
হারুন রশিদ
তখন বয়সে বেশ তরুন। বিপ্লবী রাজনীতি করি।সমাজ পাল্টানোর চেতনায় গায়ের রক্ত টগবগ করে। বিপ্লব দরজায় এসে কড়া নাড়ে। সব কেমন লালে লাল দেখি।
খালিশপুর, ফুলবাড়িগেট এলাকার পাট শ্রমিকদের ডেরাগুলোতে তখন থাকি। তখন নিয়ম ছিলো সার্বক্ষনিক বিপ্লবীদের ডিক্লাসড হতে হবে। আমার ছিলো তখন ডিক্লাসড হবার প্রাণান্ত প্রচেষ্টা।
স্টার, প্লাটিনাম, পিপলস, সোনালি, মুহসিন জুটমিলের শ্রমিক কলোনি ও বস্তিগুলিতে আমার বসবাস।
এর আগে যখন ডুমুরিয়ার শোভনা, সতেরোচক, চুকনগরের গ্রামগুলিতে গরীব চাষীদের ভিতর সংগঠন গড়ার কাজ করতাম। তখন সেখানে ভালো খাবার না জুটলেও পায়খানা ও গোসল করার অসুবিধা হতোনা৷ পেটের বেগ চাপলে মাঠ বা বাগানে চলে যেতাম। বদনারও দরকার হতোনা। আর পিতলের বদনাগুলো এত্ত ভারী! খাল, জলেভরা বিল, ডোবাতো আছেই। সেটাই প্রকৃতির আসল ওয়াসরুম। পুকুর, নদী, খাল, বিলে গোসল করতাম, সাঁতার কাটতাম। গোসলের সাথে কলমী শাপলা হ্যালাঞ্চ তুলে আনতাম। সুযোগ হলে হাত দিয়েও মাছ ধরতাম।
রক্ষীবাহিনীর তাড়া খেয়ে শহরেচলে আসতে একপ্রকার বাধ্য হই। গ্রামে চিনের মতো বিপ্লবী ঘাটি গড়ে তোলার স্বপ্ন তখন আমার প্রায় শিকেয় ওঠে।
শ্রমিকদের যৎসামান্য উপার্জনে তাদের নিজেদের ডালভাত জোটানোই ছিলো দুষ্কর। তবুও তাঁরা সমাজতন্ত্রের স্বপ্নে ধনীদের থেকে মুক্তি পেতে আমাদের প্রেরণায় সংগঠিত হতে থাকে। ভালোবেসে আমাকে আপন করে তাদের খাবারের ভাগ দিতো। কলোনিগুলোতে স্থায়ী শ্রমিকেরা থাকতেন। ফোরম্যান, বড়ো সর্দারেরা একটু ভালো কোয়ার্টারের বরাদ্দ পেতেন। অধিকাংশ বদলি ও স্থায়ী পাট শ্রমিকেরা বস্তিগুলিতেই থাকতেন। আমি বেশীর ভাগ সময় থাকতাম বদলি শ্রমিকদের বস্তিতে। মাঝেমাঝে নদীর ওপার স্টার মিল এলাকার গ্রামগুলি চন্দনিমহল, সেনহাটি, পানিগাতিতে চলে যেতাম। খাওয়ার চাইতে ঘুমানো ও টয়লেটে সমস্যা হতো বেশ। তবুও বিপ্লবের এক দুর্বার নেশায় সবকিছু মেনে নিতাম। তখন মন উজ্জিবীত হতো বলিভিয়ার জঙ্গলে চে ও লংমার্চে মাওয়ের বিপ্লবী জীবনের উত্তাপে। মা বাবা, ভাইবোন তখন মন থেকে কেমন যেন ঝাপসা হয়ে যেতো। তবে রাতে মাঝেমধ্যে মাকে স্বপ্ন দেখতাম।
