জলবায়ু পরিবর্তন, ভূগর্ভস্থ পানির অতিরিক্ত উত্তোলন এবং লবণাক্ততার আগ্রাসনে বাংলাদেশ এক ভয়াবহ সুপেয় পানির সংকটের মুখে পড়ছে। বাংলাদেশ ব্যুরো অব স্ট্যাটিস্টিকস (BBS) ও ইউনিসেফের যৌথ সমীক্ষা অনুযায়ী, দেশের ১০ কোটিরও বেশি মানুষ এখনও সম্পূর্ণ নিরাপদ সুপেয় পানির সুবিধা থেকে বঞ্চিত। দেশে স্যানিটেশনের আওতা বৃদ্ধি পেলেও টেকসই ও নিরাপদ ব্যবস্থাপনার আওতাধীন সুপেয় পানির প্রাপ্যতা আশঙ্কাজনকভাবে হ্রাস পেয়ে মাত্র ৩৯.৩ শতাংশে নেমে এসেছে। বিশেষ করে দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের দুর্যোগপ্রবণ উপকূলীয় জেলাগুলোর প্রায় ৩ কোটি মানুষ নিরাপদ পানির চরম সংকটে ভুগছে। বৈশ্বিক জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি পাওয়ায় এবং একের পর এক জলোচ্ছ্বাসের কারণে উপকূলের দেড় কোটি মানুষ উচ্চ মাত্রার লবণাক্ত পানি পানে বাধ্য হচ্ছে। এই তীব্র সংকটের অন্যতম মূল কারণ হলো গৃহস্থালি, সেচ ও শিল্পকারখানায় ভূগর্ভস্থ পানির অতিরিক্ত ব্যবহার। বাংলাদেশ প্রতি বছর প্রায় ৩ হাজার ২০০ কোটি ঘনমিটার ভূগর্ভস্থ পানি উত্তোলন করছে, যার ফলে পানির স্তর প্রতি বছর গড়ে ১ থেকে ১.৫ মিটার পর্যন্ত নিচে নেমে যাচ্ছে এবং শুষ্ক মৌসুমে সাধারণ নলকূপগুলো সম্পূর্ণ অকেজো হয়ে পড়ছে।

পানির এই তীব্র সংকট ও দূষণ দেশের জনস্বাস্থ্যের ওপর এক মারাত্মক বিপর্যয় ডেকে এনেছে, যার মধ্যে সবচেয়ে বড় নীরব ঘাতক হলো আর্সেনিক মহামারি। বর্তমানে সরকারের জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তর (DPHE) এবং বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থার প্রতিবেদন অনুযায়ী, বাংলাদেশের প্রায় ৬ কোটি মানুষ দীর্ঘমেয়াদি আর্সেনিক ঝুঁких মধ্যে বসবাস করছে এবং মোট জনসংখ্যার প্রায় ১১ শতাংশ সরাসরি উচ্চ মাত্রার আর্সেনিকযুক্ত পানি পান করছে। অগভীর নলকূপের পানিতে নির্ধারিত মাত্রার চেয়ে বেশি আর্সেনিক থাকায় লাখ লাখ মানুষ আর্সেনিকোসিস ও ক্যান্সারের মতো মারাত্মক ব্যাধিতে আক্রান্ত হচ্ছে। এর পাশাপাশি ঢাকার চারপাশের বুড়িগঙ্গা ও শীতলক্ষ্যা নদীর দূষণ পরিস্থিতি এখন চরম বিপর্যয়কর রূপ নিয়েছে। সাম্প্রতিক গবেষণা অনুযায়ী, টেক্সটাইল ও ডাইং কারখানার কারণে বুড়িগঙ্গা ও শীতলক্ষ্যা নদীতে বার্ষিক প্রায় ৫ কোটি ৬০ লাখ টন বিষাক্ত বর্জ্য ও ৫ লাখ টন স্লাজ নির্গত হচ্ছে, যার