
ভাটি বাংলার বিরহী কণ্ঠস্বর সাধক উকিল মুন্সী
নেত্রকোণার ধনু আর বেতেই নদীর অববাহিকায় যে জল-হাওয়ার বিস্তার, তারই বুক থেকে উঠে এসেছিলেন বাংলা লোকসংগীতের এক কিংবদন্তি পুরুষ সাধক উকিল মুন্সী। উনবিংশ শতাব্দীর শেষভাগে ১৮৮৫ সালের ১১ জুন নূরপুর বোয়ালী গ্রামে জন্ম নেওয়া এই গুণী মানুষের প্রকৃত নাম ছিল সৈয়দ আব্দুল হক আকন্দ। শৈশবে পিতৃহীন হয়ে অভাব আর সংগ্রামের মুখোমুখি হলেও তাঁর ভেতরের সুরক্ষুধা তাঁকে বেঁধে রাখতে পারেনি। তৎকালীন ভাটি অঞ্চলের জনপ্রিয় ঘেটু গানের সুরের মায়ায় জড়িয়ে কিশোর বয়সেই তিনি ঘর ছাড়েন। অসাধারণ দরাজ কণ্ঠের অধিকারী এই তরুণ দ্রুতই মরমী গান ও বাউল দর্শনে দীক্ষিত হন, যেখানে তাঁর সংগীত গুরু হিসেবে আসেন আরেক প্রখ্যাত সাধক রশিদ উদ্দিন।
উকিল মুন্সীর জীবন ছিল এক অদ্ভুত বৈপরীত্য ও আধ্যাত্মিক সুষমায় ভরা। জীবনের একটা দীর্ঘ সময় তিনি মোহনগঞ্জের বরান্তর গ্রামের এক মসজিদে ইমামতি করেছেন এবং শিশুদের কোরআন শিক্ষা দিয়েছেন। এক হাতে যিনি মসজিদের মিম্বরে দাঁড়িয়ে ইমামের দায়িত্ব পালন করতেন, অন্য হাতে তিনিই আবার একতারা তুলে নিয়ে গেয়ে উঠতেন রাধা-কৃষ্ণের প্রেম কিংবা সুফি দর্শনের গভীর বিচ্ছেদ গান। ধর্মীয় অনুশাসন আর লোকসংগীতের এই মেলবন্ধন তাঁর জীবনে কোনো দ্বন্দ্ব তৈরি করেনি, বরং সৃষ্টি করেছিল এক অনন্য মানবিক দর্শন। যৌবনে ধনু নদীর পাড়ের তরুণী হামিদা খাতুনের সাথে তাঁর প্রেম এবং পরবর্তীতে নানা বাধা পেরিয়ে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হওয়া তাঁর সৃষ্টিশীলতায় এক নতুন মাত্রা যোগ করে। এই লাবুশের মাকে কেন্দ্র করেই তিনি রচনা করেছিলেন তাঁর জীবনের অসংখ্য কালজয়ী গান।
তাঁর কিছু কালজয়ী ও জনপ্রিয় গান:
- আমার গায়ে যত দুঃখ সয়, বন্ধুয়ারে করো তোমার মনে যাহা লয়
- সুয়া চান পাখি, আমি ডাকিতাছি তুমি ঘুমাইছ নাকি (বারী সিদ্দিকীর কণ্ঠে যা ব্যাপক জনপ্রিয়তা পায়)
- আষাঢ় মাইস্যা ভাসা পানি রে, পুবালি বাতাসে আমি বাদাম দেইখ্যা চাইয়া থাকি
- বন্ধু আমার দিনদুনিয়ার ধন রে
- সোনা বন্ধুয়া রে এতো দুঃখ দিলে তুই আমারে
- নবীজির খাশ মহলে, হায়রে লুকাইয়া কয়দিন রই
উকিল মুন্সীর গান মানেই হৃদয়ের গভীরতম কোণের আকুলতা আর প্রিয়জনকে হারানোর তীব্র যন্ত্রণা। তাঁর সৃষ্টি “সুয়া চান পাখি, আমি ডাকিতাছি তুমি ঘুমাইছ নাকি” কিংবা “আমার গায়ে যত দুঃখ সয়” গানগুলো আজো বাংলার প্রতিটি মানুষের চোখে জল এনে দেয়। আষাঢ়ের ভরা নদী, পুবালি বাতাস আর বিরহী নৌকার মাঝির আকুলতাকে তিনি যেভাবে শব্দে ও সুরে বেঁধেছেন, তা বাংলা সাহিত্যের অমূল্য সম্পদ। তবে তাঁর শেষ জীবন ছিল অত্যন্ত ট্র্যাজিক। ১৯৭৮ সালে মাত্র কয়েক মাসের ব্যবধানে প্রিয় স্ত্রী হামিদা খাতুন এবং একমাত্র পুত্র আবদুর সাত্তারের আকস্মিক মৃত্যু এই প্রবীণ সাধককে পুরোপুরি নিথর করে দেয়। অবশেষে সেই বছরেরই ১২ ডিসেম্বর ৯৩ বছর বয়সে এই মহান বাউল ইহলোক ত্যাগ করেন। বেতেই নদীর তীরে আজ তিনি ঘুমিয়ে আছেন, কিন্তু তাঁর রেখে যাওয়া সুরের তরী আজো প্রতিটি বিরহী হৃদয়ে চিরন্তন এক হাহাকার হয়ে ভেসে বেড়ায়।