তখন ঘুম থেকে উঠে ভাবতাম মধ্যবিত্ত সুবিধাবাদের কারনে হয়তো এমন স্বপ্ন আমার চোখে এসে ভর করছে। তাই আরো কঠোর বিপ্লবী পথ আঁকড়ে ধরতে দৃঢ়প্রতিজ্ঞ হতাম। আর শ্রমজীবীদের সাথে একাত্ম হতে খুবই তৎপর হতাম। রাতে কোনো শ্রমিকের নাইট ডিউটি থাকলে তাঁর বিছানায় ঘুমাতাম। চারিদিকে নালা ও ডোবা। মুলিবাঁশের বেড়া, টিন বা গোলের চাল মাটির মেঝে লম্বা লম্বা দড়মা ঘর। ময়লা ও মলমুত্রের গন্ধ। যত্রতত্র ভনভন মাছি উড়ছে তাদের যেনো কোনো ক্লান্তি নেই। দিনে মশা রাতেতো কথাই নেই। রাতে তেল চিটচিটে বালিশ, কাথায় ছারপোকাদের কুট্টুস কাট্টুস। গায়ে চুলকানি হয়ে যেতো। পানি মিশিয়ে দুইদিন টেটমোসাল গায়ে লাগিয়ে কাথা মুড়ি দিয়ে কয়েক ঘন্টা শুয়ে থাকলে চুলকানি দমন হতো। সকালে টয়লেটে যেতে গেলে লম্বা লাইন। অনেক সময় পেটের বেগ দমন করা অসহনীয় হয়ে যেতো। পায়খানার প্যানে মল ভাসতো।

পায়খানায় দেরি করলে লাইনের অন্যরা নক করতো। কারখানার সিটি পড়ার সময় হতো; তাই সবাই ব্যস্ত হয়ে পড়তেন।
তখন চারিদিকে নিরন্ন মানুষের ঢল। খাদ্য, বস্ত্রের দারুন অভাব। তবে ক্ষমতাশীনরা চাল, গম, কম্বল লোপাট করে ধনী হচ্ছিলো। রেশন ও রিলিফের মাল লোপাট করে তাঁরা মুজিব কোট পরে পোলাও গোশত খেয়ে মোটাতাজা হচ্ছিলো।
কেউ কেউ আবার মুফতে পাওয়া অবাঙালিদের জমিতে আলিশান বিল্ডিং হাকাচ্ছিলো। আর আমরা তখন বোকা বুড়োর মতো পাহাড় সরানোর স্বপ্ন দেখছিলাম। নিরন্ন ও শোষিত মানুষ আমাদের কথায় তখন আশানুরূপ ভাবে জেগে ওঠেনি। অনেকে আমাদের জটিল কথাবার্তা শুনে ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে থাকতো। আমরা বলতাম সাম্রাজ্যবাদ, আমলা মুৎসুদ্দি পুঁজিবাদ, আধাসামন্তবাদ, সম্প্রসারণবাদ, অধিপত্যবাদ, সামাজিক সাম্রাজ্যবাদ, সংশোধনবাদের বিরুদ্ধে আমাদের লড়াই করতে হবে।
এক ঘরোয়া বৈঠকে এইসব শুনে প্লাটিনামের বয়ষ্ক শ্রমিক শামসুভাই তাঁর স্বভাবজাত বরিশালের আঞ্চলিক টানে বলে ওঠেন, কমরেড সব বাদ দিলে মোগো আর থাকবে কী হুধুই চ্যাট। উপস্থিত সবাই হো হো করে হেসে ওঠে।
আমার তখন মাথার ঘিলু নড়ে ওঠে।
আমাদের গ্রামের মোসেন চিত্রালী সিনেমা হলের কাছে এক রেশন দোকানে কাজ করতো। তখন রেশন মালিকদের রমরমা ব্যাবসা। অধিকাংশ রেশন দোকানের মালিক ছিলো আওয়ামী লীগের কর্তা ব্যাক্তিরা। সরকারি কর্মচারী ও শহরের অধিবাসীদের রেশন দেয়া হতো। সপ্তাহে একবার। বাজারের চাইতে রেশন দোকানে চাল, গম, তেল, চিনির দাম ছিলো খুব কম। রেশন কার্ডের মাধ্যমে রেশন দেয়া হতো। সব রেশন দোকানের মালিকদের নকল নামে হাজার হাজার কার্ড ছিলো। এটা ছিলো ওপেন সিক্রেট।