ফলে শুষ্ক মৌসুমে এই নদীগুলোর পানির দ্রবীভূত অক্সিজেন (DO) শূন্যের কোঠায় নেমে আসে এবং পানি সম্পূর্ণ কুচকুচে কালো ও ব্যবহারের অযোগ্য হয়ে পড়ে। এই দূষিত পানির কারণে দেশজুড়ে ডায়রিয়া ও জন্ডিসের মতো পানিবাহিত রোগের প্রাদুর্ভাব জ্যামিতিক হারে বাড়ছে এবং প্রাকৃতিক বিপর্যয়-পরবর্তী সময়ে দৈনিক প্রায় ৩,০০০ মানুষ আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হচ্ছে, যার একটি বড় অংশই শিশু। এই সামগ্রিক স্বাস্থ্য বিপর্যয় বিশ্বব্যাংকের প্রতিবেদন অনুযায়ী দেশের বার্ষিক জিডিপির প্রায় ৬ শতাংশ পর্যন্ত অর্থনৈতিক ক্ষতিসাধন করছে। [1, 2, 3, 4, 5]
অভ্যন্তরীণ দূষণের পাশাপাশি আন্তর্জাতিক নদী অববাহিকার পানি বণ্টন চুক্তির অনিশ্চয়তা বাংলাদেশের পানি নিরাপত্তাকে আরও ভঙ্গুর করে তুলেছে। ভারতের সঙ্গে যৌথভাবে প্রবাহিত ৫৪টি আন্তঃসীমান্ত নদীর ওপর ভাটির দেশ হিসেবে বাংলাদেশ সম্পূর্ণ নির্ভরশীল, অথচ উজানে নির্মিত ফারাক্কা ও তিস্তা ব্যারাজের মতো কাঠামোর কারণে শুষ্ক মৌসুমে পানিপ্রবাহ ৮০ থেকে ৯০ শতাংশ পর্যন্ত হ্রাস পায় পাউবোর হিসাব অনুযায়ী। ঐতিহাসিক ১৯৯৬ সালের গঙ্গা পানি বণ্টন চুক্তির ৩০ বছর মেয়াদ ২০২৬ সালের ডিসেম্বরে শেষ হতে চলেছে, যা নবায়ন করা না হলে দেশের এক-তৃতীয়াংশ মানুষের জীবিকা ও কৃষি উৎপাদন চরম হুমকির মুখে পড়বে। তিস্তা পানি বণ্টন চুক্তি যুগের পর যুগ ঝুলে থাকায় উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলের ১২টি উপজেলায় কৃত্রিম মরুকরণ দেখা দিয়েছে। এই আসন্ন সংকট থেকে দেশকে রক্ষা করতে হলে ‘বাংলাদেশ পানি আইন ২০১৩’ এবং ‘বাংলাদেশ পরিবেশ সংরক্ষণ আইন ১৯৯৫’ কঠোরভাবে প্রয়োগ করে নদীতে বর্জ্য ফেলা জিরো টলারেন্সে নামিয়ে আনতে হবে। একই সঙ্গে জাতিসংঘ পানি কনভেনশনের নীতিমালার আলোকে পানি কূটনীতি জোরদার করে গঙ্গা চুক্তির একটি স্থায়ী ও ন্যায্য নবায়ন নিশ্চিত করতে হবে। ২০৩০ সালের মধ্যে জাতিসংঘের টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা (SDG-৬) অর্জন করতে হলে সরকারকে ‘রেইন ওয়াটার হার্ভেস্টিং’ এবং রিভার্স অসমোসিস প্রযুক্তির মতো দীর্ঘমেয়াদি প্রকল্পে বাজেট বরাদ্দ দ্বিগুণ করতে হবে। সুপেয় পানির এই জাতীয় সংকটকে একটি জাতীয় নিরাপত্তা ঝুঁকি হিসেবে বিবেচনা করে সরকার ও সাধারণ জনগণকে এখনই আইন মেনে সমন্বিত পদক্ষেপ নিতে হবে।
ওমর ফারুক