন। ইজিবাইক থেকে নেমে গাছের নিচে এসে দাঁড়লাম। খুব সহজ ছিল না তার কাছে যাওয়া। কারণ বেশ ঢালুতে গাছটির অবস্থান। মন চেয়েছিল। তাই যাওয়া হলো। মনের মধ্যে কিশোরীর পায়ের ঘুঙুর বেজে উঠল। উৎসব উদযাপনের ছবি তুলে রাখাই নিয়ম। তবে এখানে ছবি তুলে উৎসব পালন চাট্টিখানি কথা ছিল না। গাছের পাশেই হাইওয়ে। সাঁ সাঁ করে বাস যায় তাতে। মাসুমের হাতে মোবাইল দিয়ে ফুলের সাথে পোজ দেব কী, আমি দেখি কোন বাস না আবার ওর গায়ের উপর দিয়ে চলে যায়। মনটা বেশ ফুরফুরা লাগছে। নিজেকে দেবীই মনে হচ্ছে। এক বেলায় এ ভূ-ভারতের কয়জন মেয়ে মন চাইলো বলে দু’দুটো স্বরচিত উৎসব উদযাপন করে ফেলতে পারে? আরেকদিন আরেকটি গাছ দেখেছিলাম। বহুদূর হেঁটে গিয়েছিলাম শুধু তাকে জড়িয়ে ধরব বলে। জড়িয়ে ধরেও ছিলাম আমি। ক্ষত-বিক্ষত হয়েছিল আমার বুক। তবু খুব ভালো লেগেছিল। তখন অবশ্য আমি দেবী নয়, মানবী ছিলাম। থাক্, সে গল্প আরেক দিনের জন্য তোলা। এক দিনে সব গল্প বলে ফেললে কি চলে?