তখন ফুড ক্যারিং ছিলো আরো লুটতরাজ ব্যবসা। নৌকা বার্জ ভর্তি চাল গম বিক্রি করে দিতো। দেখানো হতো নকশাল, সর্বহারা বা গণবাহিনী বার্জ লুট করেছে। ক্যারিং কন্ট্রাক্টর প্রায়,সবাই ছিলো আওয়ামী লীগের। খ্যান্ত দি এবার ধান বানতে শিবের গীত গাইলাম।
আন্ডারগ্রাউন্ড জীবনে মোসেনের সাথে মাঝেমধ্যে দেখা হতো। তার কাছে বাড়ির খবরাখবর নিতাম।সেদিন আমি গিয়েছিলাম একটা মুভি দেখতে। মুভিটার নাম স্পার্টাকাস। ইতালির দাশ বিপ্লবের ইতিহাস পড়ার পর আমার কাছে স্পার্টাকাস খুব হিরো ছিলো। তাই আমি ও প্লাটিনাম জুটমিলের কমরেড শানুভাই ম্যাটিনি শো দেখতে যাই। মুভি শেষে স্পার্টাকাসের জন্য আমি খুব উত্তেজিত। একটা আকিজ বিড়ি ধরিয়ে দিয়ে শানু ভাই তাঁর কাজে চলে গেলেন। আমি বিড়ি টানছি। তখন আধাঁর নামেনি। রেশনের দোকানের সামনে থেকে মোসেন ডাক দিলো। সে আমার কয়েক বছরের বড়ো। তবুও গ্রাম্য খাইখাতিরে তুমি আমি সম্পর্ক। আমি তার সামনে দাড়াতেই সে বললো, খোকন ক্যামন আছো তোমার দ্যখা পাইনে। এট্টু দাঁড়াও তোমার মা খবর প্যাঠাইছে। তাই বলে সে রেশন দোকানের ভিতর চলে গেলো।
আমি দাঁড়িয়ে আছি। মশায় কামড়াচ্ছে। দুইটা কাটিনের চালে কা কা করছে।
দোকান থেকে বেরিয়ে মোসেন একখান হাতচিঠি আমার কাছেদিয়ে বলে, তোমার দাদী মরলি তুমি বাড়ি গেইলে?
আমার মাথা থেকে স্পার্টাকাস চলে গেলো। দ্রুত কশিটানা কাগজে উডপেন্সিলের লেখামায়ের চিঠি খুলে মেলে ধরি।
একবার চিঠিখান নাকের কাছে ধরে ঘ্রাণ নেই। মায়ের গন্ধমাখা হাতচিঠি। প্রায় আট মাস হতে চললো মায়ের সাথে দেখা নেই।
“খোকন”
আশা করি খোদার ফজলে তুমি বাঁচে আছো। আমি নামাজের পাটিতে বসে রোজ দোয়া করি।
সেদিন তোমার দরজিজ কাকা আমারে এসে কলো বাহিরদিয়া, ডোবায় তোমাগে পার্টির অনেকরে রক্ষীবাহিনী মারে ফেলিছে। অনেকে কচ্ছে তোমারেও রক্ষীতে মারে ফ্যালাইছে। সে কথা আমি বিশ্বাস করিনি। রেজাকার পিরিয়ডে তুমি যখন
যুদ্ধে গেইলে তহন অনেকে এইকথা কতো। আমি কতাম ছেলেকে আমি আল্লার রস্তে ছাড়ে দিছি।
তোমার দাদীজান অনেক কষ্ট পায়ে মারা গেছে। মরার আগেখালি তুমার কথা কতো।
যদি কোনো বিপদ না হয় একবার বাড়ি আসে ঘুরে যাবা।
ইতি তোমার মা।
পত্রপাঠে আমার চোখ ঝাপসা হয়ে আসে। দাদীর সেই লাঠিহাতে সাঈদকে তেড়ে যাবার দৃশ্য ভেসে ওঠে।চিঠিতে তারিখ দেখে বুঝলাম দিন পঁচিশেক আগে লেখা। চিঠিটা বুক পকেটে রেখে আমি হাটতে শুরু করি।
রাতে আমার শেল্টারে শুয়ে মনস্থির করি সকালে উঠে মায়ের কাছে চলে যাবো। কিন্তু সকালে যশোর পেড়োলির আশরাফ, নিজাম ও আরো কয়েকজনের সাথে কথা বলতে হয়। পেড়ুলির কিছু কমরেড বাড়ি থাকতে পারছেনা রক্ষীবাহিনীর ভয়ে। তাদের নিরাপদ আশ্রয়ের ব্যবস্থা করতে হবে। আলোচনা শেষ স করে ক্রিসেন্টের সর্দার আব্দুস সাত্তার ও চন্দনী মহলের ইউনুসকে হাতচিঠি পাঠিয়ে আমার কথা জানাই। প্রায় পৌনেদুপুরে আমি নতুন রাস্তার দিক হাটা শুরু করি। তখনও টাউন সার্ভিসের শেষ স্টপেজ ছিলো রূপসা। আমি বাসের উদ্দেশ্যে হাটতে থাকি।
সকালে কিছু খাইনি। পেটে ইন্দুরে ডন কষছে। পথে একইটালিয়ান হোটেল (ছালাবিহীন) থেকে একপোয়া আটার রুটি ও আখেরগুড় চালান করলাম। ভাইবোনের জন্য একপ্যাকেট রোতাব বিস্কুট কিনলাম। নতুনরাস্তার মোড় থেকে বাসে উঠলাম। সিট পাইনি দাঁড়িয়ে ছিলাম। বৈকালির মোড়ে এলে
বাস থামিয়ে রক্ষীবাহিনী সবাইকে চেক করতে শুরু করে। আমি একটু ভড়কে গেলাম। কয়েকমাস আগে শুনেছিলাম, আমাকে মনে করে পুলিনকে ডুমিরিয়ায় ধরেছে। পুলিশ/ রক্ষীবাহিনী অনেক পরে সেটা বুঝতে পারে। ললিতমোহন , বেলায়েত, চানমনিদাকে ধরে নিয়ে রক্ষীবাহিনী খুন করেছে।
জীবন মুখার্জী, আলাউদ্দিনকে এরেষ্ট করে অনেক টর্চার করেছে। আমি ধরে নিয়েছি ইনফরমেশন পেয়ে আমাকে ধরার জন্য বাস চেকিং হচ্ছে। ধরে নিয়ে বাঁশকলে দিবে, পিটায়ে নারকেলের ছোবড়া বানাবে, হয়তো ডিম থেরাপিও দিতে পারে।
মুড়ির টিনমার্কা বাস। আমি একেবারে বাসের পিছনের দিক। একবার দোয়া ইউনুস পড়লাম। ভেবে ঠিক করলাম
জিজ্ঞেস করলে কী বলবো।
রক্ষীবাহিনী কয়েকজনকে ধরেনীচে নামিয়ে নিয়ে গেলো। আমার বুক নড়েচড়ে উঠলো।
তখন জুলিয়াস ফুঁচিক, চের কথা মনে করছি।
একজন কালো সড়েঙ্গামতো রক্ষীবাহিনী আমাকে হাত দিয়ে ঠেলা দিয়ে বলে, এই নীচে নাম।
আমি বুঝলাম আমার কম্মকাবার । এই জীবনে মাকে আর দেখতে পাবোনা।
নীচে এসে দাড়াই। রোদ এসে পড়ছে চোখেমুখে। রাস্তার ওপার কিছুলোক দাঁড়িয়ে দেখছে। তাগড়াই এক রক্ষীবাহিনী লম্বা চুলের একসুন্দর চেহারার ছেলেকে চড়থাপ্পড় দিচ্ছে। সে হাউমাউ করে কেঁদে তাদের পা ধরছে। ত্রিপল ঢাকা জলপাই রঙের লরী কাছেই দাঁড়িয়ে।
তোমার নাম কী?
বললাম বজলুর রহমান। নিজের নাম বললাম না।
বাড়ি কোথায়?
মোল্লা ডাঙায়। সেটাও সত্যমিথ্যার মিশেল।
সেইটা কোথায়?
গাঙের ওপার।
পাশের গ্রাম কী কী?
আন্দাবাদ, খাজুরো,
জাবসো এইসব।
তুমি কী করো?
কাঁচা মালের আড়তে কাজ করি।
আমার কাপড়চোপড় ও চেহারায় তেমন দেখাচ্ছিলো।
আমি কলেজ ছাত্র এমন বলিনি কেননা আইডেন্টি কার্ড
চাইতে পারে। বদলি পাটকল শ্রমিক তাও বলিনি। হয়তো পে স্লিপ চাইতে পারে।
এবার আমাকে চেক করা শুরু করে। খবরের কাগজে আমার একটা লুঙি, গেঞ্জি ও বিস্কুট জড়ানো ছিলো। গায়ে একটা মলিন হাফ সার্ট, পরনে টেট্রনের প্যান্ট সেটার দুই ঠ্যঙের রঙের মিল নেই। ভিতরে আন্ডার ওয়্যার পরিনি। কারন আমার আন্ডার ওয়্যার ছিলনা। অনেকদিন হতে চললো আমি প্যান্ট পরিনি। সব সময় লুঙ্গি
পরেই থাকতাম। পায়ে টায়ারের স্যান্ডেল। আমার প্যান্টের পকেট চেক করতে লাগলো। আছে মোটে সাড়েতেরো টাকা।
প্যান্টের ভিতর কোনো গোপন
কুঠুরি আছে কিনা তাই প্যান্টের
বোতাম খুলতে বললো।
আমি বললাম ছার আমার প্যান্টের তলায় আন্ডারপ্যান্ট নেই। প্যান্ট খুললি ন্যাংটা হয়ে যাবানে।
এক রক্ষী আমাকে ধাক্কা দিয়ে বলে যা ভাগ শালা বাসে ওঠ।
আমি পরানে পানি ফিরে পেলাম। মনে মনে ‘লাহাওলা অলা কুয়াতিল ইল্লাহ বিল্লাহিল ওলিউল আজিম’ আওড়ালাম।
ছোটোবেলায় বজ্রপাত হলে এইটা পড়তাম। তখন হয়তো রক্ষীদের টাটা পড়ার মতো মনে হচ্ছিলো। হয়তোবা রক্ষীদের কাছ থেকে ছাড়া পেয়ে আনন্দে
মুখস্ত রাখা এই দোয়াই ঝেড়ে দিলাম।
বাসে রূপসায় নেমে হেটে হেটে
চানমারি শেয়ারঘাটে চলে আসি। ঘাটে কয়েকটি শেয়ারের নৌকা। জাবুসার কাসেম মাঝির নৌকায় উঠি। তখন জাবুসা হারানিয়া খালে অস্থায়ী বাঁধ দেওয়া। তাই নৌকা জাবুসার ভিতর যাবেনা। খারাবাদ ফুলতলার ঘাটে নৌকা যাবে। আমি হারানিয়া খালের গোড়াতে নেমে বাড়িতে চলে যাবো মন স্থির করি। এখন হারানিয়ার খাল থেকে রূপসা ব্রিজ পর্যন্ত জেমিনি সীফুডের রাজ্য। সেইকালে শীতের ধানকাটার পর খালগুলিতে বাঁধ দেয়া হতো যাত রূপসার জোয়ারের পানি বিলে না ঢুকতে পারে। কারন তখন বিলে তিল, উচ্ছে, কুমড়া, বাঙ্গি, তরমুজের চাষ করা হতো। এজন্য শেয়ারের নৌকা গ্রামের ভিতর যেতে পারতোনা। তাই আমাদের নৌকা থেকে নেমে অনেকটা পথ পায়ে হাটতে হতো।
নৌকায় অনেক যাত্রী উঠেছে। তবুও নৌকা ছাড়ছেনা। আমি তখন উদ্বিগ্ন হয়ে বলি, কাসেম ভাই নৌকা ছাড়ো মেলা যাত্রী হইছে।
আরো দুই চারজন নিতি হবে। আমারতো প্যাট চালাতি হবে। চাউলের দাম কতো জানো?
নৌকায় নোয়াঢালিকে দেখলাম। আমাদের গ্রামের বয়ষ্ক লোক। এককালের কিম্বদন্তি লাঠিয়াল। হাত পা দিয়ে একসাথে ছয়টা সড়কি চালাতে পারতো। সড়কি হচ্ছে একধরণের বল্লম। এখন খুলনায় রাজমিস্ত্রীর কাজ করেন। কোমরে গামছা বাধা। আমার দিক তাকিয়ে মুচকি হাসলেন। নোয়াঢালি আমার কিশোর বেলায় আমাদের বাড়ির নীচের কান্দরে আমাদের কয়েকজনকে সড়কি চালানোর তালিম দিয়েছিলেন।
নৌকায় আমান্দা যাত্রী উঠানো দেখে নোয়াঢালি হাঁক দিয়ে বললেন কাশেম লৌকো ছাড়।
আরে ম্যাভাই আমার ক্যাপাসিটি আছে। ভয় পায়েনা।শেয়ারের নৌকা ছেড়ে দিলো।তীব্র ভাটার স্রোত। আমি নৌকার গলুইয়ের ভিতরে না গিয়ে বাইরে দাঁড়িয়ে আছি। শিপইয়ার্ড থেকে দুম দুম হাতুড়ি পেটানোর শব্দে জান কেঁপে উঠছে। পাশ দিয়ে যাত্রী বোঝাই একটা লঞ্চ চলে গেলো। তার ঢেউয়ে নৌকা বেসামাল। কাসেম মাঝি ও দাড় গুন টানার জন্য একজন চ্যাংড়া সহকারী আছে। তবে ভাটার অনুকূল স্রোতের জন্য নৌকায় দাড়, বৈঠা বাওয়া লাগছেনা। কাসেম শুধু হাল ধরে আছে। ভাটার অনুকূল স্রোতে নৌকা চলছে তীব্র গতিতে। পিছনে তাকিয়ে দেখি শব্দ করে জোড়া গানবোট আসছে। প্রথমটা চলে গেলো নৌকা থেকে কিছু দূর দিয়ে। প্রবল ডেউয়ে নৌকা আছাড় বিছিড় খেতে থাকে। যাত্রীরা হতচকিত হয়ে পড়ে। আমি ঠায় দাঁড়িয়ে আছি। নোয়াঢালি আমার পাশে তার রাজমিস্ত্রীর কাজের যন্ত্রপাতি ভরা কাপড়ের থলে শক্ত করে ধরে আছেন। পিছনের গানবোটটা আমাদের নৌকার কাছে চলে আসছে। ভয়ে কেউ কেউ জোরে জোরে দোয়া পড়ছে। আমি শুধু নোয়াঢালির একহাত শক্ত করে ধরলাম। ধুন্দুমার শব্দকরে গানবোটটি নৌকার কাছ দিয়ে চলে গেলো। বিশাল ঢেউয়ের বাড়ি খেয়ে নৌকা পানির ভিতর কাত হয়ে গেলো। কাসেম মাঝি বৈঠানিয়ে লাফিয়ে পড়ে বললো আমার ক্যাপাসিটির বাইরে। যে যার মতো বাঁচার চিষ্টা এরো।
আমি সাঁতার দিলাম। তীব্র স্রোত আর ঢেউয়ের বাড়িতে আমি পানি খেয়ে ফেললাম। আমার ডান দিকে দেখলাম শিপইয়ার্ডের ঘাটে বিশালকায় জাহাজ। তীব্র স্রোতে কয়েকজন যাত্রী জাহাজের নীচে ডুবে গেলো। আমি ডুবছি ভাসছি। প্যান্ট পরে সাতার দিতে পারছিনা। ডুবে মরার জন্য মানুষিক প্রস্তুতি নিচ্ছি।
হঠাৎ আমাদের গ্রামের দক্ষিন পাড়ার নোয়াঢালি এসে আমার হাত ধরে। দাদো সাঁতরাবানা। ভয় নেই গোনে ভাসতি থাকো।
আমি তখন প্রায় তলিয়ে যাচ্ছিলাম। উনি একহাত দিয়ে আমাকে তার কাছে টেনে নিয়ে
আর এক হাত দিয়ে পানিতে থাবা মেরে লাঠিয়াল হাঁক ছাড়েন আল্ল আল্লা আল্লাহ।
আমরা জাহাজ অতিক্রম করে গেলাম। প্যান্ট পানিতে ভিজে টাইট হয়ে আছে পা দাপিয়ে জল কাটতে কষ্ট হচ্ছে। আমি নোয়াঢালিকে বললাম। তিনি বললেন ফুলপ্যান্টের বোতাম খোলো। আমি কষ্টেশিষ্টে প্যান্টের বোতাম খুলে ফেললাম। তিনি আমার পায়ের দিক থেকে টানমেরে প্যান্ট খুলে ফেলেন। ল্যাংটা হয়ে স্রোতে ভাসতে স্বস্তি ও সাহস পাচ্ছি। খুব হালকা লাগছে। একটা ইলিশ ধরার জেলে নাও এসে আমাদের কাছে থামে। তারা আমাদের নৌকায় টেনে তোলে। আমি নৌকায় উঠে চিত হয়ে শুয়ে হাঁপাতে থাকি। গায়ে হাফ সার্ট নীচে সদরঘাট। নোয়াঢালি তাঁর কোমরের গামছা খুলে আমার ছতর ঢেকে দিয়ে বুকে দুই থাবা মেরে বলে ওঠেন ভয় পাইছো লিডার। আর ভয় নেই লৌকো কুলি আসে গেছে এইবার মার কোলে ফিরে যাও।
পরে জানতে পারি এই নৌকাডুবিতে শিশুসহ চারজন মারা গিয়েছিলো।
– – – – – – – – – – – – – – –